☰
✕

ভারতে স্টারলিংকের অনুমোদন নিয়ে জটিলতা, অপেক্ষায় গ্রাহকেরা

২৫ অক্টোবর, ২০২৬

ভারতে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা চালু নিয়ে ইলন মাস্ক ও মুকেশ আম্বানির বিরোধ আলোচনায় এসেছে। তবে এই বিরোধের চেয়ে গ্রাহকদের কাছে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কবে নাগাদ তারা স্টারলিংকের ইন্টারনেট সেবা পাবেন এবং এ জন্য কত খরচ করতে হবে।

খবর গালফ নিউজ

স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের বাজারে নতুন প্রতিষ্ঠানের প্রবেশের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তাসহ সংশ্লিষ্ট সব শর্ত পূরণ করাও জরুরি। কিন্তু অনুমোদনপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য না থাকলে সেবা চালুর অগ্রগতি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

ভারতের যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গত সপ্তাহে জানিয়েছে, দেশটিতে লাইসেন্স পাওয়া তিনটি স্যাটেলাইট অপারেটরের নিরাপত্তা মূল্যায়ন চলছে।

প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো— ইলন মাস্কের স্টারলিংক, জিও স্যাটেলাইট কমিউনিকেশনস এবং ভারতী গ্রুপ-সমর্থিত ইউটেলস্যাট ওয়ানওয়েব। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনটি প্রতিষ্ঠানই মোটামুটি একই পর্যায়ে রয়েছে।

স্টারলিংক ইতিমধ্যে টেলিযোগাযোগ লাইসেন্স পেয়েছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে সেবা চালু করতে নিরাপত্তাসংক্রান্ত শর্ত পূরণ এবং স্পেকট্রাম বরাদ্দ প্রয়োজন।

স্পেকট্রাম হলো বেতার তরঙ্গের নির্দিষ্ট অংশ, যার মাধ্যমে ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন যোগাযোগসেবা দেওয়া হয়।

ফলে স্টারলিংকের সেবা চালুতে বিলম্বকে শুধু লাইসেন্স না পাওয়ার সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অনুমোদনপ্রক্রিয়ার অন্য ধাপগুলোও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

আম্বানির বিরুদ্ধে অভিযোগ, প্রমাণ নেই

স্টারলিংকের কার্যক্রম শুরুর বিলম্ব নিয়ে ইলন মাস্ক অভিযোগ করেছেন, প্রভাবশালী ব্যবসায়িক মহল এতে বাধা দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তিনি রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মুকেশ আম্বানির নামও উল্লেখ করেছেন।

তবে তার অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

অন্যদিকে, রিলায়েন্স জানিয়েছে, তারা স্টারলিংকসহ স্যাটেলাইট যোগাযোগ খাতে প্রতিযোগিতাকে স্বাগত জানায়। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, জিওর নিজস্ব সেবার ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের অপেক্ষা চলছে।

ভারতের যোগাযোগমন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া জানিয়েছেন, স্পেকট্রামের মূল্য নির্ধারণের বিষয়ে শিগগিরই সিদ্ধান্ত হতে পারে। এই সিদ্ধান্তের ওপর যেমন সেবা চালুর অগ্রগতি নির্ভর করছে, তেমনি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিজস্বভাবে পূরণ করতে হবে নিরাপত্তাসহ অন্যান্য শর্ত।

কোন পর্যায়ে সরকারের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন এবং কোন পর্যায়ে আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পদক্ষেপ বাকি রয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হলে অনুমোদনপ্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা কমতে পারে।

প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও অংশীদার

ভারতে স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের বাজারে প্রতিযোগিতার চিত্রটি সরল নয়। কারণ, দেশীয় টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে স্টারলিংকের ব্যবসায়িক সহযোগিতার উদ্যোগও রয়েছে।

গত বছরের মার্চে স্পেসএক্সের সঙ্গে অংশীদারত্বের ঘোষণা দেয় ভারতী এয়ারটেল। এর এক দিন পর একই ধরনের চুক্তির ঘোষণা দেয় রিলায়েন্স জিও। উভয় চুক্তির ক্ষেত্রেই স্টারলিংকের প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

এয়ারটেল জানিয়েছিল, তাদের বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে স্টারলিংকের সরঞ্জাম বিক্রি এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার সুযোগ খতিয়ে দেখা হবে।

এ ধরনের উদ্যোগের ফলে গ্রাহকদের কাছে সেবা পৌঁছানো সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে এগুলো দেখায়, স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের বাজারে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে একে অপরের সঙ্গে কাজ করতে পারে।

তবে এসব চুক্তি থেকে স্টারলিংকের কার্যক্রমে কেউ বাধা দিয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বরং বাজারের বাস্তবতা বুঝতে হলে প্রতিযোগিতা, ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব এবং সেবা বিতরণের বিষয়গুলো একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

গ্রাহকেরা সরাসরি স্টারলিংকের কাছ থেকে সেবা কিনতে পারবেন কি না, বিভিন্ন প্যাকেজে কী সুবিধা থাকবে এবং প্রয়োজনে অন্য সেবাদাতার কাছে যাওয়ার সুযোগ কেমন হবে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

