১৭ মে, ২০২৬
পবিত্র জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে এই ১০ রাতের কসম খেয়েছেন (সুরা ফাজর: ২) রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘জিলহজের প্রথম ১০ দিনের আমলের চেয়ে অন্যকোনো দিনের আমলই উত্তম নয়।’ (সহিহ বুখারি: ৯৬৯) বিশেষ করে যারা কোরবানি দেওয়ার ইচ্ছা রাখেন, তাদের জন্য এই দিনগুলোতে সুন্নাহ ও শরিয়তের বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে।
১. নখ, চুল ও পশম না কাটা
জিলহজের চাঁদ দেখার পর থেকে কোরবানি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নিজের শরীরের কোনো অংশের চুল, নখ বা পশম না কাটা সুন্নাহ। হজরত উম্মে সালামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘তোমাদের মধ্যে যারা কোরবানি দেওয়ার ইচ্ছা করে, সে যেন জিলহজের চাঁদ দেখার পর থেকে কোরবানি সম্পন্ন করা পর্যন্ত নিজের চুল ও নখ না কাটে।’ (সহিহ মুসলিম: ১৯৭৭; নাসায়ি: ৪৩৬৫) অধিকাংশ ফকিহর মতে এটি মোস্তাহাব বা সুন্নাহ। এই নির্দেশনা কেবল কোরবানির মূল মালিকের জন্য- পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য এটি পালন করা আবশ্যক নয়।
২. জিলহজের প্রথম ৯ দিন রোজা রাখা
জিলহজ মাসের প্রথম ৯ দিন রোজা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। রাসুলুল্লাহ (স.) এই দিনগুলোতে রোজা রাখতেন (সুনানে আবু দাউদ: ২৪৩৭) এই দিনগুলোর প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদতের জন্য অত্যন্ত বরকতময়।
আরাফার রোজা: ৯ই জিলহজের (আরাফাহর দিন) রোজার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘আরাফার রোজা সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে, তাতে পূর্ববর্তী বছর ও পরবর্তী বছরের গুনাহের ক্ষতিপূরণ হয়ে যাবে।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬২) তবে যারা হজে অবস্থান করছেন (হাজি), তাদের জন্য আরাফার ময়দানে এই রোজা না রাখাই সুন্নাহ।
৩. বেশি বেশি জিকির ও তাকবির পাঠ
জিলহজের চাঁদ দেখার পর থেকেই ঘরে-বাইরে, পথে-ঘাটে বেশি বেশি জিকির করা মুমিনের কর্তব্য। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘এই দিনগুলোতে তোমরা বেশি বেশি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার ও আলহামদুলিল্লাহ পাঠ করো।’ (মুসনাদে আহমাদ: ৫৪৪৬) আল্লাহ তাআলাও নির্দেশ দিয়েছেন- ‘তারা যেন নির্ধারিত দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে।’ (সুরা হজ: ২৮)
৪. তাকবিরে তাশরিক পাঠ
৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ই জিলহজ আছর পর্যন্ত প্রতিটি ফরজ সালাতের পর একবার ‘তাকবিরে তাশরিক’ পাঠ করা ওয়াজিব। এটি পুরুষরা উচ্চস্বরে এবং মহিলারা নিচুস্বরে পাঠ করবেন।
তাকবির: আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।
৫. কোরবানি করা: জিলহজের প্রধান আমল
১০ই জিলহজ ঈদের দিনের সবচেয়ে উত্তম আমল হলো কোরবানি করা। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘কোরবানির দিনে রক্ত প্রবাহিত করার (পশু জবাই) চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় আর কোনো আমল নেই।’ (সুনানে তিরমিজি: ১৪৯৩) সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য কোরবানি করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি কেবল পশু জবাই নয়, বরং ইবরাহিম (আ.)-এর ত্যাগের স্মৃতি ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের নিদর্শন। আল্লাহ বলেন- ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এর গোশত ও রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ: ৩৭)
৬. ঈদের দিনের বিশেষ সুন্নাহ
কোরবানিদাতার জন্য ঈদের দিনের বিশেষ সুন্নাহ হলো— ঈদের সালাতের আগে কিছু না খেয়ে থাকা এবং সালাত শেষে সম্ভব হলে নিজের কোরবানির গোশত দিয়ে দিনের প্রথম আহার গ্রহণ করা। (সুনানে তিরমিজি: ৫৪২; মুসনাদে আহমদ: ২২৯৮৪) এছাড়া সামর্থ্য থাকলে নিজে পশু জবাই করা অথবা জবাইয়ের সময় সামনে উপস্থিত থাকা উত্তম।
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা
ভুলে নখ বা চুল কেটে ফেললে কি কোরবানি হবে?
হ্যাঁ, কোরবানি হয়ে যাবে। ভুলের কোনো গুনাহ নেই। ইচ্ছাকৃত হলে সুন্নাহ ছুটে যাবে, তবে কোনো কাফফারা বা জরিমানা নেই।
যিনি কোরবানি দিচ্ছেন না, তিনি কি নখ-চুল কাটা থেকে বিরত থাকতে পারেন?
হ্যাঁ। হাদিসে এসেছে- যারা সামর্থ্যের অভাবে কোরবানি দিতে পারছেন না, তারা যদি এই দিনগুলোতে নখ-চুল না কেটে ঈদের দিন কাটেন, তাহলে আল্লাহ তাদের পূর্ণ কোরবানির সওয়াব দান করবেন। (সুনানে নাসায়ি: ৪৩৬৫; সুনানে আবু দাউদ: ২৭৮৯)
কোরবানির পশুতে আকিকা দেওয়া যাবে কি?
জমহুর ফকিহগণের মতে, কোরবানির বড় পশুতে (গরু/মহিষ/উট) কোরবানির অংশের সাথে আকিকার অংশ দেওয়া জায়েজ।
জিলহজের প্রথম ১০ দিন ইবাদতের বসন্তকাল। কেবল কোরবানি দেওয়া নয়, বরং নখ-চুল না কাটা, রোজা রাখা, জিকির ও বিশুদ্ধ নিয়তের মাধ্যমে নিজেকে আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে যাওয়াই মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত। মহান আল্লাহ আমাদের এই বরকতময় দিনগুলোর প্রতিটি আমল কবুল করুন। আমিন।