০৩ জুলাই, ২০২৬
মানুষের স্বভাব হলো বড় গুনাহ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করা, কিন্তু এমন অনেক গুনাহ আছে, যেগুলোকে আমরা তেমন গুরুত্ব দিই না। ‘এটুকু করলে কী হবে!’, ‘সবাই তো করছে’ কিংবা ‘পরে তওবা করে নেব’- এমন ভাবনা থেকেই অনেক সময় মানুষ এমন কাজ করে বসে, যা আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
রাসুলুল্লাহ (স.) ছোট মনে করা গুনাহ সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন, ‘তোমরা তুচ্ছ মনে করা গুনাহ থেকে সাবধান থাকো। কারণ এগুলো মানুষের ওপর একত্রিত হতে হতে তাকে ধ্বংস করে দেয়।’ (মুসনাদ আহমাদ)
তাই কোনো গুনাহকেই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। নিচে এমন ১০টি গুনাহ তুলে ধরা হলো, যেগুলোকে মানুষ অনেক সময় তুচ্ছ মনে করে, অথচ কোরআন-সুন্নাহয় সেগুলোর ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা এসেছে।
১. গিবত (পরনিন্দা)
অনেকেই মনে করেন, কারও অনুপস্থিতিতে তার দোষের কথা বললে তেমন সমস্যা নেই। অথচ আল্লাহ তাআলা গিবতকে মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করার সঙ্গে তুলনা করেছেন। ‘তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে?’ (সুরা হুজরাত: ১২)
২. নামিমা (চোগলখুরি)
একজনের কথা আরেকজনের কাছে এমনভাবে পৌঁছে দেওয়া, যাতে তাদের মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট হয়- এটি অত্যন্ত মারাত্মক গুনাহ। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম)
৩. যাচাই না করে সংবাদ বা পোস্ট ছড়িয়ে দেওয়া
ডিজিটাল যুগে এটি খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! কোনো ফাসিক ব্যক্তি যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও।’ (সুরা হুজরাত: ৬)
৪. হারাম দৃশ্যের দিকে তাকানো
অনেকে মনে করেন, একবার তাকালে ক্ষতি কী! অথচ আল্লাহ তাআলা দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। ‘মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।’ (সুরা নূর: ৩০) (একই নির্দেশ মুমিন নারীদের জন্যও রয়েছে- আয়াত ৩১)
৫. আমানতের ব্যাপারে অবহেলা
অন্যের টাকা, জিনিস বা দায়িত্ব যথাযথভাবে রক্ষা না করা বা সময়মতো ফেরত না দেওয়াকে অনেকে তেমন গুরুত্ব দেন না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও রাসুলের সঙ্গে খেয়ানত করো না এবং জেনে-শুনে নিজেদের আমানতেরও খেয়ানত করো না।’ (সুরা আনফাল: ২৭)
৬. প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা
কথা দিয়ে কথা না রাখা, অকারণে ওয়াদা ভঙ্গ করা বা দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়াকে অনেকে স্বাভাবিক মনে করেন। রাসুলুল্লাহ (স.) মুনাফিকের অন্যতম লক্ষণ হিসেবে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কথা উল্লেখ করেছেন। (সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম)
৭. অহংকার ও মানুষকে তুচ্ছ মনে করা
অহংকার শুধু দামি পোশাক পরা নয়; বরং সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছ মনে করাই প্রকৃত অহংকার। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ মুসলিম)
৮. নামাজের ব্যাপারে উদাসীনতা
শুধু নামাজ পড়লেই দায়িত্ব শেষ নয়; সময়মতো, মনোযোগের সঙ্গে এবং গুরুত্ব দিয়ে নামাজ আদায় করাও জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব দুর্ভোগ সেই সব নামাজিদের জন্য, যারা তাদের নামাজ সম্পর্কে উদাসীন।’ (সুরা মাউন: ৪–৫)
৯. অপচয়
খাবার, পানি, বিদ্যুৎ বা অর্থ- অপ্রয়োজনে অপচয় করাকে অনেকেই সাধারণ বিষয় মনে করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ (সুরা ইসরা: ২৭)
১০. গুনাহকে হালকাভাবে নিয়ে তওবা বিলম্ব করা
‘পরে তওবা করব’- এ চিন্তা মানুষকে গুনাহের মধ্যে আটকে রাখে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর দিকে ফিরে আসো, যাতে সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা নূর: ৩১) অন্য আয়াতে এসেছে, ‘আল্লাহ তাদেরই তাওবা কবুল করেন, যারা না জেনে মন্দ কাজ করার পর অচিরেই তাওবা করে।’ (সুরা নিসা: ১৭)
কেন তুচ্ছ মনে করা গুনাহও ভয়াবহ?
আলেমরা বলেন, একটি গুনাহের ভয়াবহতা শুধু তার ধরনে নয়; বরং মানুষের মনোভাবেও নির্ভর করে। যখন কেউ-
তখন সেই গুনাহ তার ঈমান ও আমলের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আমাদের করণীয়
একজন মুমিন কখনো কোনো গুনাহকে তুচ্ছ মনে করেন না। কারণ তিনি জানেন, প্রতিটি গুনাহই আল্লাহর অবাধ্যতা। তাই প্রতিদিন আত্মসমালোচনা করা, বেশি বেশি ইস্তেগফার করা, ভুল বুঝতে পারলে দ্রুত তওবা করা এবং কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার চেষ্টা করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব।
মনে রাখতে হবে, অনেক সময় মানুষ যে গুনাহকে তুচ্ছ মনে করে, আখেরাতে সেই গুনাহই তার জন্য কঠিন জবাবদিহির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই কোনো গুনাহকে হালকাভাবে না নিয়ে, আল্লাহর ক্ষমা ও রহমতের আশায় সর্বদা তাঁর দিকে ফিরে আসাই একজন মুমিনের প্রকৃত পথ।