২৪ আগস্ট, ২০২৬
মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি হলো অভিজ্ঞতা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শরীর দুর্বল হলেও জীবনের দীর্ঘ পথচলায় তার অর্জিত অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও স্মৃতি তাকে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত করে।
তাই ইসলাম বয়স্ক মানুষকে অবহেলা না করে তাকে সর্বোচ্চ সম্মান ও যত্নের হকদার হিসেবে দেখে। মহানবী (সা.) তাঁর কথা ও কাজে বয়স্কদের প্রতি সম্মানের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যা আজও মানবিক সমাজ নির্মাণে অনুকরণীয় বিষয়।
বয়স্কদের মর্যাদা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং আমাদের বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৪৩)
এই হাদিসে বয়স্কদের সম্মানকে শুধু সামাজিক সৌজন্য হিসেবে দেখানো হয়নি; বরং মুসলিম চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থাৎ বয়সের কারণে কাউকে দুর্বল বা অপ্রয়োজনীয় মনে করা ইসলামী আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
পবিত্র কোরআনও পিতা-মাতার বার্ধক্যের সময় তাদের প্রতি কোমল আচরণের জন্য বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তাদের একজন অথবা উভয়েই তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের উফ্ বোলো না এবং তাদের ধমক দিয়ো না; বরং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বোলো।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৩)
পরের আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তুমি তাদের জন্য দয়ার সঙ্গে বিনয়ের বাহু অবনত করো এবং বলো, হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।
’ (সুরা : আল-ইসরা, আয়াত : ২৪)
বার্ধক্যজনিত দুর্বলতার সময় মানুষের প্রতি ধৈর্য, কোমলতা ও সম্মান দেখানোর এই নির্দেশ ইসলামের মানবিক দর্শনের অনন্য উচ্চতা প্রকাশ করে। মহানবী (সা.) শুধু বয়স্কদের সম্মানের কথা বলেননি, বাস্তব জীবনেও তাদের মর্যাদাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। কোনো সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি বা প্রবীণ ব্যক্তি তাঁর কাছে এলে তিনি তাকে যথাযথ সম্মান দিতেন। একবার দুই ব্যক্তি একটি অভিযোগ নিয়ে মহানবী (সা.)-এর কাছে কথা বলতে এলেন। তাদের মধ্যে বয়সে ছোটজন কথা বলা শুরু করলে নবীজি (সা.) বয়সে বড় ব্যক্তিকে আগে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেন।
তিনি বলেন, ‘বড়কে অগ্রাধিকার দাও।’ (বুখারি, হাদিস : ৬১৪২)
এর মাধ্যমে তিনি সামাজিক আচরণে বয়স ও অভিজ্ঞতার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন।
নামাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতেও তিনি বয়স্ক ও দুর্বল মানুষের বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনা করেছেন। তিনি ইমামদের নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘তোমাদের কেউ যখন মানুষকে নিয়ে নামাজ পড়ায়, সে যেন সংক্ষিপ্ত করে; কারণ তাদের মধ্যে অসুস্থ, দুর্বল ও বয়স্ক মানুষ থাকে।’ (বুখারি, হাদিস : ৭০৩)
এখানে ইবাদতের ক্ষেত্রেও মানুষের বয়স ও শারীরিক সামর্থ্যের প্রতি সংবেদনশীলতার শিক্ষা পাওয়া যায়।
বয়স্কদের প্রতি সম্মান মানে শুধু তাদের সামনে মাথা নত করা নয়; বরং তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা করা, সামাজিক সিদ্ধান্তে তাদের অভিজ্ঞতার মূল্য দেওয়া এবং বার্ধক্যের দুর্বলতাকে তুচ্ছ না করা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা ছিল এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে শিশুরা পাবে স্নেহ আর প্রবীণরা পাবেন সম্মান।
আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে অনেক বয়স্ক মানুষ একাকিত্ব, অবহেলা ও পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার শিকার। এমন বাস্তবতায় মহানবী (সা.)-এর আদর্শ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে একটি সভ্য সমাজের পরিচয় শুধু তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে নয়, বরং সে তার দুর্বল, প্রবীণ ও নির্ভরশীল মানুষদের কতটা সম্মানের সঙ্গে আগলে রাখে তার মধ্যেও নিহিত। তাই বয়স্কদের সম্মান করা শুধু ভদ্রতার পরিচয় নয়; এটি নবীজির (সা.)-এর সুন্নাহ এবং একজন মুসলিমের নৈতিক দায়িত্বও বটে।