২৪ আগস্ট, ২০২৬
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর আকিকা কে করেছিলেন এ নিয়ে সীরাতের গ্রন্থগুলোতে দুটি বর্ণনা পাওয়া যায়। একটি বর্ণনায় রয়েছে, তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব নবীজির জন্মের সপ্তম দিনে তাঁর আকিকা করেন। অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, নবুয়ত লাভের পর রাসুলুল্লাহ (স.) নিজেই নিজের আকিকা করেছিলেন।
দাদা আবদুল মুত্তালিবের আকিকা
সীরাতের বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জন্মের সপ্তম দিনে তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব তাঁর আকিকা করেন। তিনি কুরাইশের লোকদের দাওয়াত দেন এবং সেখানে নবজাতকের নাম রাখেন ‘মুহাম্মদ’।
কুরাইশরা এই নামের কারণ জানতে চাইলে আবদুল মুত্তালিব বলেন, তিনি চেয়েছিলেন আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে তাঁর নাতির প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ুক। এ বর্ণনা সীরাতের বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। (ফাতহুল বারি: ৭/১২৪; সিরাতুল মুস্তফা: ১/৬৩)
‘মুহাম্মদ’ নাম রাখার প্রেক্ষাপট
সীরাতের আরেক বর্ণনায় আবদুল মুত্তালিবের একটি স্বপ্নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়, রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জন্মের আগে তিনি এমন একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন, যার ব্যাখ্যায় তাঁর বংশে এমন এক ব্যক্তির আগমনের কথা বলা হয়, যার অনুসরণ পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে এবং আসমান-জমিনের অধিবাসীরা তাঁর প্রশংসা করবে।
এই বর্ণনার সঙ্গে ‘মুহাম্মদ’ নাম রাখার বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছে। এ কারণে আবদুল মুত্তালিবের মনে নাতির নাম ‘মুহাম্মদ’ রাখার আগ্রহ সৃষ্টি হয় এবং তিনি পরে ভরা মজলিসে সেই নাম ঘোষণা করেন। (সিরাতুল মুস্তফা: ১/৬৩)
নবুয়ত লাভের পর নিজের আকিকা
আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (স.) নবুয়ত লাভের পর নিজের আকিকা করেছিলেন। (জাদুল মাআদ: ১/৫; সিরাত বিশ্বকোষ: ৪/২৩০)
তবে এ বর্ণনার সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। তাই এটিকে সহিহ হাদিসে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
দাদা আবদুল মুত্তালিব শৈশবে আকিকা করে থাকলে পরে নবীজি (স.) কেন নিজের আকিকা করবেন এ নিয়ে আলেমরা সম্ভাব্য কিছু ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এর একটি হলো, পরবর্তী আকিকাটি আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া প্রকাশের উদ্দেশ্যে হতে পারে। তবে এটি নিশ্চিত কোনো দলিলের ভিত্তিতে বলা হয়নি।
আকিকার বিষয়ে নবীজির শিক্ষা
নবীজি (স.) নিজে হজরত হাসান (রা.) ও হজরত হুসাইন (রা.)-এর আকিকা করেছেন বলে বর্ণনা রয়েছে। নবজাতকের আকিকা সম্পর্কে তাঁর সুস্পষ্ট নির্দেশনাও পাওয়া যায়।
হজরত সামুরা ইবনে জুনদুব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘শিশুর পক্ষ থেকে সপ্তম দিনে আকিকা করা হবে, তার নাম রাখা হবে এবং তার মাথা মুণ্ডন করা হবে।’ (জামে তিরমিজি: ১৫২২)
আকিকার সময়, পশু ও অন্যান্য বিধান নিয়ে হাদিস ও ফিকহের গ্রন্থগুলোতে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
আকিকার পশু কত ছিল?
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর আকিকায় কী ধরনের পশু এবং কতটি পশু জবাই করা হয়েছিল এ বিষয়ে সীরাতের গ্রন্থগুলোতে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না।
তবে একটি বর্ণনায় তাঁর আকিকার সময় অনেক উট জবাই করা হয়েছিল এবং সেগুলো আবদুল মুত্তালিব নিজে জবাই করেছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে। (সিরাত বিশ্বকোষ: ৪/৩১)
এ তথ্যের ক্ষেত্রেও নির্ভরযোগ্যতার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
সারকথা, সীরাতের প্রসিদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (স.)-এর দাদা আবদুল মুত্তালিব জন্মের সপ্তম দিনে তাঁর আকিকা করেছিলেন এবং এ উপলক্ষে কুরাইশদের দাওয়াত দিয়েছিলেন। তাঁর নাম ‘মুহাম্মদ’ রাখার ঘটনাটিও এই বর্ণনার সঙ্গে যুক্ত।
অন্যদিকে নবুয়ত লাভের পর নিজের আকিকা করার একটি বর্ণনাও পাওয়া যায়, তবে এর সূত্র নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। ফলে নবীজি (স.)-এর আকিকার বিষয়ে সীরাতের প্রসিদ্ধ বর্ণনা, দুর্বল রেওয়ায়েত এবং প্রমাণিত হাদিস এই তিনটির মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি। আকিকার সাধারণ বিধান ও সপ্তম দিনের আমল সম্পর্কে প্রমাণিত হাদিসই এ ক্ষেত্রে মূল ভিত্তি।