২৪ জুন, ২০২৬
ক্যানসার শব্দটি শুনলেই মানুষের মনে ভয়, অনিশ্চয়তা আর মৃত্যুর আশঙ্কা ভর করে। কেউ রোগের সঙ্গে লড়ে টিকে থাকেন। কেউবা হার মেরে নেন। তবে জটিল এ রোগটির প্রভাব কেবল আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর অভিঘাত পড়ে পুরো পরিবারের ওপর। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, বড় অঙ্কের ব্যয়, মানসিক চাপ এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ— সব মিলিয়ে ক্যানসার একটি পরিবারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকেও নাড়িয়ে দেয়।
ক্যানসারের চিকিৎসা সাধারণত একদিনে শেষ হয় না। রোগের ধরন ও পর্যায়ভেদে অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি কিংবা টার্গেটেড থেরাপির মতো নানা ধরনের চিকিৎসা নিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই চিকিৎসা মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর চলতে পারে।
চিকিৎসার প্রতিটি ধাপের সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন পরীক্ষা, নতুন ওষুধ এবং নতুন খরচ। রোগী ও তার স্বজনরা একদিকে যেমন সুস্থতার আশায় চিকিৎসা চালিয়ে যান, অন্যদিকে প্রতিনিয়ত লড়েন অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে।
বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিৎসা এখনও অধিকাংশ মানুষের জন্য ব্যয়বহুল। সরকারি হাসপাতালগুলোতে তুলনামূলক কম খরচে চিকিৎসার সুযোগ থাকলেও রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেককে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হতে হয়।
একজন ক্যানসার রোগীর চিকিৎসায় ব্যয় হতে পারে কয়েক লাখ থেকে কয়েক কোটি টাকা। বিশেষ করে আধুনিক ওষুধ ও থেরাপির খরচ বেশিরভাগ পরিবারের নাগালের বাইরে থাকে। ফলে অনেক পরিবার সঞ্চয় ভেঙে ফেলে, স্বর্ণ বিক্রি করে, জমি বিক্রি করে, ঋণ নেয় কিংবা আত্মীয়স্বজনের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য ক্যানসারে আক্রান্ত হলে সংকট আরও গভীর হয়। চিকিৎসা ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি সংসারের নিয়মিত খরচ চালানোও কঠিন হয়ে পড়ে।
ক্যানসারের সবচেয়ে নির্মম দিকগুলোর একটি হলো— বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও সুস্থতার কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। অনেক রোগী চিকিৎসা নিয়ে দীর্ঘদিন ভালো থাকেন, আবার অনেকের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না।
এই অনিশ্চয়তা পরিবারকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। একদিকে প্রিয়জনকে বাঁচিয়ে রাখার আকুতি, অন্যদিকে সীমিত সামর্থ্যের হিসাব— দুইয়ের মাঝে পড়ে স্বজনরা প্রায়ই অসহায় হয়ে যান।
অনেক পরিবারকে কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে হয়। চিকিৎসা চালিয়ে যাবেন, নাকি সীমিত সম্পদ অন্য প্রয়োজনের জন্য সংরক্ষণ করবেন— এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় অনেককে।
ক্যানসার রোগীর পরিবারের সদস্যরা প্রায়ই দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন। রোগীর সেবা, হাসপাতাল যাতায়াত, চিকিৎসা ব্যয় জোগাড় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তাদের জীবনকে প্রভাবিত করে।
পরিবারের অনেক সদস্যের মধ্যে দেখা দেয় উদ্বেগ, হতাশা, অনিদ্রা ও বিষণ্ণতার লক্ষণ। শিশুদের পড়াশোনা ব্যাহত হতে পারে, দাম্পত্য সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে, এমনকি সামাজিক সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবু পরিবারের সদস্যরাই রোগীর সবচেয়ে বড় শক্তি। তাদের মানসিক সমর্থন রোগীর চিকিৎসা ও জীবনযুদ্ধকে সহজ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশে এখনও অনেক মানুষ ক্যানসার সম্পর্কে সচেতন নন। অনেক ক্ষেত্রে রোগ ধরা পড়ে দেরিতে, যখন চিকিৎসা আরও জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যানসার প্রতিরোধ ও প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণে গুরুত্ব দিলে চিকিৎসা ব্যয় কমানো এবং রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে প্রয়োজন স্বাস্থ্যবিমার বিস্তার, সরকারি সহায়তা বৃদ্ধি এবং সহজলভ্য ক্যানসার সেবা।
ক্যানসার কেবল একটি রোগ নয়; এটি একটি পরিবারকে দীর্ঘ সময় ধরে চলা সংগ্রামের মুখোমুখি দাঁড় করায়। চিকিৎসা, অর্থনৈতিক চাপ, মানসিক যন্ত্রণা এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা—সবকিছু মিলিয়ে এটি একটি বহুমাত্রিক সংকট।
তাই ক্যানসার মোকাবিলায় শুধু চিকিৎসা নয়, প্রয়োজন সামাজিক সহমর্মিতা, আর্থিক সহায়তা এবং শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা। কারণ একজন ক্যানসার রোগীর পাশে দাঁড়ানো মানে শুধু একজন মানুষকে নয়, একটি পুরো পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা।