☰
✕

নিজের আকিদা যাচাইয়ে ৭ প্রশ্ন

১৯ অক্টোবর, ২০২৬

আকিদা আরবি শব্দ, যার অর্থ বিশ্বাস। ইসলামের পরিভাষায় আল্লাহ, তাঁর রাসুল, ফেরেশতা, আসমানি কিতাব, আখেরাত ও তাকদিরসহ দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলোর প্রতি বিশ্বাসকে আকিদা বলা হয়। একজন মুসলিমের বিশ্বাস কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া জরুরি। কিন্তু নিজের বিশ্বাস সম্পর্কে আমরা কতটা সচেতন? নিচের সাতটি প্রশ্ন সেই সচেতনতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

১. আল্লাহর একত্ব সম্পর্কে আপনার বিশ্বাস কতটা স্পষ্ট?

আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। তিনি স্রষ্টা ও পালনকর্তা। ইবাদত, দোয়া ও চূড়ান্ত নির্ভরতার ক্ষেত্রে তাঁর একত্ব স্বীকার করা তাওহিদের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, তিনি আল্লাহ, এক।’ (সুরা ইখলাস: ১)

যেমন চিকিৎসা নেওয়া বা মানুষের সাহায্য চাওয়া তাওহিদের বিরোধী নয়। তবে কোনো সৃষ্টিকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা কিংবা তাঁর মতো স্বাধীনভাবে উপকার-ক্ষতি করার ক্ষমতার অধিকারী বলে বিশ্বাস করা গুরুতর আকিদাগত সমস্যা।

২. আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলি সম্পর্কে কী বিশ্বাস করেন?

আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলি সৃষ্টির মতো নয়। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তাঁর মতো কিছুই নেই। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা শুরা: ১১)

আল্লাহ সম্পর্কে বিশ্বাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত কল্পনা ও অনুমানের ওপর নির্ভর না করে কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।

৩. ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে আপনার বিশ্বাস কি পরিষ্কার?

আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, আসমানি কিতাব, রাসুল, আখেরাত এবং তাকদিরের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলোর অন্তর্ভুক্ত।

আল্লাহ বলেন, ‘রাসুল তাঁর রবের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি যা নাজিল করা হয়েছে, তাতে ঈমান এনেছেন এবং মুমিনরাও। সবাই ঈমান এনেছে আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, তাঁর কিতাবসমূহ ও তাঁর রাসুলদের প্রতি।’ (সুরা বাকারা: ২৮৫)

মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসুল এবং শেষ নবী (তাঁর পরে আর কোনো নবী আসবেন না)। (সুরা আহজাব: ৪০)

৪. গায়েবের জ্ঞান সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?

গায়েব বা অদৃশ্য জগতের প্রকৃত জ্ঞান আল্লাহর। তিনি তাঁর ইচ্ছায় নবী-রাসুলদের যতটুকু জানিয়েছেন, তাঁরা ততটুকুই জেনেছেন।

আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, আসমান ও জমিনে আল্লাহ ছাড়া কেউ গায়েব জানে না।’ (সুরা নামল: ৬৫)

তাই গণক বা জ্যোতিষীর কাছে ভবিষ্যৎ জানার চেষ্টা এবং তাদের গায়েব জানার দাবির ওপর নির্ভর করা থেকে সতর্ক থাকা জরুরি।

৫. বিপদে আল্লাহর ওপর ভরসা ও তাকদিরে আপনার বিশ্বাস কেমন?

আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়। চিকিৎসা নেওয়া, পরামর্শ করা ও পরিশ্রম করার পাশাপাশি আল্লাহর ওপর আস্থা রাখতে হয়।

আল্লাহ বলেন, ‘আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক: ৩)

তাকদিরে বিশ্বাসের অর্থ সবকিছু আল্লাহর জ্ঞান ও ইচ্ছার অধীন বলে স্বীকার করা। তবে এর অর্থ নিজের কাজের দায় এড়িয়ে যাওয়া নয়। চেষ্টা ব্যর্থ হলে আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা এবং নিজের ভুলের দায়িত্ব স্বীকার করা দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।

৬. সাহাবায়ে কেরামের প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন?

সাহাবায়ে কেরাম রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সান্নিধ্য পেয়েছেন এবং তাঁর কাছ থেকে দ্বীন শিখেছেন। তাঁদের সম্মান করা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা আমার সাহাবিদের গালি দিয়ো না।’ (সহিহ বুখারি: ৩৬৭৩)

সাহাবিদের জীবনের কোনো ঘটনা বা ঐতিহাসিক মতপার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন থাকলে নির্ভরযোগ্য সূত্রের আলোকে তা বোঝা জরুরি। কোনো ঘটনা না বুঝে তাঁদের সম্পর্কে বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকা উচিত।

৭. আল্লাহর রহমত ও আমলের নিয়ত সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?

আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়। একইসঙ্গে তাঁর ক্ষমার আশায় গুনাহকে হালকা করে দেখাও ঠিক নয়। গুনাহ হলে আন্তরিকভাবে তাওবা করে নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে।

আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা যুমার: ৫৩)

ইবাদতের ক্ষেত্রেও নিয়ত শুদ্ধ রাখা জরুরি। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সব আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (সহিহ বুখারি: ১)

মানুষের প্রশংসা পাওয়াকে ইবাদতের উদ্দেশ্য বানানো রিয়ার অন্তর্ভুক্ত। তবে মানুষের সামনে কোনো ভালো কাজ করলেই তা রিয়া হয়ে যায় না। মূল বিষয় হলো কাজের উদ্দেশ্য ও অন্তরের নিয়ত।

আকিদা শুদ্ধ রাখবেন কীভাবে?

আকিদা শুদ্ধ রাখতে কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসগুলো সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য জ্ঞান অর্জন করতে হবে। কুসংস্কার, যাচাইহীন ধর্মীয় প্রচার ও ভিত্তিহীন দাবির ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। নিজের ভুল বুঝতে পারলে তা সংশোধনের মানসিকতাও রাখতে হবে।

মনে রাখা জরুরি, কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে দ্বিধা হওয়া মানেই ঈমান নষ্ট হয়ে যাওয়া নয়। কোনো বিষয়ে অজ্ঞতা, ভুল ধারণা, গুনাহ এবং ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস জেনে-বুঝে অস্বীকার করা এক বিষয় নয়। তাই নিজের বা অন্যের ঈমান সম্পর্কে তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সঠিক জ্ঞান অর্জন ও বিশ্বাস শুদ্ধ করার চেষ্টা করাই জরুরি।