হাদিয়া বিনিময়ে সতর্কতা প্রয়োজন

১৩ নভেম্বর, ২০২৫

হাদিয়া বা উপহার এমন এক সুন্দর মানবিক আচরণ, যা কোনো আর্থিক বা বস্তুগত বিনিময় ছাড়াই অন্যের মালিকানায় হস্তান্তর করা হয়। উপহার দেওয়ার মাধ্যমে মানুষের হূদয়ে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পায়। সমাজে সহানুভূতির পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং মানুষ একে অপরের প্রতি আন্তরিকভাবে যত্নশীল হয়ে ওঠে। হাদিয়া কেবল বস্তুগত লেনদেন নয়; বরং এটি হূদয়ের আন্তরিকতা, সৌজন্য ও সম্মানের বহিঃপ্রকাশ।

আল-কোরআনের নির্দেশনা : আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে দান, সহযোগিতা ও কল্যাণমূলক কাজের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন : ‘যারা নেক লোক, তারা সেই সব মানুষ; যারা আল্লাহর ভালোবাসার কারণে নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে আত্মীয়স্বজন, এতিম, মিসকিন, মুসাফির, সাহায্যপ্রার্থী ও দাস-মুক্তির কাজে।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত : ১৭৭)

প্রকৃত নেককার ব্যক্তিরা শুধুমাত্র নামাজ, রোজা বা ইবাদতেই সীমাবদ্ধ নয়; তারা তাদের সম্পদও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করে সমাজের অসহায় ও প্রয়োজনমতো মানুষকে সাহায্য করে। আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘তোমরা নেকি ও তাকওয়ার কাজে একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতা কর।’ (সুরা আল-মায়িদা, আয়াত : ২)

ইসলামী ফিকহের পরিভাষায় ‘হাদিয়া’ বলতে সেই সম্পদ বা বস্তুকে বোঝায়, যা কাউকে সম্মান ও শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে উপহার হিসেবে প্রদান করা হয়। এটি কোনো বাণিজ্যিক লেনদেন নয়, বরং আন্তরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের বহিঃপ্রকাশ।

আল্লামা ইবনু রুশদ (রহ.) বলেন : ‘হাদিয়া বলতে সেই জিনিসকে বোঝানো হয়, যা দাতা এমন ব্যক্তিকে দেয়, যাকে সে সম্মান ও মর্যাদার দৃষ্টিতে শ্রদ্ধা করে এবং তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অর্জনের উদ্দেশ্যে তাকে উপহার প্রদান করে।’ (আল-বায়ান ওয়াত তাহসিল (খণ্ড ১৭, পৃষ্ঠা ৩৯৭)

হাদিয়া গ্রহণের শর্ত : শরিয়তে উপহার গ্রহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উপহারটি সত্ এবং ন্যায্য উদ্দেশ্য থেকে প্রেরিত হতে হবে। অর্থাত্, কোনো উপহার যদি এমন উদ্দেশ্যে দেওয়া হয় যা অন্যের অধিকার লঙ্ঘন করে, মানবাধিকারে ক্ষতি করে, বা অনৈতিক ও অবৈধ কাজে সহায়তা করে, তাহলে তা গ্রহণ করা অনুমোদনযোগ্য নয়।

উপহার যদি কোনো উচ্চপদ, প্রশাসনিক দায়িত্ব বা ক্ষমতা অর্জনের জন্য দেওয়া হয়। যদি এটি অন্যকে প্ররোচিত করে বা প্রতিদ্বন্দ্বীর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে ব্যবহার করা হয়। কিংবা যদি এটি ঘুষ বা অন্য কোনো অবৈধ উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়, তাহলে উক্ত উপহার গ্রহণ করা হরাম এবং তা বিশ্বাসঘাতকতার একটি রূপ হিসেবে গণ্য হবে। আবু সাঈদি (রা.) থেকে বর্ণিত যে নবী কারিম (সা.) এক ব্যক্তিকে সদকা সংগ্রহের জন্য নিয়োগ দিয়েছিলেন। যখন তিনি ফিরে এলেন, তখন তিনি বলেন : ‘এটি সাদাকার সম্পদ, আর এটি আমাকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছে।’ এ শুনে নবী (সা.) মিম্বরে আরোহন করে আল্লাহর প্রশংসা ও মাহাত্ম্য ঘোষণা করলেন এবং বললেন : ‘যে কর্মকর্তাকে আমরা সদকা সংগ্রহের জন্য প্রেরণ করি, যদি সে এসে বলে যে ‘এটি সাদাকার সম্পদ, আর এটি আমাকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছে’, তার অবস্থা কী হবে? কেন সে শুধু নিজের পিতামাতার ঘরে বসে থেকে দেখলো না যে, তার কাছে কোনো উপহার আসে কি না?’ তিনি আরও বলেন : ‘যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! যা কিছুই সে (অবৈধভাবে) গ্রহণ করবে, কিয়ামতের দিন তা কাঁধে বহন করে নিয়ে উপস্থিত হবে। যদি উট হয়, তাহলে তা চিত্কার করবে, যদি গাভি হয় তাহলে তা হাম্বা হাম্বা করবে, অথবা যদি বকরি হয় তাহলে তা ভ্যাঁভ্যাঁ করবে...।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭১৭৪)

হারাম উপার্জনকারীর হাদিয়া গ্রহণের হুকুম : যদি কোনো ব্যক্তির সব উপার্জন বা অধিকাংশ আয় হারাম হয়, তাহলে তার দেওয়া হাদিয়া গ্রহণ করা জায়েজ নয়। তবে যদি সে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে ‘এই হাদিয়া আমার হালাল উপার্জন থেকে দেওয়া, তাহলে তা গ্রহণ করার সুযোগ রয়েছে। একইভাবে, যদি কারো উপার্জনের অধিকাংশ অংশ হালাল হয় এবং বাকি অংশ হারাম হয়, তাহলে তার দেয়া হাদিয়া গ্রহণ করা যায়। (কিন্তু এর থেকে বিরত থাকাই উত্তম)। (ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি, ৫/৩৪২, দারুল উলুম দেওবন্দ, জবাব নম্বর : ৬০০৪৬১)