০৩ জুলাই, ২০২৬
একজন মুসলমানের জীবনে প্রতিটি বৈধ কাজই আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সম্পাদিত হলে তা ইবাদতে পরিণত হয়। আর সেই কাজের সূচনা যদি হয় আল্লাহর নাম স্মরণ করে, তাহলে তা শুধু একটি সুন্দর অভ্যাসই নয়; বরং সুন্নাহর অনুসরণও বটে। এ কারণেই ইসলাম খাওয়া-দাওয়া, কোরআন তেলাওয়াত, পশু জবাই, ঘরে প্রবেশ, চিঠি লেখা এবং অন্যান্য বৈধ কাজের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বা সংক্ষেপে ‘বিসমিল্লাহ’ বলার শিক্ষা দিয়েছে।
প্রশ্ন হলো- কোনো কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ পড়লে কী হয়? কোরআন-সুন্নাহ এ বিষয়ে কী শিক্ষা দেয়? আসুন, কোরআন-হাদিস থেকে বিস্তারিত জেনে নিই।
বিসমিল্লাহ অর্থ কী?
‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ অর্থ ‘পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)।’ এ বাক্যের মাধ্যমে একজন মুমিন ঘোষণা করেন, তিনি নিজের শক্তি বা সামর্থ্যের ওপর নয়; বরং আল্লাহর সাহায্য, রহমত ও তাওফিকের ওপর নির্ভর করে কাজ শুরু করছেন।
১. কাজে বরকত ও কল্যাণের আশা করা যায়
আল্লাহর নাম নিয়ে কাজ শুরু করা ইসলামের অন্যতম শিষ্টাচার। এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর রহমত ও বরকত কামনা করেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পড়ুন আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা আলাক: ১)
আলেমরা বলেন, এ আয়াত থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়- বৈধ কাজ আল্লাহর স্মরণে শুরু করা উচিত।
২. শয়তানের প্রভাব থেকে সুরক্ষা মেলে
বিসমিল্লাহর অন্যতম বড় ফজিলত হলো, এটি শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বান্দাকে রক্ষা করে।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কেউ যখন ঘরে প্রবেশের সময় এবং খাবারের সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে, তখন শয়তান তার সঙ্গীদের বলে, ‘আজ তোমাদের থাকার জায়গাও নেই, রাতের খাবারও নেই।’ (সহিহ মুসলিম)
৩. খাবারে শয়তানের অংশগ্রহণ হয় না
খাবার শুরু করার আগে বিসমিল্লাহ বলা সুন্নত।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যখন খাবার খাবে, সে যেন আল্লাহর নাম নিয়ে শুরু করে। যদি শুরুতে বলতে ভুলে যায়, তবে বলবে- ‘বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু।’ (সুনানে আবু দাউদ, সুনানে তিরমিজি)
অন্য হাদিসে এসেছে, ‘যে খাবারে আল্লাহর নাম নেওয়া হয় না, সে খাবারে শয়তান অংশগ্রহণ করে।’ (সহিহ মুসলিম)
৪. শয়তানের শক্তি দুর্বল হয়ে যায়
এক সাহাবি (রা.) বর্ণনা করেন, একবার রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সঙ্গে সফরে থাকাকালে বাহনের পা হোঁচট খেলে তিনি বললেন, ‘শয়তান ধ্বংস হোক।’ তখন নবী (স.) বললেন, ‘শয়তান ধ্বংস হোক’ বলো না, বরং ‘বিসমিল্লাহ’ বলো। এতে শয়তান এত ছোট হয়ে যায় যে, সে মাছির মতো হয়ে পড়ে। (মুসনাদে আহমাদ)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর নাম স্মরণ শয়তানের প্রভাবকে দুর্বল করে দেয়।
৫. বৈধ কাজ ইবাদতে পরিণত হয়
একজন মুসলমান যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বৈধ কোনো কাজ তাঁর নাম নিয়ে শুরু করেন, তখন সেই কাজও সওয়াবের কারণ হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু সবই বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।’ (সুরা আনআম: ১৬২)
তাই ব্যবসা, পড়াশোনা, লেখালেখি, ভ্রমণ কিংবা অন্য যেকোনো হালাল কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা উত্তম।
৬. আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীলতার প্রকাশ ঘটে
বিসমিল্লাহ পাঠ একজন মুমিনের ঈমানি ঘোষণা। এর মাধ্যমে তিনি স্বীকার করেন যে, সাফল্য, তাওফিক ও কল্যাণ একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। এই বিশ্বাস মানুষের অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভরসা (তাওয়াক্কুল) দৃঢ় করে, অহংকার থেকে দূরে রাখে এবং প্রতিটি কাজে তাঁর সাহায্য ও রহমতের আশা জাগ্রত করে।
৭. গুরুত্বপূর্ণ কাজ আল্লাহর নামে শুরু করার উৎসাহ
হাদিসে এসেছে, ‘প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ, যা আল্লাহর নাম দিয়ে শুরু করা হয় না, তা অপূর্ণ (বা বরকতশূন্য) থেকে যায়।’
এ হাদিসটি বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। যদিও এর সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে, তবুও বহু আলেম গুরুত্বপূর্ণ ও বৈধ কাজ আল্লাহর নাম নিয়ে শুরু করার উৎসাহে এটি উল্লেখ করেছেন।
কোথায় কোথায় বিসমিল্লাহ বলা সুন্নত?
কোরআন-সুন্নাহর আলোকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিসমিল্লাহ বলার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। যেমন-
‘৭৮৬’ কি বিসমিল্লাহর বিকল্প?
উপমহাদেশে অনেকেই ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’-এর পরিবর্তে ‘৭৮৬’ লেখেন। কিন্তু কোরআন বা সহিহ হাদিসে ৭৮৬-কে বিসমিল্লাহর বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের কোনো প্রমাণ নেই। অধিকাংশ আলেম বিসমিল্লাহর পরিবর্তে ৭৮৬ লেখার পরিবর্তে সরাসরি ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ লেখাকেই সুন্নতের অনুসরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিসমিল্লাহর মর্যাদা রক্ষা করা জরুরি
বিসমিল্লাহ কোরআনের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ বাক্য। তাই যেসব পোস্টার, লিফলেট বা কাগজ পরে ফেলে দেওয়া হতে পারে বা অসম্মানিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, সেগুলোতে বিসমিল্লাহ লেখা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ অনেক আলেম দিয়েছেন। এমন ক্ষেত্রে মুখে বিসমিল্লাহ পড়ে কাজ শুরু করাই অধিক নিরাপদ।
আমাদের করণীয়
বিসমিল্লাহ উচ্চারণ একজন মুমিনের বিশ্বাস, বিনয় ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার প্রকাশ। তাই খাওয়া-দাওয়া, পড়াশোনা, ব্যবসা, ভ্রমণ, লেখালেখি, পারিবারিক জীবন কিংবা অন্য যেকোনো বৈধ কাজের শুরুতে আল্লাহর নাম স্মরণ করার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। অতএব, প্রতিটি ভালো কাজের শুরু হোক ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ দিয়ে আল্লাহর রহমত, বরকত ও সাহায্যের প্রত্যাশায়।