যেসব আমলে জান্নাতে বাড়ি নির্মাণ হয়

১০ মে, ২০২৬

মানুষ এই পৃথিবীতে কত স্বপ্নই না দেখে! কেউ চায় অট্টালিকা, কেউ চায় বিলাসবহুল বাড়ি, কেউ আবার নিজের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করতে দিনরাত পরিশ্রম করে। অথচ দুনিয়ার সব ঘরবাড়িই একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে, সব সাজসজ্জা মাটির সঙ্গে মিশে যাবে এবং একসময় মানুষকে এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু একজন মুমিনের দৃষ্টি শুধু দুনিয়ার ঘরের দিকে সীমাবদ্ধ থাকে না; তার হৃদয়ের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা হলো জান্নাতে একটি চিরস্থায়ী আবাস লাভ করা—যেখানে থাকবে না কোনো দুঃখ, কষ্ট, ভয় কিংবা মৃত্যু।

মহানবী (সা.) তাঁর উম্মতকে এমন কিছু মহামূল্যবান আমলের শিক্ষা দিয়েছেন, যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বান্দার জন্য জান্নাতে ঘর নির্মাণ করেন।

মহানবী (সা.) বলেন, জান্নাতের ইট হবে সোনা ও রূপার, তার গাঁথুনি হবে সুগন্ধি কস্তুরীর, তার পাথর হবে মুক্তা ও ইয়াকূত, আর তার মাটি হবে জাফরানের। যে সেখানে প্রবেশ করবে, সে চিরসুখী হবে—কখনো দুঃখ-কষ্টে পতিত হবে না। সে সেখানে চিরজীবী থাকবে—কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। তার পোশাক কখনো পুরোনো হবে না এবং তার যৌবন কখনো ম্লান হবে না।

’ (তিরমিজি, হাদিস নং : ২৫২৬) 

পৃথিবীতে মানুষ নিজের জন্য একটি বাড়ি নির্মাণ করতে কতই না পরিশ্রম করে! এর জন্য সে বিপুল সম্পদ ব্যয় করে, দিনরাত চিন্তা করে, ক্লান্তি সহ্য করে এবং জীবনের মূল্যবান সময় উৎসর্গ করে। কখনো সে দুশ্চিন্তা, ঋণ, অনিদ্রা ও মানসিক চাপের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়ে। একটি সুন্দর ঘরের আশায় সে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘোরে, ঋণ নেয়, সময় বাড়ানোর অনুরোধ করে, এমনকি কখনো নিজের সম্মানও হারায়। অথচ এই দুনিয়ার ঘর একদিন ধ্বংস হবে।

আর যদি ঘরটি এসব বিপদ থেকেও রক্ষা পায়, তবুও এর মালিক তো মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাবে না। কারণ, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই মৃত্যুর কাফেলার যাত্রী। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, মৃত্যু তোমাদেরকে পাকড়াও করবেই; যদিও তোমরা সুদৃঢ় দুর্গের ভেতর অবস্থান করো।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৭৮)

মহানবী (সা.) এমন বহু আমলের কথা উল্লেখ করেছেন, যেগুলো একজন মুমিনের জন্য জান্নাতে ঘর নির্মাণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এগুলো শুধু সাধারণ আমল নয়; বরং আল্লাহর নৈকট্য ও চিরস্থায়ী সফলতা লাভের মহামূল্যবান উপায়।

১. মসজিদ নির্মাণ : আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মসজিদ নির্মাণ করা বা নির্মাণে সহযোগিতা করা। মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করে, তা যদি পাখির বাসার মতো ছোটও হয়, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করে দেন।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং : ১৬১০)

২. সুরা ইখলাস বেশি বেশি তিলাওয়াত করা : মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি দশবার ‘কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ’ (সুরা ইখলাস) পাঠ করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করে দেবেন।’(মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং : ১৫৬১০)

৩. নফল নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া : বিশেষত ফরজ নামাজের আগে ও পরে সুন্নাত নামাজ আদায় করা। মহানবী (সা.) ‘যে ব্যক্তি নিয়মিতভাবে বারো রাকাত নফল নামাজ আদায় করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করে দেন। এগুলো হলো, যোহরের আগে চার রাকাত, যোহরের পরে দুই রাকাত, মাগরিবের পরে দুই রাকাত, ইশার পরে দুই রাকাত এবং ফজরের আগে দুই রাকাত।’ (নাসায়ি, হাদিস নং : ১৭৯৪)

৪. সন্তানের মৃত্যুতে ধৈর্য ধারণ : সন্তান হারানোর কঠিন পরীক্ষায় ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর প্রশংসা করা। যখন কোনো মুমিন তার প্রিয় সন্তানকে হারিয়ে ধৈর্য ধারণ করে এবং বলে, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং তাঁর কাছেই ফিরে যাব), তখন আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে বিশেষ মর্যাদার ঘর নির্মাণ করেন। মহানবী (সা.) বলেন, ‘যখন কোনো বান্দার সন্তান মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ ফেরেশতাদের জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমরা কি আমার বান্দার সন্তানকে নিয়ে নিয়েছ?’ তারা বলে, ‘হ্যাঁ।’ আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কি তার হৃদয়ের সবচেয়ে প্রিয় অংশটি নিয়ে নিয়েছ?’ তারা বলে, ‘হ্যাঁ।’ তখন আল্লাহ জিজ্ঞেস করেন, ‘আমার বান্দা কী বলেছে?’ ফেরেশতারা বলে, ‘সে আপনার প্রশংসা করেছে এবং বলেছে— ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।’ তখন আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করো এবং তার নাম রাখো, ‘বাইতুল হামদ’ (প্রশংসার ঘর)।’ (তিরমিজি, হাদিস নং : ১০২১)

