ইসলাম ও মৌলবাদ: ব্যাখ্যা ও অপব্যাখ্যা
প্রতীকী ছবি।
ইসলাম ধর্ম পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ও দ্রুত বর্ধনশীল ধর্ম। মানবতার কল্যাণ, ন্যায়বিচার, সাম্য ও শান্তির বার্তা নিয়ে এই ধর্ম আবির্ভূত হলেও আজকের বিশ্বে একটি বৃহৎ প্রচারণা এটিকে মৌলবাদের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছে। পশ্চিমা রাজনীতি ও গণমাধ্যমে ‘ইসলাম ও মৌলবাদ’ প্রায় সমার্থক হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে, যা একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ধর্মবিদ্বেষী স্লোগানে পরিণত হয়েছে। এই প্রবন্ধে আলোচিত হবে-ইসলাম সম্পর্কে গড়ে ওঠা ভ্রান্ত ধারণার উৎস, ধর্মবিদ্বেষী প্রচারণার কৌশল, মৌলবাদের প্রকৃত চিত্র এবং ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা।
মৌলবাদ শব্দের উৎপত্তি ও বিকৃতি
‘মৌলবাদ’ শব্দটি আধুনিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আলোচনা, বিশেষ করে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রসঙ্গে বহুল ব্যবহৃত একটি পরিভাষা। তবে এই শব্দের অর্থ, প্রয়োগ ও উদ্দেশ্য একাধিক দিক থেকে বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন আছে, কারণ এটি একটি বহুমাত্রিক ও বিভ্রান্তিকর শব্দ হিসেবে আজকের বিশ্বে ব্যবহৃত হচ্ছে।
মৌলিক অর্থ ও উৎস: ‘মৌলবাদ’ (Fundamentalism) শব্দটি এসেছে ইংরেজি Fundamental থেকে, যার অর্থ ‘মূলভিত্তি’ বা ‘মূলনীতি’। এই শব্দের সঙ্গে-রংস যোগ করে Fundamentalism তৈরি হয়েছে, যার আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায়—‘মৌলিক শিক্ষার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস ও অনুসরণ।’
ইতিহাসিক প্রেক্ষাপট: এই শব্দটির ব্যবহার প্রথম শুরু হয় ১৯০৫-১৯১৫ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের একটি গোষ্ঠীর মধ্যে, যারা বাইবেলের আক্ষরিক ব্যাখ্যায় বিশ্বাস করতেন এবং আধুনিকতা ও বিজ্ঞানকে প্রত্যাখ্যান করতেন। তারা নিজেদের Fundamentalists হিসেবে পরিচিত করতেন। পরবর্তীতে এটি অন্যান্য ধর্মের গোঁড়াপন্থী বা কট্টর বিশ্বাসীদের ক্ষেত্রেও ব্যবহার হতে থাকে।
ইসলাম ও মৌলবাদ
বর্তমান সময়ে ‘মৌলবাদ’ শব্দটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় ইসলামের প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে পশ্চিমা মিডিয়া ও রাজনীতিতে। তবে এই ব্যবহার প্রায়শই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, নেতিবাচক এবং বিভ্রান্তিকর।
পশ্চিমা দৃষ্টিকোণ : মৌলবাদ বলতে বোঝানো হয়, চরমপন্থা, সহিংসতা, নারীবিদ্বেষ, ধর্মীয় গোঁড়ামি, আধুনিকতার বিরোধিতা ইত্যাদি। মুসলমানদের মধ্যে যারা শরিয়া আইন, ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা, ইসলামের সামাজিক নীতিমালা মেনে চলেন-তাদেরও অনেক সময় ‘মৌলবাদী’ বলা হয়, যদিও তারা শান্তিপূর্ণ ও নৈতিক জীবনযাপন করেন।
সমস্যা কোথায়? এই শব্দটি এখন এমনভাবে ব্যবহৃত হয় যেন ইসলামের মৌলনীতি মানেই চরমপন্থা, ধর্মবিশ্বাস মানেই আধুনিকতার বিরোধিতা, ইসলামপন্থী মানেই ‘সন্ত্রাসের ঝুঁকি’
