যে সব কারণে মোদির সৌদি সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
ছবিঃ সংগৃহীত
মোদি এমন একটা সময় সৌদি আরবে গেলেন, যখন ভারতে ওয়াকফ আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলছে। দুই দিনের সরকারি সফরে সৌদি আরবে রয়েছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মঙ্গলবার (২২ এপ্রিল) সকালে তিনি জেদ্দার উদ্দেশে রওনা দেন।
বিকেলে জেদ্দা বিমানবন্দরে অবতরণ করে নরেন্দ্র মোদিকে বহনকারী বিমান। গত ৪০ বছরের এটিই কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম জেদ্দা সফর। সাধারণত ভারতের প্রধানমন্ত্রী সৌদি সফরে গেলে দেশটির রাজধানী রিয়াদে যান। মোদি নিজেও তার দুইবার সৌদি সফরে রিয়াদেই গেছেন।
নরেন্দ্র মোদির সফরকালে ভারতের সঙ্গে সৌদি আরবের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, বিদ্যুৎ, প্রতিরক্ষার মতো ক্ষেত্রে চুক্তি হতে পারে বলে জানা গেছে। এই সফরে সবমিলিয়ে ১২টির মতো সমঝোতাপত্র সই হতে পারে।
সৌদি আরব চায় তেল কেনা নিয়ে ভারত দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করুক। ভারত চায়, সৌদি আরব ভারত থেকে আরো হজযাত্রীকে হজ করতে যাওয়ার অনুমতি দিক। এই নিয়ে আলোচনার পর সৌদি আরব ভারতীয় হজযাত্রীর সংখ্যা বাড়াতে রাজি হয়েছে। এই বিষয়টি নিয়েও নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে যুবরাজ সালমানের মধ্যে আলোচনা হতে পারে।
এছাড়া ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ ইকনমিক করিডোর (আইম্যাক) নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে।
মোদি যা বললেন
সৌদির উদ্দেশে ভারত ছাড়ার আগে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেছেন, ''সৌদি আরব হলো ভারতের বিশেষ বন্ধু এবং দুই দেশের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক আছে। দুই দেশের অংশীদারিত্বকে ভারত ভারত খুবই মূল্য দেয়।''
আরব নিউজকে মোদি বলেছেন, ''ভারত ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্কের সীমাহীন সম্ভাবনা আছে।''
ভারতের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য
সৌদি আরবে ভারতের রাষ্ট্রদূত সুহেল আয়াজ খান সংবাদসংস্থা পিটিআইকে বলেছেন, ''ভারত-সৌদি আরব যোগাযোগের ক্ষেত্রে জেদ্দা খুবই গুরুত্বপূর্ণ শহর। বহু শতক ধরে জেদ্দা বন্দর থেকে দুই দেশের বাণিজ্য হয়েছে। তাছাড়া জেদ্দা হলো হজ ও উমরাহ করতে যাওয়ার গেটওয়ে। এখান থেকেই সকলে মক্কা যান।''
তিনি বলেছেন, ''ভারত হজযাত্রীদের সংখ্যা বাড়ানোর ওপর খুবই জোর দিয়েছিল। ২০২৫ সালে ভারতীয়দের জন্য হজের কোটা ঠিক করা হয়েছিল এক লাখ ৩৬ হাজার ২০ জন। এই বিষয়টি নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভারতীয় কর্মকর্তারা দীর্ঘ বৈঠক করেছেন। এখন ঠিক হয়েছে ভারত থেকে এবার এক লাখ ৭৫,০২৫ জন হজ করতে যেতে পারবেন।”
প্রধানমন্ত্রী মোদি ও যুবরাজ সালমান ভারত-সৌদি আরব স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ মিটিং দ্বিতীয় বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন।
কেন এই সফর গুরুত্বপূর্ণ?
ভারতের পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞ রবীন্দ্র সচদেব বলেছেন, ''অনেকগুলো কারণে এই সফর খুবই গুরুত্ব পাচ্ছে। সৌদি ভারত ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বাড়ানো ছাড়াও আরো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ আর্থিক করিডোর(আইম্যাক)।''
ভারত থেকে সমুদ্রপথে আমিরাত, তারপর রেলপথে সৌদি আরব, জর্ডার্ন, ইসরায়েল হয়ে গ্রিসে যাবে এই করিডোর। ভারতের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি ও য়ুবরাজ সালমান এই প্রকল্প নিয়ে কথা বলবেন।
রবীন্দ্র সচদেব বলেন, ''আজ হোক বা কাল গাজার পুনর্গঠন করতে হবে। সেখানে আইম্যাক করিডোর বড় ভূমিকা নিতে পারে।'' তার মতে, ''সৌদি আরবের হাতে অর্থ আছে। ভারতের কাছে বাজার আছে, যেখানে বিনিয়োগ করে লাভ ওঠাতে পারে সৌদি আরব। সেদিক থেকেও সফরের গুরুত্ব অপরিসীম।''
সৌদির যুবরাজ সালমানের নিওমকে ভবিষ্যতের স্বপ্নের শহর হিসাবে গড়ে তুলতে চান। এটা ৫০ হাজার কোটি ডলারের প্রকল্প। সেখানে ভারতের ইঞ্জিনিয়ার, প্রযুক্তিবিদ, প্রযুক্তি, শ্রমিকদের সৌদির প্রয়োজন হবে বলে মনে করেন তিনি।
সৌদি আরবের জেলে আড়াই হাজার ভারতীয় বন্দি আছেন। হয় ঠিকভাবে নিয়ম না জানায় বা লঘু অপরাধে তারা জেলে বন্দি। তাদের মুক্তি নিয়েও আলোচনা হতে পারে বলে সচদেব জানিয়েছেন। তাছাড়া অপ্রচলিত শক্তি, বিকল্প শক্তি, গ্রিন হাইড্রোজেন নিয়ে কথা হবে।
সৌদি আরবের যুবরাজের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদীর বিদ্যুৎ, বিশেষ করে পরমাণু বিদ্যুৎ নিয়ে কথা হবে।
সোদিতে ২৭ লাখ ভারতীয় আছেন। সৌদিতে একটি যোগ প্রতিষ্ঠানও তৈরি হয়েছে। সেখানকার প্রথম সৌদি যোগাচার্য নইফ আলমারওয়াল বলেছেন, ''এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। মধ্যপ্রাচ্যে যোগ প্রসারের ক্ষেত্রে তা বড় ভূমিকা নিতে পারে।''
যা বলছে মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড
প্রধানমন্ত্রী মোদি এমন একটা সময় সৌদি আরবে গেলেন, যখন ভারতে ওয়াকফ আইনের বিরুদ্ধে মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড(এআইএমপিএলবি) দেশডুড়ে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে।
এআইএমপিএলবি-র মুখপাত্র সৈয়দ কাশিম রসুল ইলিয়াস বলেন, ''সৌদি আরবের থেকে আমাদের কোনো প্রত্যাশা নেই। আমরা গণতন্ত্রে বাস করি। এখানে আমাদের সামনে রাস্তা আছে। গণতন্ত্র বলে আমাদের মতামত প্রকাশের অধিকার আছে। আমরা আমাদের মতপ্রকাশ করব।''
উল্লেখ্য, মোদির সৌদি আরব সফর এই প্রথম নয়। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই নিয়ে তৃতীয় বার সৌদিতে যাচ্ছেন মোদি। এর আগে ২০১৬ সালে এবং ২০১৯ সালেও সে দেশটিতে গিয়েছিলেন তিনি। ২০২৩ সালে ভারতে এসেছিলেন সৌদির যুবরাজ।