‘বাঙালি’ তকমা ও তালিকা যাচাই, রোহিঙ্গাদের ক্ষোভ

১৯ আগস্ট, ২০২৬

রাখাইনের ঐতিহ্যবাহী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করায় কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গারা ক্ষোভে ফুঁসছেন।

মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিকে প্রত্যাখ্যান করে রোহিঙ্গাদের দাবি, এটি মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় অপরাধ আড়াল ও আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা এড়ানোর পরিকল্পিত প্রচেষ্টা। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে আবেগের পরিবর্তে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। আর শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের মতে, এ ধরনের বক্তব্য প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার অন্যতম বড় জটিলতা।

২০১৭ সালের অগাস্ট মাসে সামরিক বাহিনীর নির্যাতনে বাস্তুচ্যুত হয়ে রোহিঙ্গারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। সেই রোহিঙ্গা ঢলের নয় বছর পূর্ণ হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গত শনিবার এক বিবৃতি আসে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলা হয়েছে। ‘রোহিঙ্গা’ নামে কোনো জাতিগোষ্ঠী মিয়ানমারে নেই।

মিয়ানমারের দাবি, বাংলাদেশের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকা থেকে গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

এমন বিবৃতিকে প্রত্যাখান করে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রোহিঙ্গা নেতারা। তাদের দাবি, দীর্ঘ সময়ে অর্ধেকেরও কম তালিকা যাচাই করাই প্রমাণ করে-প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে। আর রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলা সেটিকেও ‘নাটক’ বলে অভিহিত করেছেন রোহিঙ্গারা।

‘ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মো. সোয়েব বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে ১২ লাখ বা তারও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। তাদের প্রত্যেককে পৃথকভাবে জাতিসংঘের মাধ্যমে নিবন্ধন করা হয়েছে। এই নিবন্ধন প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হয়েছে, সে সম্পর্কে জাতিসংঘ ও ইউএনএইচসিআর অবগত এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করেই তারা এ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। ফলে মিয়ানমার যখন এই তথ্যকে অস্বীকার করছে, তখন মূলত তারা জাতিসংঘের তথ্যকেই অস্বীকার করছে।

তিনি বলেন, মিয়ানমারের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াতেও তাদের অনীহার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ ৮ লাখের বেশি রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমারের কাছে পাঠিয়েছিল। কিন্তু প্রায় নয় বছর সময়ের মধ্যে মিয়ানমার মাত্র প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গার তথ্য যাচাই করেছে বলে দাবি করছে। এত দীর্ঘ সময়ে তালিকার অর্ধেকেরও কম যাচাই করার বিষয়টি থেকেই বোঝা যায়, রোহিঙ্গাদের তালিকা যাচাই-বাছাই করে তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে মিয়ানমার সরকারের প্রকৃত আগ্রহ কতটা।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরিয়ে নেওয়ার বাস্তব কোনো সদিচ্ছা নেই। বরং এর বিপরীতে, মিয়ানমারে অবস্থানরত অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদেরও বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, মিয়ানমার প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গাকে নাগরিক হিসেবে স্বীকার করার কথা বলছে। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে-বর্তমানে মিয়ানমারের জান্তা সরকার আরাকানের পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণে নেই। তাহলে তারা যদি আরাকানের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণই না রাখে, সেই অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের কীভাবে ফিরিয়ে নেবে এবং তাদের নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার কীভাবে নিশ্চিত করবে?

‘ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা’র আরেক প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মো. রফিক বলেন, বাংলাদেশ ৮ লাখ রোহিঙ্গার তালিকা দিলেও মিয়ানমার ৪ লাখের তথ্য যাচাই করে ৩ লাখকে নিজেদের নাগরিক হিসেবে নিশ্চিত করেছে। এখন প্রশ্ন হলো, কী পদ্ধতিতে এই যাচাই করা হয়েছে এবং বাকি রোহিঙ্গাদের কোন মানদণ্ডে বাদ দেওয়া হয়েছে। মিয়ানমারকে এ প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে মিয়ানমারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। জান্তা সরকার রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে এবং তাদের সহজে স্বদেশে ফিরিয়ে নিতে চাইবে না। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বাংলাদেশকে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

এদিকে অভিবাসন ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞদের মতে, রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ আখ্যা দিয়ে মিয়ানমারের বক্তব্য মূলত একটি কূটনৈতিক কৌশল। এ নিয়ে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করে রোহিঙ্গা সংকটের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে হবে।

অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই ভাষ্যকে তাদের একটি কৌশল-বিশেষ করে কূটনৈতিক ও কর্মকৌশলের অংশ-হিসেবে দেখা যেতে পারে। ২০১৭ সাল থেকে গত কয়েক বছরে বিভিন্ন সময়ে আমরা দেখেছি, মিয়ানমার তাদের নিজস্ব ন্যারেটিভ বা ভাষ্য কোনো না কোনো সরকারি ওয়েবসাইট, মন্ত্রণালয়ের প্ল্যাটফর্ম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা এই বক্তব্য দ্বিপাক্ষিকভাবে বাংলাদেশকে জানানোর আগে কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জাতিসংঘের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপনের আগেই উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করেছে।