১৭ মে, ২০২৬
হজ ইসলামের পাঁচটি রুকনের একটি। ইহরাম বাঁধার পর থেকে হজের নির্ধারিত আমলগুলো সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কিছু বিষয় কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর নিষেধাজ্ঞা হলো স্ত্রী সহবাস। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন- ‘হজের নির্দিষ্ট কয়েকটি মাস রয়েছে। যে ব্যক্তি এই মাসগুলোতে নিজের ওপর হজ অবধারিত করে নেয়, সে যেন হজে কোনো ‘রাফাস’ (সহবাস ও সংশ্লিষ্ট অশ্লীলতা), পাপাচার ও ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত না হয়।’ (সুরা বাকারা: ১৯৭)
তাফসিরকারগণ ‘রাফাস’ শব্দের ব্যাখ্যায় সহবাস ও সহবাস-সংশ্লিষ্ট আচরণ উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
১. আরাফাতের অবস্থানের পূর্বে সহবাস
৯ জিলহজ উকুফে আরাফাহ সম্পন্ন হওয়ার পূর্বে সহবাস করলে জমহুর ফকিহগণের মতে নিম্নোক্ত বিধান প্রযোজ্য হবে-
ক. হজ ফাসিদ হয়ে যাবে। ইবনে কুদামা (রহ.) বলেন- ‘আরাফার আগে সহবাস করলে হজ ফাসিদ হয়ে যায়- এ বিষয়ে অধিকাংশ আলেম একমত।’ (আল-মুগনি: ৩/৩২৯)
খ. বাকি হজের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। হজ ফাসিদ হওয়া সত্ত্বেও মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া যাবে না; সাধারণ হাজিদের মতোই বাকি সব কাজ সম্পন্ন করতে হবে।
গ. একটি বদনা (উট বা গরু) কোরবানি ওয়াজিব হবে। উট ও গরু উভয়েরই সামর্থ্য না থাকলে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী সাতটি ছাগল দেওয়া যাবে।
ঘ. পরবর্তী বছর হজ কাজা করতে হবে।
(দলিল: আল-মুয়াত্তা, কিতাবুল হজ: ৯৪৬; সুনানে বায়হাকি: ৫/১৫২; আল-মুগনি: ৩/৩২৯)
২. আরাফাতের পরে কিন্তু তাহাল্লুলে আউয়ালের পূর্বে সহবাস
আরাফাতে অবস্থানের পর কিন্তু তাহাল্লুলে আউয়াল অর্জিত হওয়ার আগে সহবাস করলে-
জমহুর ফকিহের মতে হজ ফাসিদ হবে না, তবে এটি কবিরা গুনাহ। বিধান: কাফফারা হিসেবে একটি বদনা (উট বা গরু) কোরবানি ওয়াজিব হবে
(সূত্র: বাদায়েউস সানায়ে: ২/১৮৫; আল-মাজমু: ৭/৩৪৭)
৩. তাহাল্লুলে আউয়ালের পরে কিন্তু তাওয়াফে জিয়ারতের পূর্বে সহবাস
১০ জিলহজ কঙ্কর নিক্ষেপ (রামি) এবং হলক বা কসর সম্পন্ন করার মাধ্যমে তাহাল্লুলে আউয়াল অর্জিত হয়। এরপর তাওয়াফে জিয়ারত সম্পন্ন করার আগে সহবাস হলে-
হজ ফাসিদ হবে না। বিধান: হানাফি মাজহাব অনুযায়ী একটি দম (ছাগল বা দুম্বা) কোরবানি ওয়াজিব; অন্যান্য মাজহাবে এ বিষয়ে ভিন্ন মত রয়েছে। (সূত্র: রদ্দুল মুহতার: ২/৫৫০)
৪. ভুলবশত বা অজ্ঞতাবশত সহবাস করলে
ইহরামের জিনায়াতে অজ্ঞতা বা ভুল ওজর হিসেবে গণ্য হবে কি না, এ বিষয়ে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
হানাফি মাজহাব: সাধারণভাবে অজ্ঞতাকে ওজর হিসেবে গ্রহণ করা হয় না।
শাফিয়ি মাজহাব: ক্ষেত্রবিশেষে অজ্ঞতা বা ভুলকে ওজর হিসেবে গণ্য করার অবকাশ রয়েছে।
উভয় ক্ষেত্রেই বাস্তব পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞ মুফতির ফতোয়া গ্রহণ করা আবশ্যক।
৫. স্ত্রীর বিধান
স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণ করলে: স্বামীর মতো একই বিধান প্রযোজ্য- পৃথকভাবে বদনা বা দম এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কাজা হজ আদায় করতে হবে।
বাধ্য করা হলে: জমহুর ফকিহের মতে স্ত্রীর উপর গুনাহ বা কাফফারা আসবে না। তবে ‘জবরদস্তি’র শরয়ি সংজ্ঞায় সূক্ষ্ম মতভেদ রয়েছে বলে বিজ্ঞ মুফতির পরামর্শ গ্রহণ করা জরুরি।
| সময়কাল | হজের অবস্থা | কাফফারা |
| আরাফাতের পূর্বে | হজ ফাসিদ | বদনা (উট/গরু) + পরের বছর কাজা |
| আরাফাতের পরে, তাহাল্লুলের আগে | হজ সহিহ, কবিরা গুনাহ | বদনা (উট/গরু) |
| তাহাল্লুলের পরে, তাওয়াফের আগে | হজ সহিহ | দম (ছাগল/দুম্বা) - হানাফি মতে |
দ্রষ্টব্য: জিনায়াতজনিত দমের গোশত ফকির-মিসকিনদের মধ্যে বণ্টন করা ওয়াজিব; নিজে ভক্ষণ না করার কথাই অধিকাংশ ফকিহ উল্লেখ করেছেন। পশু হারামের সীমানার ভেতরে জবাই করা আবশ্যক।
হজ কেবল একটি সফর নয়- এটি আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত পরীক্ষা। ইহরাম অবস্থায় যেকোনো নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হওয়া হজের আধ্যাত্মিকতা ক্ষুণ্ণ করে। প্রতিটি হাজির শরয়ি ও নৈতিক দায়িত্ব হলো- ইহরামের বিধান যথাযথভাবে জেনে হজে যাওয়া এবং কোনো লঙ্ঘন ঘটলে দ্রুত তওবা করে বিজ্ঞ মুফতির পরামর্শ অনুযায়ী সংশোধনের পথে ফেরা।