২৪ জুন, ২০২৬
শরীর সুস্থ রাখা ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু দুনিয়াবি প্রয়োজন নয়; বরং এটি আল্লাহর দেওয়া আমানতের যথাযথ হক আদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একজন মুমিনের শক্তি, কর্মক্ষমতা ও সুস্থতা তাকে ইবাদত, দাওয়াত, জিহাদ, জীবিকা অর্জন এবং মানবসেবার কাজে অধিক সক্ষম করে তোলে।
বর্তমান যুগে জিম বা ব্যায়ামাগারে শরীরচর্চা একটি জনপ্রিয় মাধ্যম। ইসলাম সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম শরীর গঠনের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে। তবে সেই শরীরচর্চা হতে হবে শালীনতা, সংযম ও সঠিক নিয়তের ভিত্তিতে। মহান আল্লাহ মানুষকে সুন্দর গঠন ও সামর্থ্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন।
তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সর্বোত্তম আকৃতিতে সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা : তীন, আয়াত : ৪)
শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের তুলনায় আল্লাহর কাছে অধিক উত্তম ও অধিক প্রিয়। তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৬৪)
এখানে শক্তি বলতে শুধু ঈমানের শক্তি নয়; বরং শারীরিক শক্তিও অন্তর্ভুক্ত।
কারণ শারীরিক সক্ষমতা মানুষের নেক কাজ সম্পাদনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
ইসলামে জিম করার বিধান
জিম করা বা আধুনিক ব্যায়ামাগারে শরীরচর্চা মূলত একটি বৈধ কাজ। বরং যদি এর উদ্দেশ্য হয়—শরীর সুস্থ রাখা, ইবাদতের শক্তি অর্জন, রোগ প্রতিরোধ করা, কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করা, এবং আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের যত্ন নেওয়া তাহলে তা সওয়াবের কাজেও পরিণত হতে পারে।
তবে কয়েকটি শর্ত অবশ্যই মানতে হবে—
১. শরীরচর্চার উদ্দেশ্য অহংকার, প্রদর্শন বা অন্যকে হেয় করা হওয়া যাবে না।
২. পর্দা ও শালীনতা বজায় রাখতে হবে।
৩. নামাজ ও অন্যান্য ফরজ ইবাদত অবহেলা করা যাবে না।
৪. হারাম গান, অশ্লীলতা বা অনৈতিক পরিবেশ থেকে বেঁচে থাকতে হবে।
৫. শরীরের ক্ষতি হয় এমন স্টেরয়েড বা ক্ষতিকর উপকরণ ব্যবহার করা যাবে না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিদের শরীরচর্চা
ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও শারীরিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। তিনি হাঁটতেন, সফর করতেন, ঘোড়ায় আরোহণ করতেন, যুদ্ধক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করতেন এবং দৌড় প্রতিযোগিতায়ও অংশ নিয়েছেন।
১. তীরন্দাজি
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা তীরন্দাজি কর এবং ঘোড়সওয়ারি শিক্ষা কর। তবে আমার কাছে তীরন্দাজি অধিক প্রিয়।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ১৬৩৭)
তীরন্দাজি শুধু যুদ্ধবিদ্যা নয়; এটি মনোসংযোগ, ধৈর্য ও শারীরিক দক্ষতা বৃদ্ধির একটি উৎকৃষ্ট মাধ্যম।
২. ঘোড়দৌড়
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৮৭০)
৩. দৌড় প্রতিযোগিতা
আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছিলাম এবং আমি তাঁকে হারিয়ে দিয়েছিলাম।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২৫৭৮)
এ থেকে বোঝা যায়, সুস্থ বিনোদন ও শরীরচর্চা ইসলামে অনুমোদিত।
৪. মল্লযুদ্ধ
রাসুলুল্লাহ (সা.) বিখ্যাত মল্লযোদ্ধা রুকানা ইবনে ইয়াজিদের সঙ্গে কুস্তি লড়ে তাকে পরাজিত করেছিলেন। (সিরাতে ইবনে হিশাম, ১/৩৯০)
এ ঘটনা তাঁর শারীরিক সক্ষমতারও প্রমাণ বহন করে।
৫. ভারোত্তোলনের চর্চা
সাহাবিদের যুগে পাথর উত্তোলনের মাধ্যমে শক্তি পরীক্ষা করার প্রচলন ছিল। এটি বর্তমান যুগের ভারোত্তোলন বা ওয়েট ট্রেনিংয়ের সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ।
জিম ও ইবাদতের সম্পর্ক
অনেকে মনে করেন, শরীরচর্চা শুধু খেলাধুলা বা সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে সুস্থ শরীর ইবাদতের অন্যতম সহায়ক। কেননা সুস্থ শরীর নামাজে একাগ্রতা বাড়ায়। রোজা পালনে সহায়তা করে। হজ ও ওমরার কষ্ট সহ্য করতে সক্ষম করে। জীবিকা অর্জনে শক্তি যোগায়। পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব পালনে সাহায্য করে। তাইতো রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমার শরীরেরও তোমার ওপর অধিকার রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯৬৮)
মুসলিম যুবকদের জন্য করণীয়
বর্তমান যুগে মোবাইল, অলসতা ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কারণে অনেক তরুণ শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। একজন মুসলিম যুবকের উচিত—নিয়মিত ব্যায়াম করা, হাঁটাহাঁটি করা, সাইকেল চালানো, দৌড়ানো, সাঁতার শেখা, পরিমিত ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুমানো, এবং ক্ষতিকর নেশা থেকে দূরে থাকা। এসব অভ্যাস একজন যুবককে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় ক্ষেত্রেই উপকৃত করবে।
জিম করা বা শরীরচর্চা করা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়; বরং সৎ উদ্দেশ্য, শালীনতা ও মধ্যপন্থা বজায় রেখে করা হলে তা প্রশংসনীয় আমল হতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) শক্তিশালী মুমিনের প্রশংসা করেছেন এবং তীরন্দাজি, দৌড়, ঘোড়সওয়ারি ও মল্লযুদ্ধের মতো শরীরচর্চামূলক কার্যক্রমে উৎসাহ দিয়েছেন। আজকের যুগে জিম সেই শরীরচর্চারই আধুনিক রূপ। অতএব একজন মুমিনের উচিত নিজের শরীরকে আল্লাহর আমানত মনে করে তার যথাযথ যত্ন নেওয়া, যেন সে সুস্থ দেহে ইবাদত করতে পারে, সমাজের কল্যাণে কাজ করতে পারে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। শরীরের শক্তি যখন তাকওয়া, ইবাদত ও মানবসেবার পথে ব্যয় হয়, তখন তা শুধু ব্যায়াম নয়—বরং ইবাদতেরই একটি অংশে পরিণত হয়।