তান্ত্রিকের কিছু ভবিষ্যদ্বাণী কেন মিলে যায়? কোরআন-সুন্নাহ কী বলে

০১ জুলাই, ২০২৬

নির্বাচন, যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অন্যান্য বড় আন্তর্জাতিক ঘটনাকে ঘিরে প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তান্ত্রিক, গণক ও জ্যোতিষীদের নানা ভবিষ্যদ্বাণী ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। কখনো দেখা যায়, তাদের কিছু কথা বাস্তব ঘটনার সঙ্গে মিলে গেছে। বিশ্বকাপের মতো বড় ক্রীড়া আসর এলেও এমন ভবিষ্যদ্বাণী নতুন করে আলোচনায় আসে। তখন অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে- তাহলে কি তারা সত্যিই ভবিষ্যৎ জানে?

কোরআন ও সহিহ হাদিস এ বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। ভবিষ্যৎ বা গায়েবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলার। কোনো মানুষ, জ্বিন, তান্ত্রিক বা জ্যোতিষী স্বাধীনভাবে গায়েবের খবর জানে না। তবে কিছু ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবতার সঙ্গে মিলে যাওয়ার পেছনে ইসলাম যে ব্যাখ্যা দিয়েছে, তা জানা মুসলমানের জন্য জরুরি।

গায়েবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, আল্লাহ ব্যতীত আসমান ও জমিনে কেউই গায়েব জানে না’ (সুরা নামল: ৬৫)

অন্য আয়াতে তিনি বলেন, ‘তাঁর কাছেই রয়েছে গায়েবের চাবিসমূহ। তিনি ছাড়া কেউ তা জানে না।’ (সুরা আনআম: ৫৯)

এসব আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়, ভবিষ্যৎ বা অদৃশ্য জগতের পূর্ণ জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছেই রয়েছে। কোনো তান্ত্রিক, গণক, জ্যোতিষী কিংবা অলৌকিক ক্ষমতার দাবিদার ব্যক্তি নিজ থেকে ভবিষ্যৎ জানতে পারে না।

তাহলে কিছু ভবিষ্যদ্বাণী মিলে যায় কেন?

রাসুলুল্লাহ (স.) এ প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন। সহিহ হাদিসে এসেছে, কখনো কখনো শয়তান বা জ্বিন আকাশে ফেরেশতাদের কিছু আলোচনা গোপনে শুনে ফেলে। এরপর সেই একটি সত্য কথার সঙ্গে বহু মিথ্যা যোগ করে গণক বা তান্ত্রিকের কাছে পৌঁছে দেয়। মানুষ সাধারণত যে একটি কথা বাস্তবের সঙ্গে মিলে যায় সেটিই মনে রাখে; কিন্তু যেসব ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণিত হয়, সেগুলো সহজেই ভুলে যায়।

অর্থাৎ, একটি ঘটনা মিলে যাওয়াই তান্ত্রিকের সত্যবাদিতার প্রমাণ নয়। বরং এটি মানুষের জন্য একটি পরীক্ষা যে, সে কি আল্লাহর ওপর ভরসা করবে, নাকি বিভ্রান্তির পথে যাবে।

অনুমান, অভিজ্ঞতা ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশল

সব তান্ত্রিকই যে জ্বিন-শয়তানের সাহায্য নেয়, এমন নয়। অনেকেই মানুষের আচরণ, সামাজিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক প্রবণতা, পরিসংখ্যান কিংবা সম্ভাব্য ঘটনার বিশ্লেষণের ভিত্তিতে অনুমান করে কথা বলে।

এ ছাড়া তারা প্রায়ই এমন অস্পষ্ট ভাষা ব্যবহার করে, যা বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া সম্ভব। পরে কোনো একটি ঘটনা ঘটলে মানুষ সেটিকেই মনে রাখে। মনোবিজ্ঞানে একে কনফারমেশন বায়াস বা নিশ্চিতকরণ পক্ষপাত বলা হয়।

তারা যদি ভবিষ্যৎ জানত, নিজের ভাগ্য জানে না কেন?