ইসলামিক পরিপ্রেক্ষিতে মৌলবাদ শব্দটির সমস্যা: ইসলামে ‘মৌলবাদ’ শব্দটির কোনো স্বীকৃত আরবি পরিভাষা নেই। কোরআন-হাদিসে এই শব্দ বা এর মতো কোনো ধারণার প্রচার করা হয়নি। বরং ইসলাম সবসময় সাম্য, ভারসাম্য, সহনশীলতা ও জ্ঞানভিত্তিক চিন্তা-চর্চাকে উৎসাহিত করে।
কিছু ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি : ‘আমি তোমাদের একটি মধ্যপন্থী জাতি বানিয়েছি।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৪৩) নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘ধর্মে বাড়াবাড়ি করো না, কারণ যারা তোমার আগে ছিল, তারা ধর্মে বাড়াবাড়ির কারণেই ধ্বংস হয়েছে।’ (নাসাঈ)
অর্থাৎ, ইসলামের মৌলনীতি মানে কখনোই ‘মৌলবাদ’ নয়-বরং তা হল ন্যায়পরায়ণতা, সহনশীলতা ও মধ্যপন্থা।
মৌলবাদ বনাম প্রকৃত ইসলাম: মৌলবাদ শব্দটি দিয়ে বোঝানো হয় চরমপন্থী রাজনৈতিক ইসলামী গোষ্ঠী, সহিংসতা; জিহাদের অপব্যাখ্যা; নারীদের প্রতি কঠোরতা; অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর প্রতি অসহিষ্ণুতা। অথচ ইসলামে আছে আত্মসংযম ও সহনশীলতা, সমাজে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা, জ্ঞান ও যুক্তির চর্চা, নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকারের সুরক্ষা।
ইসলামে শান্তি ও সহনশীলতা
ইসলাম শব্দের অর্থ আত্মসমর্পণ। ইসলামী শিক্ষা মানবিকতা, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহাবস্থানের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতে দেখা যায়। এক আয়াতে এসেছে: ‘তোমরা কারও প্রতি শত্রুতা করো না, আল্লাহ শত্রুতা পছন্দ করেন না।’ (সুরা আল-মায়িদা, আয়াত : ৮)
নবী মুহাম্মদ (সা.) নিজ জীবনে এমন কোনো দৃষ্টান্ত রাখেননি, যেখানে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে সহিংসতা বা জবরদস্তি করা হয়েছে। বরং, তায়েফের বিক্ষোভ, মক্কা বিজয় ও হুদাইবিয়া সন্ধি-এসব ক্ষেত্রে তাঁর ক্ষমাশীলতা ও সহনশীলতা আজও বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।
ইসলামের বিরুদ্ধে ধর্মবিদ্বেষী প্রচারণা: একটি রাজনৈতিক চক্রান্ত
১. ইসলামভীতি (Islamophobia) সৃষ্টি : ‘ইসলামভীতি’ হলো একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কৌশল, যার মাধ্যমে মুসলিম সমাজকে ভীতিকর ও হুমকিস্বরূপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এটি একদিকে মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা ছড়ায়, অন্যদিকে যুদ্ধ, দখলদারি ও বৈষম্যের মতো কাজকে ন্যায়সঙ্গত বলে প্রমাণ করে।
২. গণমাধ্যমের ভূমিকা: পশ্চিমা মূলধারার মিডিয়া প্রায়শই ইসলামি পরিচয়ের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের সম্পর্ক স্থাপন করে। যেমন—যদি কোনো মুসলমান অপরাধ করে, তখন তার ধর্মীয় পরিচয় বড় করে তুলে ধরা হয়। কিন্তু অন্য ধর্মাবলম্বীর ক্ষেত্রে সেটি চেপে যাওয়া হয়।
