কোরআন অনুধাবনের প্রয়োজনীয়তা

কোরআন অনুধাবনের প্রয়োজনীয়তা

প্রতিকী ছবি

কোরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা এবং কোরআন মানুষকে বুঝিয়ে দেওয়া নবুয়তি দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা রাসুল (সা.)-কে এ দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমার প্রতি এক স্মরণিকা (কিতাব) অবতীর্ণ করেছি, যেন তা তুমি মানুষের জন্য বয়ান তথা ব্যাখ্যা করে সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দাও, যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে।’
(সুরা : জুমা, আয়াত : ২)

শরিয়তের বিধান পালনের জন্য কোরআন শেখা ফরজ।

যেমন বিশুদ্ধ নামাজ শুদ্ধ হওয়ার জন্য কোরআন তিলাওয়াত শুদ্ধ হওয়া আবশ্যক। তাই তিলাওয়াত শুদ্ধ করা ফরজ। ইবাদতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়—এমন জ্ঞানের ব্যাপারে বিশুদ্ধ মত হলো তা অর্জন করা ফরজে কেফায়া।
যদি উম্মতের একটি বিশেষ দল কোরআন নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা করে তাহলে অন্যরা পাপমুক্ত থাকবে।

আর কেউ না করলে সবাই গুনাহগার হবে। তবে প্রত্যেক মুমিনের উচিত কোরআন গবেষণায় আগ্রহী হওয়া। আল্লামা জারকাশি (রহ.) বলেন, ‘যার যথাযথ জ্ঞান, বোধ, আল্লাহভীতি ও গবেষণা নেই সে কোরআনের কোনো স্বাদ পাবে না।’ (আল বোরহান : ২/১৭১)
নিম্নে কোরআন অনুধাবনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করা হলো—

ঈমান বৃদ্ধি পাওয়া

কোরআন অনুধাবন করে পাঠ করলে পাঠকের ঈমান বৃদ্ধি পায়।

প্রতিটি আয়াত ও সুরা তার মনের মধ্যে গভীরভাবে রেখাপাত করে। কারণ এ সময় তার চোখ-কান-হৃদয় সব কিছু কোরআনের মধ্যে ডুবে থাকে। এদিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ বলেন, ‘যখন কোনো সুরা নাজিল হয়, তখন তাদের মধ্যেকার কিছু (মুশরিক) লোক বলে, এই সুরা তোমাদের মধ্যে কার ঈমান বৃদ্ধি করল? বস্তুত যারা ঈমান এনেছে, এ সুরা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করেছে এবং তারা সুসংবাদ লাভ করেছে।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১২৪)

আল্লাহভীতি অর্জন করা

অনুধাবনের সঙ্গে কোরআন পাঠ করলে হৃদয়-মন শিহরিত হয়। আল্লাহর অসীম ক্ষমতা অবহিত হয়ে তাদের অন্তর জগৎ ভয়ে কেঁপে ওঠে।

ফলে পাপচিন্তা দূরীভূত হয় এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করে হৃদয়ে প্রশান্তি লাভ হয়। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘বলে দাও (হে অবিশ্বাসীরা!), তোমরা কোরআনে বিশ্বাস করো বা না করো (এটি নিশ্চিতভাবে সত্য)। যাদের ইতিপূর্বে জ্ঞান দান করা হয়েছে (আহলে কিতাবের সৎ আলেমরা), যখন তাদের ওপর এটি পাঠ করা হয়, তখন তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে। আর তারা বলে, মহাপবিত্র আমাদের পালনকর্তা। আমাদের প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি অবশ্যই কার্যকর হয়। আর তারা কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের বিনয় আরো বৃদ্ধি পায়।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ১০৭-১০৯)

