মা-বাবার বিচ্ছেদ, ভাঙনের দাগ রয়ে যায় সন্তানের জীবনে

০৮ জুলাই, ২০২৬

বিচ্ছেদ— সম্পর্কের একটি বেদনাদায়ক স্বাভাবিক বিষয়। দুজন মানুষের দাম্পত্য জীবনে যখন ভালোবাসার অভাব, সম্মানের ঘাটতি, মতের অমিল মাথা উঁচিয়ে দাঁড়ায়, তখন বিচ্ছেদকেই তারা সহজ সমাধান হিসেবে বেছে নেন। দাম্পত্য জীবন যদি দুজনের হয় তাহলে তারা আলাদাভাবে নিজেদের জীবন সাজাতে পারেন কিংবা নতুন জীবন শুরু করতে পারেন। কিন্তু সংসারে যদি সন্তান থাকে তখন প্রেক্ষাপট হয় ভিন্ন। মা-বাবা নিজেদের জীবন গুছিয়ে নিতে পারলেও সন্তানের জীবন হয়ে যায় এলোমেলো। না পায় মা কে পুরোপুরি, না পায় বাবাকে। আমৃত্যু ভাঙনের দাগ রয়ে যায় তার জীবনে। 

একটি পরিবারের ভাঙন মানে কেবল দুটি মানুষের সম্পর্কের সমাপ্তি নয়; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সন্তানের মনোজগৎ, আচরণ, ভবিষ্যতের সম্পর্ক এবং জীবনবোধেও। বিচ্ছেদের পর আদালতের কাগজে যে অধ্যায়ের শেষ হয় তা অনেক সন্তানের অনিশ্চিত জীবনের সূচনা করে।  

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশুদের কাছে নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় আশ্রয় মা-বাবা। সেই আশ্রয় ভেঙে গেলে তারা কেবল পরিবার হারায় না, হারিয়ে ফেলে পরিচিত জীবনের ছন্দও। অনেক শিশু হয়ত বুঝতেই পারে না, কেন হঠাৎ করে মা আর বাবা পাশাপাশি রোজ থাকছেন না। কেউ নিজের ভুল খুঁজতে থাকে, কেউবা মনের ভেতর ক্ষোভ জমাতে থাকে। 

নীরব পরিবর্তন, যা চোখের আড়ালে থেকে যায় 

বিচ্ছেদের পর অনেক শিশুর আচরণ বদলে যায়। হারিয়ে যায় তার প্রাণবন্ত ভাব। কেউ হয়ে ওঠে অতিরিক্ত রাগী। কমে যায় পড়াশোনার মনোযোগ, ঘুম কিংবা খাওয়ার চাহিদা। কিছু শিশু বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে চায় না, আবার কেউ আগের চেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক আচরণ করে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই পরিবর্তন সব সময় সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় না। অনেক সময় কয়েক বছর পর, কৈশোরে বা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে মা-বাবার বিচ্ছেদের কারণে হওয়া এসব প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে তৈরি হয় ভয়

যে শিশুটি ছোটবেলায় মা-বাবার সম্পর্ক ভেঙে যেতে দেখেছে, তার কাছে ভালোবাসা ও স্থায়ী সম্পর্কের ধারণা অনেক সময় দুর্বল হয়ে যায়। ভবিষ্যতে নিজের সম্পর্কে জড়ানোর সময় সে সহজে কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। ‘আমার মা-বাবার সম্পর্কই টেকেনি, আমারটা কী টিকবে?’, ‘কেউ কি আমাকে ভালোবাসবে?’, ‘সে ও কি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে?’— এমন নানা অজানা আতঙ্ক গ্রাস করে নেন তাকে।

অবশ্য সবার ক্ষেত্রে এটি সত্য নয়। অনেক সন্তান বাবা-মায়ের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের সম্পর্কে আরও সচেতন হওয়ার চেষ্টা করে। ভালোবাসার মানুষকে নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে আগলে রাখতে চায় তারা। 

আর্থিক ও সামাজিক চাপ

বিচ্ছেদের পর অনেক পরিবারে আর্থিক চাপ বাড়ে। একক অভিভাবকের ওপর সংসার ও সন্তানের দায়িত্ব এসে পড়ে। এতে সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা আগের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসতে পারে। সামাজিক চাপও কম হয় না। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে অনেক শিশু এখনও সহপাঠী বা আত্মীয়স্বজনের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। এসব পরিস্থিতি তাদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়। 

আবার একসঙ্গে থাকলেও কি সব আগের মতো হয়?

অনেক দম্পতি বিচ্ছেদের পর আবার এক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সম্পর্কের মূল সমস্যাগুলোর সমাধান হলে এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু শুধু একই ছাদের নিচে ফিরে এলেই সব আগের জায়গায় ফিরে যায় না। দীর্ঘদিনের দূরত্ব, তিক্ততা, অবিশ্বাস কিংবা মানসিক আঘাত সহজে মুছে যায় না। সন্তানের মনেও তখন প্রশ্ন থেকে যায়— ‘আবার কি সব ভেঙে যাবে?’

ফলে অনেক শিশুই নতুন করে মানিয়ে নিতে সময় নেয়। বাবা-মায়ের প্রতিটি ঝগড়া বা মতবিরোধকে অতিরিক্ত ভয় নিয়ে দেখে।

সব বিচ্ছেদ সমান ক্ষতিকর নয়

প্রশ্ন উঠতে পারে, বিচ্ছেদ মানেই কি খারাপ কিছু? প্রতারণা, সহিংসতা, নির্যাতনের কারণে অনেকেই আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাই সব বিচ্ছেদকে ক্ষতিকর বলা যায় না। গবেষণা বলছে, যদি একটি পরিবারে নিয়মিত সহিংসতা, অপমান, চিৎকার বা বিষাক্ত পরিবেশ থাকে, তাহলে সেই পরিবেশে বড় হওয়াও শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এমন পরিস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ বিচ্ছেদ এবং দায়িত্বশীল সহ-অভিভাবকত্ব (co-parenting) অনেক সময় সন্তানের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

বিচ্ছেদের পর সন্তানকে ভালো রাখতে করণীয় 

একটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা অবশ্যই মূল্যবান, যদি সেখানে পারস্পরিক সম্মান, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা থাকে। কিন্তু কেবল সন্তানের কথা ভেবে প্রতিদিনের সহিংসতা, অপমান বা অসহনীয় দ্বন্দ্বের মধ্যে থাকা সব সময় সমাধান নয়।

একজন সন্তানের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল ও ভালোবাসাপূর্ণ পরিবেশ— তা একসঙ্গে থাকা বাবা-মায়ের কাছ থেকে হোক বা দায়িত্বশীলভাবে আলাদা থাকা দুই অভিভাবকের কাছ থেকেই হোক। কেননা, সন্তানের মনে কেবল বিচ্ছেদই গভীর ছাপ ফেলে না; বরং সে তার শৈশবে কেমন সম্পর্ক, কেমন আচরণ এবং কেমন ভালোবাসা দেখেছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।