২৬ জুন, ২০২৬
ব্যক্তিগত জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা পেশাগত দায়িত্ব- প্রতিটি ক্ষেত্রেই সততা ইসলামের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা। বিশেষ করে লেনদেনে সততা ঈমানের দাবি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
আজকের বিশ্বে প্রতারণা, ভেজাল, মিথ্যা প্রচার ও ওজনে কম দেওয়ার মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ড সমাজে নানা সংকট তৈরি করছে। ইসলাম এসবের বিপরীতে সততা, স্বচ্ছতা ও ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার শিক্ষা দেয়।
লেনদেনে সততার নির্দেশ
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মাপে পূর্ণ মাত্রায় দেবে; আর যারা মাপে কম দেয় তোমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে না।’ (সুরা শুআরা: ১৮১)
অন্য আয়াতে আরও কঠোরভাবে বলা হয়েছে, ‘দুর্ভোগ তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়। যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেয়, তখন পূর্ণমাত্রায় নেয়; আর যখন তাদের জন্য মাপে বা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।’ (সুরা মুতাফফিফিন: ১–৩)
এ আয়াতগুলো প্রমাণ করে, লেনদেনে সামান্য অসততাও আল্লাহর কাছে গুরুতর অপরাধ।
ব্যবসায় সততার মর্যাদা
রাসুলুল্লাহ (স.) সৎ ব্যবসায়ীর অসাধারণ মর্যাদার কথা জানিয়েছেন এভাবে, ‘সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কেয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহিদদের সঙ্গে থাকবে।’ (জামে তিরমিজি: ১২০৯)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, ব্যবসায় সততা শুধু পার্থিব সাফল্য নয়; আখেরাতেও সর্বোচ্চ মর্যাদার কারণ।
প্রতারণা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ
একবার রাসুলুল্লাহ (স.) বাজারে একটি খাদ্যশস্যের স্তূপে হাত দিয়ে ভেতরে ভেজা অংশ দেখতে পান। বিক্রেতা বললেন, এতে বৃষ্টি পড়েছিল। তখন নবী (স.) বললেন, ‘কেন তুমি ভেজা অংশ খাদ্যশস্যের উপরে রাখনি, যাতে লোকেরা তা দেখতে পায়। যে ব্যাক্তি ধোকা দেয়, সে আমার সাথে কোনো সম্পর্ক রাখে না।’ (সহিহ মুসলিম: ১০২)
ত্রুটি গোপন করা বৈধ নয়
কোনো পণ্যের ত্রুটি জেনেও তা গোপন করে বিক্রি করা ইসলামে নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই যদি সত্য বলে এবং ত্রুটি স্পষ্ট করে, তবে তাদের বেচাকেনায় বরকত দেওয়া হয়। আর যদি তারা মিথ্যা বলে ও ত্রুটি গোপন করে, তবে তাদের বেচাকেনার বরকত নষ্ট হয়ে যায়।’ (সহিহ বুখারি: ২০৭৯; সহিহ মুসলিম: ১৫৩২)
আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা
লেনদেনের সঙ্গে আমানত ও প্রতিশ্রুতিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা আমানত তার প্রাপকের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সুরা নিসা: ৫৮)
আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করো।’ (সুরা মায়িদা: ১)
ঋণ পরিশোধের বিষয়েও ইসলামের নির্দেশনা স্পষ্ট। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ ফেরত দেওয়ার নিয়তে গ্রহণ করে, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা আদায় করে দেন। আর যে ব্যক্তি তা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে গ্রহণ করে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করে দেন।’ (সহিহ বুখারি: ২৩৮৭)
ডিজিটাল লেনদেনেও একই নীতি
বর্তমানে অনলাইন ব্যবসা ও ই-কমার্সের যুগে ইসলামের সততার শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। পণ্যের প্রকৃত তথ্য দেওয়া, ভুয়া রিভিউ না করা, সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা, গ্রাহকের অর্থ ও তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা- এসবই ইসলামের সততার নীতির অন্তর্ভুক্ত। একইভাবে মিথ্যা বিজ্ঞাপন, ভুয়া ছাড় দেখানো, নকল বা নিম্নমানের পণ্য বিক্রি এবং গ্রাহককে বিভ্রান্ত করাও ইসলামের দৃষ্টিতে অসততা।
মোটকথা, লেনদেনে সততা ইসলামের একটি মৌলিক শিক্ষা। এটি শুধু ব্যবসায়ীদের জন্য নয়; বরং ক্রেতা, বিক্রেতা, চাকরিজীবী, উদ্যোক্তা সবার জন্য সমান প্রযোজ্য। একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয় তার নামাজ-রোজার পাশাপাশি তার সততা ও আমানতদারিতার মধ্যেও প্রকাশ পায়। সততা শুধু মানুষের বিশ্বাস অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি দুনিয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যে বরকত লাভ এবং আখিরাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম পথ।