৩০ জানুয়ারী, ২০২৬
নির্বাচনে জয়ী হয়ে জামায়াত সরকার গঠন করতে পারলে লালফিতার দৌরাত্ম্য ও টাকা পাচারের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে— এমন প্রতিশ্রুতি চেয়েছেন ব্যবসায়ীরা। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এক সংলাপে এই প্রতিশ্রুতি চান দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা।
অনুষ্ঠানে লাল ফিতা সংস্কৃতি, ঘুষ ও চাঁদাবাজিমুক্ত একটি ব্যবসাবান্ধব রাষ্ট্র গড়ার অঙ্গীকার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ঘুষকে ‘স্পিড মানি’ নামে বৈধ করার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, সেটিই শিল্পখাতকে প্রথম ধাক্কা দেয়। নির্ধারিত সময়ে কারখানা চালু না হলেও ব্যাংকঋণের সুদ চলতে থাকে, ফলে উদ্যোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হন।
এই পরিস্থিতি চিরতরে বদলাতে হবে।
তিনি বলেন, দেশীয় বিনিয়োগকারীরা যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে কেন—এই প্রশ্ন রাষ্ট্রকে সমাধান করতে হবে। তহবিলের নিরাপত্তাহীনতা, সম্পদের সুরক্ষার অভাব এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ঘাটতিকে শিল্প মালিকদের প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি। ক্ষমতায় গেলে লাল ফিতা সংস্কৃতি চিরতরে ভেঙে দেওয়া হবে এবং জনগণের আমানতের বোঝা বহন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে।
ক্ষমতায় এসে যেন কারো সম্পদ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি না পায় এবং আত্মীয়স্বজন রাতারাতি ধনী না হয়—এই সংস্কৃতিও ভাঙতে হবে।
অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশের সম্মানের সঙ্গে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান জামায়াত আমির। তিনি বলেন, উদ্দেশ্য কাউকে অপমান করা নয়, বরং জাতির কল্যাণ। যারা অর্থ ফেরত আনবেন, রাষ্ট্র তাদের সম্মান দেবে।
চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি বন্ধের প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। ১৮ কোটি মানুষের ৩৬ কোটি হাত একত্র করে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
‘সমৃদ্ধির সংলাপ: বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্যের জন্য কৌশলগত ভাবনা’ শীর্ষক এ মতবিনিময় সভায় ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন, এ কে আজাদ ও মো. জসিম উদ্দিন, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ, বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক, বারভিডার সভাপতি আবদুল হকসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা সভায় উপস্থিত ছিলেন। সভায় ‘বাংলাদেশের জন্য ব্যবসাবান্ধব অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন’ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং ও ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম ওয়ারেসুল করিম।
অনুষ্ঠানে আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সামনে জাতীয় নির্বাচন।
নতুন সরকার গঠিত হলে সরকারের সঙ্গে বেসরকারি খাতকে একই টেবিলে বসে কাজ করতে হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত দেড় বছরে সরকার যেন বেসরকারি খাত থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছে। এই দূরত্ব বজায় থাকলে দেশি বা বিদেশি কোনো বিনিয়োগই টেকসইভাবে আসবে না।’
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, ‘আপনারা হয় সরকারে থাকবেন, না হয় বিরোধী দলে থাকবেন। মাঝামাঝি কোনো অবস্থান নেই, এটা নিশ্চিত। তাই বলতে চাই, লালফিতার কথা অনেকেই বলেছেন। আমার কাছে মনে হয়, লালফিতা কোনো সমস্যা নয়, সমস্যা হচ্ছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। সরকার যদি চায়, লালফিতা পায়ের নিচে থাকবে।’
এফবিসিসিআইয়ের আরেক সাবেক সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘একটি তৈরি পোশাক বা উৎপাদন শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে যেখানে একটি নিরবচ্ছিন্ন ইউটিলিটি লাইন থাকা যথেষ্ট, বাস্তবে সেখানে উদ্যোক্তাকে একাধিক বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে যে বিনিয়োগ সরাসরি উৎপাদন খাতে যাওয়ার কথা ছিল, তার বড় একটি অংশ বায় হয়ে যাচ্ছে শুধু ইউটিলিটি ব্যবস্থাপনায়।’
ব্যবসায়ীদের চলাফেরা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলেন বিসিআই সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই এ দেশের নাগরিক। আমরা যেখানে খুশি যেতে পারি, কথা বলতে পারি, মতপ্রকাশ করতে পারি। কিন্তু কেন আমি কোথায় গেলাম, কোথায় গেলাম না-এই প্রশ্নে আমাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হবে, এই ভয়টা কাজ করে।’
নিট পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, ‘দেশে সরকারি সহায়তা আছে, কিন্তু সেটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণমূলক; প্রতিযোগিতাবান্ধব নয়। যদি সত্যিকার অর্থেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা রেড টেপ' ভাঙা যায়, তাহলে শুধু গার্মেন্ট খাত নয়, পুরো শিল্প খাত অনেক দূর এগিয়ে যাবে।’
বাংলাদেশ ওষুধশিল্প সমিতির মহাসচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেন, ‘ব্যবসায়ীদের জনগণের শত্রু নয়, উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। নীতিমালা প্রণয়নে ব্যবসায়ীদের যুক্ত করা প্রয়োজন। ওষুধশিল্পে ব্যবসা করতে ৪৭টি লাইসেন্স ও নিয়মিত নবায়ন বড় বাধা। আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি ও হয়রানির কারণে উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’
সভায় আরো বক্তব্য দেন আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান এবং বেসরকারি মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শেখ মহিউদ্দিন, মেট্রোপলিটন চেম্বারের (এমসিসিআই) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি হাবিবুল্লাহ এন করিম, রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারক ব্যবসায়ীদের সংগঠন বারভিডার সভাপতি আবদুল হক প্রমুখ।