৩. রাজনৈতিক স্বার্থ ও সামরিক আগ্রাসন: ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া ইত্যাদি অঞ্চলে ‘সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের’ নামে সামরিক আগ্রাসন চালানো হয়েছে, যার পেছনে ধর্মীয় চরমপন্থার দোহাই দেওয়া হয়েছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে, এসব আগ্রাসনের মূলে ছিল ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ, তেলসম্পদ ও আধিপত্য বিসত্মার।
৪. ঔপনিবেশিক উত্তরসূরি চিন্তাধারা : ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ ও ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো মুসলিম দেশগুলোকে দখলের পর সেখানে ইসলামি শিক্ষা, শরিয়াহ আইন ও ইসলামী রাজনৈতিক চেতনার বিরম্নদ্ধে লড়াই শুরু করে। তারা ইসলামকে গোঁড়ামি ও পশ্চাৎপদতার প্রতীক হিসেবে প্রচার করে।
ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে মৌলবাদ ও চরমপন্থার নিন্দা
ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই গোঁড়ামি, চরমপন্থা ও বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেন : ‘ধর্মে বাড়াবাড়ি করো না। তোমাদের পূর্ববর্তীরা এভাবেই ধ্বংস হয়েছিল।’ (নাসাঈ, হাদিস : ৩০৫৭)
ইমাম গাজ্জালি, শাহ ওয়ালিউল্লাহ, ইবনে তাইমিয়ার মতো আলেমরা চরমপন্থার বিরুদ্ধে যুক্তিনির্ভর ইসলামী চিন্তাধারা উপস্থাপন করেছেন। তাঁরা বলেছেন, ইসলামে ব্যালেন্স বা মধ্যপন্থা অবলম্বনই হচ্ছে প্রকৃত ধর্মাচরণ।
মুসলিম বিশ্বের করণীয়
১. ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা প্রচার : শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও মিডিয়ায় ইসলামকে মানবিকতা ও যুক্তির আলোকে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
২. ইসলামভীতি প্রতিরোধে কৌশলগত উদ্যোগ : আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসলামের প্রতি বৈষম্যের প্রতিবাদে কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রচারণা চালাতে হবে।
৩. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঠিক ব্যবহার : তরুণ সমাজের মাঝে ইসলাম সম্পর্কে সঠিক বার্তা পৌঁছে দিতে সোশ্যাল মিডিয়ার ইতিবাচক ব্যবহার অপরিহার্য।
৪. আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ও সচেতনতা : বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে বোঝাপড়া ও সহনশীলতা তৈরির জন্য সংলাপের মাধ্যমে ভুল ধারণা দূর করতে হবে।
পরিশেষে, ‘ইসলাম ও মৌলবাদ’-এই দুটি শব্দকে একই সূত্রে গাঁথা একটি সুপরিকল্পিত ধর্মবিদ্বেষী শ্লোগানে পরিণত হয়েছে। ইসলাম একটি শান্তিপূর্ণ, মানবিক ও যুক্তিনির্ভর ধর্ম; আর মৌলবাদ হচ্ছে একটি রাজনৈতিক ও মানসিক বিকৃতি, যা কোনো ধর্মেরই মূল আদর্শ হতে পারে না। গণমাধ্যম, রাজনৈতিক শক্তি ও চরমপন্থীদের প্রচারণায় ইসলামকে বদনাম করার এই চক্রান্তের মুখে, মুসলমানদের দায়িত্ব-নিজ ধর্মের সঠিক রূপ তুলে ধরা, শান্তির পথে দৃঢ় থাকা এবং জ্ঞান, যুক্তি ও মানবতার আলোকে বিশ্বকে আলোকিত করা।
লেখক : পিএইচডি গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ও প্রভাষক : রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ।