‘আমার বিশ্বাস যে কান্নার শব্দ শুনেছি, সেটি আমার ছেলের’

২৯ জুন, ২০২৬

‘যে কান্নার শব্দ শুনেছি, সেটি আমার ছেলের।’ ভেনেজুয়েলার ভয়াবহ ভূমিকম্পে ধসে পড়া একটি ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে এ কথাই বলছিলেন আন্দ্রেইনা ভ্যালেরিও। স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ ওই ভূমিকম্পে তার প্রায় দুই বছর বয়সী ছেলে সান্তিয়াগো, সঙ্গী রামসেস মেন্দোজাসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্য ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন। তবে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে শিশুর কান্নার শব্দ শুনতে পান তিনি। ভ্যালেরিওর ধারণা, ওই কান্নার শব্দ তার শিশুর। ছেলে এখনো জীবিত আছে বলে বিশ্বাস তার।

আন্দ্রেইনা ভ্যালেরিওর ভাষ্যমতে, ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানার দিন তিনি কাজ থেকে তাড়াহুড়ো করে ফিরে আসেন তার প্রায় দুই বছর বয়সী ছেলে সান্তিয়াগোকে খুঁজতে। সান্তিয়াগো তখন আন্দ্রেইনা ভ্যালেরিওর সঙ্গী রামসেস মেন্দোজার সঙ্গে লা গুয়াইরায় তার শ্বশুরবাড়িতে ছিল।

সেখানে পৌঁছে তিনি দেখেন, ভবনটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তার ভাশুর স্যামুয়েল মেন্দোজা ভেঙে পড়া অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ধ্বংসস্তূপে খোঁজাখুঁজি করছিলেন।

শনিবার ধসে পড়া ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আন্দ্রেইনা বলেন, তার ছেলে সান্তিয়াগো, সঙ্গী রামসেস মেন্দোজা এবং রামসেসের পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা আছেন। তবে তিনি আশা হারাননি।

আন্দ্রেইনা ও স্যামুয়েল জানান, ভবনটিতে আরও কয়েকটি শিশু আটকে আছে-নয় বছর বয়সী লুকাস এবং তিন বছর বয়সী আরাঞ্জা। শনিবার এল সালভাদর ও স্পেন থেকে উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। কিন্তু তারা ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি। তখন পর্যন্ত ওই ভবন থেকে কাউকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

ভূমিকম্পের পরের প্রথম সকালে স্যামুয়েল বলেন, তিনি একটি নারীকণ্ঠ শুনতে পান। ‘প্রথমে আমি বুঝতে পারছিলাম না তিনি কী বলছেন। কেবল ‘বাঁচাও’ শব্দটি শুনতে পাই।’


পরদিন আন্দ্রেইনা ভ্যালেরিও ধ্বংসস্তূপে গিয়ে শিশুর কান্নার শব্দ শুনতে পান। তিনি বলেন, ‘আমার এখনো বিশ্বাস, আমার ছেলে বেঁচে আছে। আমি বিশ্বাস করি, যে কান্নার শব্দ শুনেছি সেটি আমার ছেলের। আমি জানি, আমার ছেলে এবং তার পরিবার এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠবে।’

আন্দ্রেইনা ও স্যামুয়েলের মতো আরও অনেক ভেনেজুয়েলাবাসী ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা স্বজনদের খুঁজছেন। তাদের আশা, উদ্ধারকারীরা তাদের জীবিত উদ্ধার করতে পারবেন।

উপকূলীয় অঞ্চল লা গুয়াইরা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি। সেখানে অনেক পরিবার খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে স্বজনদের খুঁজছে। তারা সবাই ঘুমহীন, আর্তচিৎকার করতে করতে তাদের কণ্ঠস্বর ভেঙে গেছে।

শুক্রবার সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবেশীরা সাহায্যে এগিয়ে আসে। ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও মানুষ সহায়তা দিতে আসে। দেশজুড়ে উদ্ধারকর্মীরা নিরলসভাবে কাজ করছেন।

ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের প্রেসিডেন্ট হোর্হে রদ্রিগেজ বলেন, ‘গত ১২৩ বছরে এই প্রজাতন্ত্র যে দুর্যোগ দেখেছে, এটি তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ।’ দেশটিতে সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৩০ জনে। আহত হয়েছেন ৩ হাজার ২৩৮ জন।

তবে এখনো কয়েক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের খুঁজে বের করতে জরুরি সেবাকর্মীরা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন।

লা গুয়াইরার রাস্তায় পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের দেখা গেছে। অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানান, নিরাপত্তার জন্য সেখানে ১৪ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং এলাকাটি কার্যত সামরিক নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। সূত্র: বিবিসি।