ইসলামে পরকীয়ার ভয়ংকর শাস্তি

১২ নভেম্বর, ২০২৫

ইসলাম নারী-পুরুষের অবৈধ সম্পর্ক বা ব্যভিচার (জেনা) থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছে। কোরআন ও হাদিসে শুধু শারীরিক সম্পর্কই নয়, বরং সেইসব কাজও জেনা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে যা জেনার দিকে প্ররোচিত করে।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন- ‘চোখের ব্যভিচার হলো দেখা, কানের ব্যভিচার শোনা, জিহ্বার ব্যভিচার বলা, হাতের ব্যভিচার ধরা, পায়ের ব্যভিচার হাঁটা, মন কামনা করে আর লজ্জাস্থান তা সত্য বা মিথ্যায় পরিণত করে।’ (সহিহ মুসলিম: ২৬৫৭)

পরপুরুষের সঙ্গে কথাবার্তা বিষয়ে নির্দেশ

একান্ত প্রয়োজন ছাড়া নারীদের পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলা উচিত নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘হে নবীর স্ত্রীগণ! তোমরা পরপুরুষের সঙ্গে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না, যাতে যার অন্তরে রোগ আছে, সে আকৃষ্ট না হয়।’ (সুরা আহজাব: ৩২)

যদিও আয়াতটি নবীজি (স.)-এর স্ত্রীদের উদ্দেশে নাজিল হয়েছে, তা সব মুমিন নারীর জন্যই প্রযোজ্য।

দৃষ্টি সংযমের নির্দেশ

শুধু নারীদের নয়, পুরুষদেরকেও দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ তাআলা। তিনি ইরশাদ করেন- ‘মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।’ (সুরা নূর: ৩০) ‘আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে, তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে।’ (সুরা নূর: ৩১)

এছাড়া আল্লাহ তাআলা আরও বলেন- ‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হইও না। এটা অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট আচরণ।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ৩২)

ব্যভিচারের শাস্তি

অবিবাহিত নারী-পুরুষের শাস্তি: ‘ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণী উভয়কে একশ ঘা করে বেত্রাঘাত কর।’ (সুরা নূর: ২)

বিবাহিত নারী-পুরুষের শাস্তি: রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন- ‘তোমরা আমার নিকট থেকে বিধানটি সংগ্রহ করে নাও। আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য একটি ব্যবস্থা দিয়েছেন। অবিবাহিত যুবক-যুবতীর শাস্তি হচ্ছে একশটি বেত্রাঘাত ও এক বছরের জন্য দেশান্তর; আর বিবাহিত পুরুষ ও মহিলার শাস্তি হচ্ছে একশটি বেত্রাঘাত ও রজম (পাথর মেরে হত্যা)।’ (সহিহ মুসলিম: ১৬৯০; আবু দাউদ: ৪৪১৫, ৪৪১৬; তিরমিজি: ১৪৩৪; ইবন মাজাহ: ২৫৯৮)

যদি ব্যভিচারী নারী-পুরুষের মধ্যে একজন বিবাহিত ও অন্যজন অবিবাহিত হয়, তবে বিবাহিত ব্যক্তিকে রজম এবং অবিবাহিতকে ১০০ বেত্রাঘাত করতে হবে।

এই শাস্তি কার্যকর করার দায়িত্ব ইসলামি রাষ্ট্রের। যদি ইসলামি হুকুমত না থাকে, তবে দুনিয়াতে এ শাস্তি কার্যকর না হলেও আখেরাতে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে।

তাওবা ও ক্ষমা

যদি কেউ আন্তরিকভাবে তাওবা করে, আল্লাহ তাঁর গুনাহ মাফ করে দেন। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন- التائب من الذنب كمن لا ذنب له ‘গুনাহ থেকে তাওবাকারীর অবস্থা এমন, যেন তার কোনো গুনাহ নেই।’ (ইবনে মাজাহ: ৪২৫০; শুআবুল ঈমান: ৭১৯৬; সহিহুত তারগিব: ৩১৪৫)

রাসুলুল্লাহ (স.) আরও বলেন- ‘যে ব্যক্তি মুখ ও লজ্জাস্থানের হেফাজতের জামিনদার হবে, আমি তার জান্নাতের জামিনদার হব।’ (বুখারি: ৭৬৫৮)

সামাজিক সতর্কতা

ইসলাম সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রেও সতর্কতা দিয়েছে, যেন গাইরে মাহরাম পুরুষ-নারীর অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ না ঘটে। হজরত উকবা ইবন আমের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন- ‘সাবধান! তোমরা নির্জনে নারীদের কাছেও যেও না।’

একজন আনসার সাহাবি বললেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! দেবর সম্পর্কে আপনার নির্দেশ কী?’ নবীজি (স.) বললেন- ‘দেবর তো মৃত্যুর সমতুল্য।’ (মুসলিম: ২৪৪৫) হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) ফতহুল বারি গ্রন্থে বলেন- ‘এখানে মৃত্যুর সমতুল্য অর্থ হলো হারাম।’

ব্যভিচারের পরিণতি

হাদিস শরিফে এসেছে- ‘ব্যভিচারের মন্দ পরিণাম ছয়টি: তিনটি দুনিয়ায় ও তিনটি আখেরাতে। দুনিয়ার তিনটি হলো- ১. চেহারার সৌন্দর্য নষ্ট হওয়া, ২. দরিদ্রতা, ৩. অকালমৃত্যু। আর আখেরাতের তিনটি হলো- ১. আল্লাহর অসন্তুষ্টি, ২. হিসাব-নিকাশের কঠোরতা, ৩. জাহান্নামের কঠিন শাস্তি।’ (ইসলামের দৃষ্টিতে অপরাধ, ই. ফা., পৃষ্ঠা ১০৯)

রাসুলুল্লাহ (স.) আরও বলেন- ‘কোনো মানুষ যখন ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তখন তার ভেতর থেকে ঈমান বেরিয়ে যায় এবং এটি তার মাথার ওপর মেঘখণ্ডের মতো ভাসতে থাকে। অতঃপর সে যখন তাওবা করে, তখন ঈমান আবার তার কাছে ফিরে আসে।’ (আবু দাউদ: ৪৬৯০)

ইসলাম সমাজকে পবিত্র রাখার জন্য নারী-পুরুষের সীমারেখা নির্ধারণ করেছে। ব্যভিচার বা পরকীয়া শুধু ব্যক্তিগত নয়, সামাজিক ও আখিরাতের দিক থেকেও ভয়াবহ পরিণতির কারণ। তাই আল্লাহ তাআলার নির্দেশ মতো দৃষ্টি সংযম, পবিত্রতা রক্ষা ও তাওবার মাধ্যমে পরিত্রাণ লাভই মুমিনের কর্তব্য।