আতা ফলের উপকারিতা এবং অপকারিতা
ছবিঃ সংগৃহীত
আতা হল অ্যানোনেসি পরিবারভুক্ত এক ধরনের যৌগিক ফল। এটি শরিফা এবং নোনা নামেও পরিচিত। এই ফলের ভিতরে থাকে ছোট ছোট কোষ। প্রতিটি কোষের ভেতরে থাকে একটি করে বীজ,
বীজকে ঘিরে থাকা নরম ও রসালো অংশই খেতে হয়। পাকা ফলের বীজ কালো এবং কাঁচা ফলের বীজ সাদা। বীজ বিষাক্ত। এটি গুচ্ছিত ফল অর্থাৎ একটি মাত্র পুষ্পের মুক্ত গর্ভাশয়গুলো হতে একগুচ্ছ ফল উৎপন্ন হয়।
আতার আদিবাস ভারত। বাংলাদেশ ও ভারতে এটি বসতবাড়ীর আঙিনায় এবং বনে-জঙ্গলে জন্মে থাকে। তবে থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর বাণিজ্যিক চাষাবাদ হয়ে থাকে।
আতাফল হৃৎপিণ্ড আকৃতির হয়ে থাকে। এতে প্রচুর পরিমাণে আমিষ ও শর্করা জাতীয় খাদ্যোপদান রয়েছে। পাকা আতার শাঁস মিষ্টি হয়ে থাকে। খাওয়ার সময় জিভে চিনির মতো মিহি দানা দানা লাগে। এর কিছু ভেষজ গুণ রয়েছে।
যেমন পাকা আতার শাঁস বলকারক, বাত-পিত্তনাশক ও বমনরোধক। পাকা ফল সুমিষ্ট হওয়ার কারণে অনেক সময়ই পোকার সংক্রমণ হয়, সাদা রঙের পোকা দ্বারা আক্রান্ত হয় ফল।
আতা ফলের উপকারিতা
অনেকে আতা ফল কে তেমন গুরুত্ব দেন না। কিন্তু এ ফল পুষ্টি সমৃদ্ধ হওয়ায় স্বাস্থ্য উপকারিতার পশাপাশি ঔষধি গুণ ও রয়েছে।
হার্ট সুস্থ রাখে
বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের হৃৎপিন্ডের কার্যক্ষমতা কমতে থাকে ফলে হার্টের নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। পটাসিয়াম এবং সোডিয়ামের সুষম অনুপাত রয়েছে আতা ফলে।
যা দেহে রক্তচাপের নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করে।এ ফলে বিদ্যমান উচ্চ ম্যাগনেসিয়াম হৃৎপিন্ডের মসৃণ পেশীগুলি শিথিল করে এবং স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাক রোধ করে।
আতা ফল কোলেস্টেরলের মাত্রা ঠিক রাখে
ফলের মধ্যে ফাইবার এবং নিয়াসিন শরীরের ভাল কোলেস্টেরল বাড়ানোর সাথে সাথে খারাপ কোলেস্টেরল হ্রাস করতে সহায়তা করে। যার মাধ্যমে আমাদের সুস্থতা নিশ্চিত হয়।
মন ভাল রাখে এবং হতাশা রোধ করে
সেরোটোনিন এবং ডোপামিন সহ নিউরোট্রান্সমিটার তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ভিটামিন বি ৬। যা আপনার মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করে। প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে ভিটামিন বি ৬ এর অভাবে হতাশা বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়।
আতা ফলে ভিটামিন বি ৬ থাকায় এটি হতাশার ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে। বি কমপ্লেক্স ভিটামিনগুলি হতাশা, বিরক্তি, উত্তেজনা এবং স্ট্রেস সহ বিভিন্ন আবেগকে প্রভাবিত করে। এগুলো মস্তিষ্ককে শান্ত হতে সাহায্য করে।
আতা ফল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়
বর্তমানের পরিস্থিতিতে আমাদের সবথেকে বেশি প্রয়োজন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা।আতা ফলে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন সি থাকে যা আমাদের শরীরে বিভিন্ন জীবাণু এবং সংক্রামণ থেকে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
আতা ফল ক্যান্সার রোধে সাহায্য করে
আতা ফল ফ্লেভোনয়েড সমৃদ্ধ যা বিভিন্ন ধরণের টিউমার এবং ক্যান্সারের চিকিৎসায় সহায়ক। ফলের মধ্যে অ্যালকায়েডস এবং এসিটোজেনিনের মতো উপাদান রয়েছে যা রেনাল অসুস্থতা এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে। আতা ফলের অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট বৈশিষ্ট্যগুলি ক্যান্সারের কোষগুলির বৃদ্ধি থামাতে পারে।
প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে
দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ হৃদরোগ এবং ক্যান্সার সহ অনেক অসুস্থতার ঝুঁকির সাথে জড়িত। আতা ফলে বেশ কয়েকটি অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি যৌগ রয়েছে যা আমাদের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
হজমশক্তি বাড়ায়
এ ফলে থাকা খাদ্যআঁশ হজমশক্তি বৃদ্ধি করে ও পেটের সমস্যা দূর করে।
দৃষ্টিশক্তি ভাল রাখে
আমাদের বয়স বৃদ্ধির সাথে দুর্বল দৃষ্টিশক্তি একটি সাধারণ সমস্যা। আজকের এই যুগে যেখানে আমরা আমাদের ফোন, টিভি, ট্যাবলেট এবং ল্যাপটপের স্ক্রিনগুলিতে আচ্ছন্ন আছি সেখানে আপনার চোখের ভাল যত্ন নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
আতা ফলে থাকা প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুলি আমাদের চোখ শুকিয়ে যাওয়া থেকে বাধা দেয়।আতা ভিটামিন এ এবং রাইবোফ্লাভিন একটি সমৃদ্ধ উৎস, যা চোখকে সুস্থ রাখার জন্য দায়ী। কোষের ক্ষয়ক্ষতি থেকে ফ্রি রেডিক্যালের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করে।
আতা ফল আর্থ্রাইটিস বা বাতের ঝুঁকি কমায়
আতা ম্যাগনেসিয়ামের সমৃদ্ধ উৎস। ম্যাগনেসিয়াম শরীরের পানির ভারসাম্যকে সমান করতে সাহায্য করে, তাই জয়েন্টগুলি থেকে অ্যাসিড নির্মূল হয়।
যা বাত এবং বাত রোগের লক্ষণগুলি হ্রাস করতে সহায়তা করে।আতা ফলে ক্যালসিয়ামও রয়েছে যা হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয়।
এনিমিয়া রোধ করে
আতা ফলের পুষ্টিউপাদান রক্তস্বল্পতা রোধে ভূমিকা পালন করে। এনিমিয়া হলে রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমান কমে যায়। । লোহিত রক্তকণিকা সম্পূর্ণ শরীরের অক্সিজেন পরিবহনের জন্য হিমোগ্লোবিন ব্যবহার করে, দেহকে অসংখ্য কার্য সম্পাদন করতে দেয়।
লোহিত রক্তকণিকা বা হিমোগ্লোবিনের কম পরিমাণে থাকলে রক্তে পর্যাপ্ত পরিমাণে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়। যা ফুসফুস এবং হার্টে আরও অক্সিজেন তৈরি করতে চাপ দেয়।যার ফলে আরো নানা ধরণের শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হয়।
ডায়াবেটিসে কার্যকর
আতা ফলে প্রচুর পরিমাণে ডায়েটরি ফাইবার রয়েছে বলে এটি চিনির কোনও শোষণকে ধীর করতে সহায়তা করে। টাইপ -2 ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা হ্রাস করে।
চুলের বৃদ্ধি ঘটায়
আতা ফলে উপস্থিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্টস এবং ভিটামিন সি চুলের বৃদ্ধির জন্য খুব ভাল।
চুলকে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ এবং শাইন করতে সাহায্য করে।
উকুন থেকে মুক্তি দেয়
আতার এনজাইমগুলি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলি মাথার ত্বকে উকুনের আক্রমণ প্রতিকার এবং প্রতিরোধ করতে দুর্দান্ত।
এ ফলের পেস্ট প্রয়োগ করে মাথার ত্বকে সমস্যা থেকে মুক্ত থাকা যায়। এটি মাথার ত্বককে শক্তিশালী করে, স্বাস্থ্যকরও রাখে এবং পোকার আক্রোমণ থেকে রক্ষা করে।
আতা ফলের অপকারিতা
আতাফলের খোসা এবং বীজে বিষাক্ত যৌগ থাকে। যা আমাদের ত্বকে অ্যালার্জি হতে পারে। এবং চোখের ক্ষতি হতে পারে। তাই আতাফল খাওয়ার সময় প্রথমে খোসা এবং বীজগুলি অবশ্যই বেশি রাখা উচিত।
আতাফল একটি ঠান্ডা জাতীয় ফল। আর তাই যেসকল সংস্থা মানুষের খুব অল্পতেই ঠান্ডা লেগে যায় তারা এই ফল খাওয়া থেকে বিরত থাকবেন।
আতাফল প্রতিদিন খেলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং কিছু কিছু মানুষের ডায়রিয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই আতাফল সপ্তাহে ১ দিনের বেশি খাওয়া উচিত নয়।