এখানে একটি সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। যদি কোনো তান্ত্রিক সত্যিই ভবিষ্যৎ জানত, তবে সে নিজের জীবনের দুর্ঘটনা, অসুস্থতা, আর্থিক ক্ষতি কিংবা অন্যান্য অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আগেই জানতে পারত এবং তা এড়িয়ে চলতে সক্ষম হতো।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, তারাও অন্য সবার মতোই অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করে। এতে স্পষ্ট হয়, তারা গায়েবের অধিকারী নয়; বরং অনুমান, প্রতারণা কিংবা শয়তানের ধোঁকার ওপর নির্ভর করে মানুষের বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করে।

ইস্তিদরাজ: সাময়িক সফলতা মানেই আল্লাহর সন্তুষ্টি নয়

ইসলামে ইস্তিদরাজ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা রয়েছে। কখনো কখনো আল্লাহ তাআলা কোনো অবাধ্য ব্যক্তিকে অবকাশ দেন এবং পার্থিব কিছু সফলতা বা সুযোগ দেন, যাতে সে নিজের ভ্রান্তিতে আরও গভীরে ডুবে যায়। 
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, আমি তাদের এমনভাবে ধীরে ধীরে পাকড়াও করব, যা তারা বুঝতেও পারবে না।’ (সুরা আরাফ: ১৮২)

তবে কোনো নির্দিষ্ট তান্ত্রিকের কিছু কথা মিলে যাওয়াকে নিশ্চিতভাবে ‘ইস্তিদরাজ’ বলা যায় না। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত যে, সাময়িক সফলতা, জনপ্রিয়তা বা মানুষের প্রশংসা কখনোই সত্যের মানদণ্ড নয়। একজন মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার ঈমান, তাকওয়া ও আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে।

গণকের কাছে যাওয়া সম্পর্কে ইসলামের কঠোর সতর্কবার্তা

ইসলাম শুধু তান্ত্রিকের দাবি প্রত্যাখ্যান করেই থেমে থাকেনি; তাদের কাছে যেতেও কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছে।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে গিয়ে তাকে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞাসা করবে, তার চল্লিশ দিনের নামাজ কবুল হবে না।’ (সহিহ মুসলিম)

অন্য হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি গণক বা জ্যোতিষীর কাছে গিয়ে তার কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করল, সে মুহাম্মদ (স.)-এর ওপর অবতীর্ণ বিধানের সঙ্গে কুফরি করল।’ (মুসনাদ আহমাদ, আবু দাউদ ও তিরমিজি)

আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন, এখানে এমন বিশ্বাসকে বোঝানো হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি স্বাধীনভাবে গায়েব জানে। এটি ইসলামের মৌলিক আকিদার পরিপন্থী।

সত্য স্বপ্ন ও তান্ত্রিকের গণনা এক নয়

অনেক মানুষ নেককার ব্যক্তির সত্য স্বপ্ন এবং তান্ত্রিকের ভবিষ্যদ্বাণীকে এক করে ফেলেন। অথচ ইসলাম এ দুটির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য করেছে।

রাসুলুল্লাহ (স.) জানিয়েছেন, মুমিনের সত্য স্বপ্ন (রু’ইয়ায়ে সালিহা) নবুয়তের সুসংবাদের একটি অংশ। তবে তা কখনো শরিয়তের নতুন বিধান দেয় না, ভবিষ্যৎ জানার নির্ভরযোগ্য মাধ্যমও নয়।

অন্যদিকে তান্ত্রিকের দাবি গড়ে ওঠে জ্বিন-শয়তানের প্ররোচনা, প্রতারণা, অনুমান কিংবা মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার ওপর। তাই সত্য স্বপ্নের সঙ্গে তান্ত্রিকের গণনার কোনো তুলনা হতে পারে না।

সতর্কতা

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক ব্যক্তি তাবিজ, ভাগ্য গণনা কিংবা ভবিষ্যদ্বাণীর নামে মানুষের সরল বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসা করছে। তারা এমন সাধারণ বা অস্পষ্ট কথা বলে, যা অনেক মানুষের জীবনেই মিলে যেতে পারে। এরপর সেই সামান্য মিলকেই অলৌকিক ক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে প্রচার করা হয়।

তাই কোনো ভিডিও, পোস্ট বা প্রচারিত দাবিতে প্রভাবিত না হয়ে মুসলমানের কর্তব্য হলো কোরআন-সুন্নাহর আলোকে বিষয়গুলো যাচাই করা এবং প্রতারণা থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

মুসলিমের করণীয়

কোরআন-সুন্নাহ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, গায়েবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলার। কোনো কোনো সময় শয়তানের মাধ্যমে পাওয়া একটি সত্য খবর, সম্ভাবনার ভিত্তিতে করা অনুমান কিংবা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতার কারণে কিছু কথা মিলে যেতে পারে। কিন্তু এসবের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা বা ভবিষ্যৎ জানার জন্য তান্ত্রিকের দ্বারস্থ হওয়া একজন মুসলমানের ঈমানের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। সুতরাং ভবিষ্যৎ জানার কৌতূহলে বিভোর না হয়ে তওবা, ইস্তিগফার, দোয়া, সৎকর্ম এবং আখেরাতের প্রস্তুতিই একজন মুসলমানের প্রকৃত সফলতার চাবিকাঠি।