সেবার খরচই বড় প্রশ্ন

স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে শুধু সংযোগের সুবিধা থাকলেই হবে না, এর ব্যয়ও গ্রাহকদের সামর্থ্যের মধ্যে থাকতে হবে।

ভারতের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান জোহোর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান বিজ্ঞানী শ্রীধর ভেম্বু দেশটিতে কম খরচে মোবাইল ইন্টারনেট পাওয়ার সুবিধার কথা তুলে ধরেছেন। ভ্রমণের সময় ফোনের ইন্টারনেট ব্যবহার করে কাজ করার অভিজ্ঞতাও জানিয়েছেন তিনি। তবে এই অভিজ্ঞতা দিয়ে ভারতের সব অঞ্চলে ইন্টারনেটের প্রাপ্যতা ও নির্ভরযোগ্যতার চিত্র বোঝা যায় না।

যেসব এলাকায় প্রচলিত ব্রডব্যান্ড সংযোগ নির্ভরযোগ্য, সেসব এলাকার গ্রাহকদের স্টারলিংকে যাওয়ার জন্য বাড়তি সুবিধা প্রয়োজন। অন্যদিকে, যেসব গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় প্রচলিত নেটওয়ার্ক দুর্বল, সেখানে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট কার্যকর বিকল্প হতে পারে।

তবে নতুন সংযোগটি কতটা কার্যকর হবে এবং এর জন্য গ্রাহকদের কত ব্যয় করতে হবে, তা জানা জরুরি।

২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের টেলিকম নিয়ন্ত্রক সংস্থা টেলিকম রেগুলেটরি অথরিটি অব ইন্ডিয়া (ট্রাই) নির্দিষ্ট কিছু স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড সেবার জন্য সমন্বিত মোট আয়ের ৪ শতাংশ হারে স্পেকট্রাম চার্জ এবং শহরাঞ্চলের প্রতিটি গ্রাহকের জন্য বছরে অতিরিক্ত ৫০০ রুপি ফি নেওয়ার সুপারিশ করেছিল। গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকার গ্রাহকদের ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত ফি মওকুফের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

এ ছাড়া সুবিধাবঞ্চিত গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকার নির্দিষ্ট গ্রাহকদের জন্য সরঞ্জাম কেনায় ভর্তুকি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার সুপারিশও করেছিল সংস্থাটি। তবে এসব ছিল সুপারিশ। চূড়ান্তভাবে কত টাকা চার্জ নির্ধারণ করা হবে বা গ্রাহকদের মোট খরচ কত দাঁড়াবে, তা এসব প্রস্তাব থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় না।

স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের প্রকৃত ব্যয় নির্ভর করবে সরঞ্জাম কেনা, সংযোগ স্থাপন, মাসিক সাবস্ক্রিপশন ফি এবং চুক্তির শর্তের ওপর। ফলে সেবা সাশ্রয়ী হবে কি না, তা নির্ধারণে শুধু মাসিক প্যাকেজের মূল্য দেখলে চলবে না; মোট ব্যয়ের হিসাবও বিবেচনা করতে হবে।

নিরাপত্তা যাচাইয়ে স্বচ্ছতা প্রয়োজন

স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানকে সেবা চালুর অনুমতি দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে নিরাপত্তা মূল্যায়ন চলমান থাকার অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কোনো অনিয়ম করেছে।

ট্রাইয়ের ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ের সুপারিশে বলা হয়েছিল, নীতিগতভাবে নেটওয়ার্ক স্থাপনের অনুমোদন পাওয়ার পর আবেদন জমা দেওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে স্পেকট্রাম বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। তা সম্ভব না হলে একই সময়ের মধ্যে আপত্তির বিষয়গুলো জানানো যেতে পারে। এটি স্টারলিংককে অনুমোদন দেওয়ার বাধ্যতামূলক সময়সীমা ছিল না; বরং প্রক্রিয়াটিকে আরও পূর্বানুমানযোগ্য করার একটি প্রস্তাব ছিল।

ভারতে স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হলে নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নিয়মের ধারাবাহিক প্রয়োগ এবং অনুমোদনপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ জরুরি।

কোম্পানিগুলোর উচিত অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করা। আর কর্তৃপক্ষের উচিত নিরাপত্তার স্বার্থে যতটুকু প্রকাশ করা সম্ভব, ততটুকু তথ্য দিয়ে অনুমোদনের বাকি ধাপগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া।

শেষ পর্যন্ত এই প্রতিযোগিতার সুফল নির্ভর করবে গ্রাহকেরা কতটা সহজে সেবা পাচ্ছেন, এর খরচ তাদের সামর্থ্যের মধ্যে থাকছে কি না এবং সংযোগটি কতটা নির্ভরযোগ্য হচ্ছে, তার ওপর। স্যাটেলাইট ইন্টারনেট নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা উচিত গ্রাহকদের জন্য উন্নত ও সাশ্রয়ী সেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি।