০৭ নভেম্বর, ২০২৬
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো জ্ঞান অর্জন, নৈতিকতা গঠন, মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্থান। একজন শিক্ষার্থী এখানে আসে স্বপ্ন নিয়ে, নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তোলার প্রত্যাশা নিয়ে।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, আমাদের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বুলিং ও র্যাগিংয়ের মতো নেতিবাচক সংস্কৃতি শিক্ষার পরিবেশকে কলুষিত করছে। কখনো সিনিয়র শিক্ষার্থীদের ক্ষমতার দাপট, কখনো দলবদ্ধভাবে কাউকে অপমান করা, কখনো শারীরিক নির্যাতন, আবার কখনো অশালীন মন্তব্য, বিদ্রুপ কিংবা মানসিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে জুনিয়র শিক্ষার্থীদের হেনস্তা করা হচ্ছে। অনেক সময় এসব কর্মকাণ্ডকে পরিচিতি পর্ব, মজা কিংবা বন্ধুত্বের অংশ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়।
অথচ যে আচরণে একজন মানুষের সম্মানহানি হয়, মনে কষ্ট সৃষ্টি হয়, আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয় কিংবা শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির শিকার হতে হয়, তা কখনোই নিছক মজা হতে পারে না।
কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমানরা নিরাপদ থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪০)
হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) একজন আদর্শ মুসলমানের পরিচয় তুলে ধরেছেন। এখানে জিহ্বা ও হাতের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ মানুষের অধিকাংশ কষ্ট ও ক্ষতির অন্যতম মাধ্যম হলো তার কথা ও কাজ।
জিহ্বার মাধ্যমে মানুষকে গালমন্দ করা, অপমান করা, বিদ্রূপ করা, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া কিংবা অশ্লীল মন্তব্য করা হয়। অন্যদিকে হাতের মাধ্যমে মারধর, শারীরিক নির্যাতন, জোরজবরদস্তি ও নানা ধরনের ক্ষতি করা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোনো ব্যক্তির মন্দ হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছজ্ঞান করে।’(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৬৪)
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বুলিংয়ের সঙ্গে এই দুই ধরনের অনিষ্টের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। কাউকে নিয়ে হাসাহাসি করা, তার শারীরিক গঠন, পোশাক, উচ্চারণ কিংবা আর্থিক অবস্থা নিয়ে কটাক্ষ করা জিহ্বার অনিষ্টের অন্তর্ভুক্ত।
আবার কাউকে মারধর করা, জোর করে কোনো কাজ করানো, ভয় দেখানো কিংবা শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হাতের অনিষ্টের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! কোনো সম্প্রদায় যেন অপর কোনো সম্প্রদায়কে উপহাস না করে। হতে পারে, যাদের উপহাস করা হচ্ছে, তারা উপহাসকারীদের চেয়ে উত্তম।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১১)
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনেক সময় কোনো শিক্ষার্থীর উচ্চারণ, পোশাক, চেহারা, শারীরিক গঠন কিংবা গ্রাম থেকে আসার পরিচয় নিয়ে হাসাহাসি করা হয়। কখনো কারো আর্থিক অসচ্ছলতা কিংবা মেধাগত দুর্বলতাকে কেন্দ্র করে হেয় করা হয়। অথচ আল্লাহ তাআলা এসব আচরণ নিষিদ্ধ করেছেন। কারণ মানুষের বাহ্যিক অবস্থা দেখে তার প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারণ করা যায় না। আল্লাহর কাছে কে বেশি সম্মানিত, তা একমাত্র তিনিই জানেন। একই আয়াতে আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘তোমরা একে অপরকে দোষারোপ করো না এবং একে অপরকে মন্দ উপাধিতে ডেকো না।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১১)
বুলিংয়ের একটি বড় দিক হলো মানসিক নির্যাতন। কাউকে এমনভাবে অপমান করা, যাতে সে নিজেকে তুচ্ছ মনে করে, মানুষের সামনে যেতে ভয় পায় কিংবা নিজের আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। ইসলাম শুধু শারীরিক আঘাতকেই ক্ষতি মনে করে না; বরং মানুষের মনে কষ্ট সৃষ্টি করা এবং তার সম্মানহানিকেও গুরুতর অন্যায় হিসেবে বিবেচনা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের কোনো অপরাধ ছাড়াই কষ্ট দেয়, তারা তো অপবাদ ও সুস্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫৮)
অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে র্যাগিংয়ের নামে নতুন শিক্ষার্থীদের ভয় দেখানো হয়। কখনো জোর করে অদ্ভুত কাজ করানো হয়, কখনো অশালীন আচরণে বাধ্য করা হয়, আবার কখনো সিনিয়রদের সামনে হাজির না হলে শাস্তি দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এসব আচরণকে অনেকেই নিছক আনন্দ বা পরিচিতির অংশ মনে করেন। কিন্তু ইসলাম কাউকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করাকেও নিষিদ্ধ করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলমানের জন্য অন্য মুসলমানকে ভয় দেখানো বৈধ নয়।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৫০০৪)
বুলিং ও র্যাগিংয়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অনেকেই বলেন, তারা কাউকে কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে এসব করেননি; নিছক মজা করেছেন। কিন্তু কোনো কাজকে মজা বললেই তা বৈধ হয়ে যায় না। মজার নামে যদি অন্যের সম্মানহানি হয়, মনে কষ্ট সৃষ্টি হয় কিংবা শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হয়, তাহলে সেই আচরণের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আমার বান্দাদের বলুন, তারা যেন এমন কথা বলে, যা উত্তম।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৫৩)
একজন সিনিয়র শিক্ষার্থীর উচিত নতুন শিক্ষার্থীকে সহযোগিতা করা, তাকে প্রতিষ্ঠানের পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হতে সাহায্য করা, পড়াশোনায় উৎসাহ দেওয়া এবং বিপদে পাশে দাঁড়ানো। কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সিনিয়র হওয়ার অর্থ ক্ষমতা প্রদর্শন নয়; বরং দায়িত্বশীলতা, সহমর্মিতা ও সহযোগিতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। কেননা ইসলাম মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে নিয়োজিত থাকে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণে থাকেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৪৪২)
আমাদের মনে রাখতে হবে, সিনিয়র হওয়া কোনো অপরাধ করার লাইসেন্স নয়, শক্তিশালী হওয়া দুর্বলকে নির্যাতন করার অধিকার নয় এবং মজা করার নামে কারো সম্মানহানি করার সুযোগও ইসলামে নেই। বরং একজন প্রকৃত মুসলমানের পরিচয় হলো, তার কথা ও কাজে অন্য মানুষ নিরাপদ থাকবে। সে কাউকে অপমান করবে না, কাউকে ভয় দেখাবে না, কারো অধিকার নষ্ট করবে না; বরং মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসবে।
আল্লাহ আমাদের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বোঝার এবং বোঝানোর তাওফিক দান করুন। আমিন।