৫. উত্তম চরিত্র গঠন : অপ্রয়োজনীয় তর্ক পরিহার এবং মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকা। ইসলামে সুন্দর চরিত্রের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। একজন মুমিনের প্রকৃত সৌন্দর্য তার আচার-আচরণ, নম্রতা ও সত্যবাদিতার মধ্যেই প্রকাশ পায়। তাই মহানবী (সা.) তর্ক-বিতর্ক, মিথ্যা ও অসদাচরণ থেকে দূরে থাকার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সত্যের ওপর থাকা সত্ত্বেও তর্ক-বিতর্ক পরিহার করে, আমি তার জন্য জান্নাতের প্রান্তভাগে একটি ঘরের নিশ্চয়তা দিচ্ছি। আর যে ব্যক্তি হাসি-ঠাট্টার ছলেও মিথ্যা বলা ত্যাগ করে, তার জন্য জান্নাতের মধ্যভাগে একটি ঘরের নিশ্চয়তা দিচ্ছি। আর যার চরিত্র উত্তম, তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে একটি ঘরের নিশ্চয়তা দিচ্ছি।’ (আবু দাউদ, হাদিস নং : ৪৮০০)

৬. ইসলামের উপর অটল-অবিচল থাকা : মহানবী (সা.) এর প্রতি আন্তরিক বিশ্বাস ও তাঁর আনুগত্য ঈমানের মূলভিত্তি। যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পথে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতের মহা পুরস্কার। মহানবী (সা.) বলেন,  ‘যে ব্যক্তি আমার প্রতি ঈমান আনবে, ইসলাম গ্রহণ করবে এবং হিজরত করবে, আমি তার জন্য জান্নাতের প্রান্তে একটি ঘর, জান্নাতের মধ্যভাগে একটি ঘর এবং জান্নাতের সর্বোচ্চ কক্ষে একটি ঘরের নিশ্চয়তা দিচ্ছি। যে ব্যক্তি এ কাজ করবে, তার আর কোনো কল্যাণ অপূর্ণ থাকবে না এবং কোনো অকল্যাণ থেকেও সে বঞ্চিত হবে না। এরপর সে পৃথিবীর যেখানেই মৃত্যুবরণ করুক না কেন, সে সফলকাম হবে।’ (নাসায়ি, হাদিস নং : ৩১৩৩)

৭. বাজারে প্রবেশের দোয়া পাঠ করা : ইসলাম আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে ইবাদতে পরিণত করার শিক্ষা দেয়। এমনকি বাজারে প্রবেশের সময়ও একটি সংক্ষিপ্ত দোয়া পাঠের মাধ্যমে অগণিত সওয়াব অর্জনের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি বাজারে প্রবেশ করে এ দোয়াটি পড়বে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদ, ইউহয়ি ওয়া ইউমিতু, ওয়া হুয়া হাইয়্যুল্লা ইয়ামুত, বিয়াদিহিল খাইর, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইইন কাদির।’

অর্থ : ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব একমাত্র তাঁরই এবং সমস্ত প্রশংসাও তাঁর জন্য। তিনি জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান। তিনি চিরঞ্জীব, কখনো মৃত্যুবরণ করবেন না। সমস্ত কল্যাণ তাঁর হাতেই এবং তিনি সবকিছুর উপর সর্বশক্তিমান।’ তবে আল্লাহ তার জন্য দশ লক্ষ নেকি লিখে দেন, দশ লক্ষ গুনাহ মাফ করে দেন, তার মর্যাদা দশ লক্ষ গুণ বৃদ্ধি করেন এবং তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করেন।’(তুহফাতুল আহওয়াজি, হাদিস নং : ৩৪২৮)

জান্নাত কোনো কল্পনা নয়; এটি আল্লাহর প্রতিশ্রুত চিরন্তন আবাস। আর সেই জান্নাতের ঘর লাভের পথও কঠিন নয় তাদের জন্য, যারা আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে। একটি মসজিদ নির্মাণ, নিয়মিত নফল ইবাদত, সুন্দর চরিত্র গঠন, মিথ্যা ও তর্ক পরিহার, ধৈর্য ধারণ কিংবা একটি ছোট দোয়া—এসব সাধারণ আমলই আল্লাহর কাছে অসাধারণ মর্যাদা লাভ করতে পারে। আজ আমরা দুনিয়ার ঘর সাজাতে যতটা ব্যস্ত, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত আখিরাতের সেই চিরস্থায়ী ঘর নির্মাণে। কারণ দুনিয়ার সবকিছু একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু জান্নাতের নিয়ামত কখনো শেষ হবে না।

মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে এমন আমল করার তাওফিক দান করুন, যেগুলোর মাধ্যমে আমরা জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে একটি সুন্দর ঘর লাভ করতে পারি। আমিন।