কঙ্গোতে ইবোলা প্রাদুর্ভাব কতটা উদ্বেগজনক?

১৮ মে, ২০২৬

কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে বিরল প্রজাতির ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। দেশটির গৃহযুদ্ধকবলিত একটি এলাকায় কয়েক সপ্তাহ ধরে অলক্ষ্যে ছড়িয়ে পড়ছে এই প্রাণঘাতী ভাইরাস।

ইতিমধ্যেই সেখানে অন্তত ২৫০ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছেন এবং প্রাণ হারিয়েছেন ৮০ জন। ভাইরাসের প্রজাতিটি বিরল হওয়ায় এবং আক্রান্তদের এক-তৃতীয়াংশই মারা যাওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর অর্থ এই নয় যে বিশ্বজুড়ে কোভিডের মতো মহামারি ছড়াবে।

সমগ্র বিশ্বের জন্য ইবোলার ঝুঁকি খুবই সামান্য হলেও কঙ্গোর প্রতিবেশী দেশ উগান্ডা, দক্ষিণ সুদান ও রুয়ান্ডা উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যানডেমিক সায়েন্সেস ইনস্টিটিউটের ডক্টর আমান্ডা রোজিক জানান, কঙ্গোর বর্তমান পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে এটি মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের প্রয়োজন।

চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এবার কঙ্গোয় ইবোলা ভাইরাসের তুলনামূলকভাবে অপরিচিত ‘বান্ডিবুগিও’ প্রজাতিটি হানা দিয়েছে। এর আগে ২০০৭ ও ২০১২ সালে এই প্রজাতির সংক্রমণ দেখা গিয়েছিল, যেখানে আক্রান্তদের ৩০ শতাংশই মারা যান।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এই প্রজাতির জন্য এখন পর্যন্ত অনুমোদিত কোনো টিকা বা নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। এমনকি সাধারণ পরীক্ষায় এই ভাইরাস সহজে ধরাও পড়ে না। কঙ্গোর ল্যাবে প্রাথমিক পরীক্ষায় রেজাল্ট নেগেটিভ আসার পর উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে এই ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে।

গত ২৪শে এপ্রিল কঙ্গোর একজন নার্সের শরীরে প্রথম ইবোলার লক্ষণ দেখা দেয়। কিন্তু প্রাদুর্ভাবের বিষয়টি নিশ্চিত করতেই কর্তৃপক্ষের তিন সপ্তাহ সময় লেগে গেছে।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের ডক্টর অ্যান কোরি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অনেক দেরিতে প্রাদুর্ভাব শনাক্ত হওয়ায় রোগটি থামাতে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছেন। ফলে বাস্তবে আক্রান্তের সংখ্যা রিপোর্টের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।

কঙ্গোর যে অঞ্চলে ইবোলা ছড়িয়েছে, সেটি দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত-বিধ্বস্ত এবং সেখানে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ গৃহহীন। আক্রান্ত এলাকাগুলোর বেশিরভাগই খনি-প্রধান শহর হওয়ায় সেখানকার মানুষ কাজের প্রয়োজনে প্রতিনিয়ত সীমান্ত পার হয়ে যাতায়াত করে, যা ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের ডক্টর ড্যানিয়েলা মানো আশ্বস্ত করে বলেছেন, ইবোলা মোকাবিলায় কঙ্গোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং এক দশক আগের তুলনায় বর্তমানে তাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেক শক্তিশালী।

ইবোলা প্রধানত ফলভোজী বাদুড়ের মাধ্যমে ছড়ালেও ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এলে মানুষের শরীরেও সংক্রমিত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত ও বমির মতো শরীরের তরল পদার্থের মাধ্যমে এটি ছড়ায়। ভাইরাস শরীরে ঢোকার ২ থেকে ২১ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয়। শুরুতে ফ্লুর মতো জ্বর, মাথাব্যথা ও ক্লান্তি থাকলেও ধীরে ধীরে বমি, ডায়রিয়া, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অকার্যকর হওয়া এবং অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণ শুরু হয়। নির্দিষ্ট ওষুধ না থাকায় আক্রান্তদের লক্ষণ দেখে তরল ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রাথমিক পরিচর্যা দেওয়া হচ্ছে, যা রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ায়।

সূত্র : বিবিসি