কোরআন অনুধাবনে সার্বিক হেদায়েত লাভ

কোরআন অনুধাবনের মাধ্যমে জীবনের চলার পথে সার্বিক হেদায়েত লাভ করা যায়। ব্যক্তি ও সমাজের বৃহত্তর কল্যাণ ও সার্বিক মঙ্গলের বিষয় তার সামনে প্রতিভাত হয়। ফলে সে পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে বেঁচে যায়। এদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই কোরআন এমন পথের নির্দেশনা দেয়, যা সবচেয়ে সরল। আর তা সৎকর্মশীল মুমিনদের সুসংবাদ দেয় যে তাদের জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার।’

(সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৯)

কোরআনের স্বাদ আস্বাদন ও হৃদয়ে প্রশান্তি লাভ

কোরআনের শব্দালংকার বুঝদার পাঠকের অন্তরে ঝংকার তোলে। এর গভীর তাৎপর্য জ্ঞানজগেক চমকিত করে। এর বিজ্ঞান ও অতীত ইতিহাস মানুষকে হতবিহ্বল করে। বহু অজানা প্রশ্নের উত্তর পেয়ে হৃদয় প্রশান্ত হয়। এক পর্যায়ে সমর্পিত চিত্ত প্রশান্তিতে ভরে ওঠে। তাফসিরবিদ তাবারি (রহ.) বলেন, ‘আমি বিস্মিত হই ওই ব্যক্তির জন্য, যে কোরআন পাঠ করে। অথচ এর তাৎপর্য অনুধাবন করে না। সে কিভাবে এর স্বাদ আস্বাদন করবে?’ (তাফসির তাবারি, ‘ভূমিকা’ অধ্যায় : ১/১০)

আল্লাহর কিতাবের জন্য দণ্ডায়মান হওয়া

কোরআনের তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারলে এর হক ও সীমারেখা আদায়ে পাঠক দণ্ডায়মান হবে। এর মর্যাদা রক্ষায় উৎসর্গিতপ্রাণ হবে। সর্বাবস্থায় এর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে।

হালাল-হারাম জানা

জীবনসংশ্লিষ্ট বহু বৈধ-অবৈধ বিষয় মানুষ জানতে পারবে কোরআন অনুধাবনের মাধ্যমে, যা তার বৈষয়িক জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে এবং শয়তানের ধোঁকা থেকে দূরে থাকতে পারবে। আল্লাহ বলেন, ‘হে বিশ্বাসীরা! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২০৮)

ভেতর ও বাইরের রোগ থেকে আরোগ্য লাভ

গভীর অনুধাবনের সঙ্গে কোরআন পাঠের মাধ্যমে ভেতরকার বহু সন্দেহবাদ দূরীভূত হয়। বহু অন্যায় আকাঙ্ক্ষা অন্তর্হিত হয়। ফলে মুমিন ভেতরে ও বাইরের বহু রোগ থেকে মুক্তি লাভ করে। এদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন, ‘হে মানবজাতি, তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এসে গেছে উপদেশবাণী (কোরআন)। অন্তরের রোগসমূহের নিরাময়কারী এবং বিশ্বাসীদের জন্য পথ প্রদর্শক ও রহমত।’ (সুরা : ইউনুস, আয়াত : ৫৭)

আলোর পথের সন্ধান

আল্লাহ কোরআনের মাধ্যমে মানুষকে আলোর পথের সন্ধান দেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে চায়, এর (কোরআন) দ্বারা তিনি তাদের শান্তির পথে পরিচালিত করেন এবং নিজ অনুমতিক্রমে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে যান এবং তাদের সরলপথে পরিচালিত করেন।’

(সুরা : মায়িদা, আয়াত : ১৬)

কোরআন সব জ্ঞানের উৎস

আল্লাহ কোরআনকে সব জ্ঞানের উৎস বানিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি (আল্লাহ) আত্মসমর্পণকারীদের জন্য প্রত্যেক বিষয়ে ব্যাখ্যাস্বরূপ, পথনির্দেশ, দয়া ও সুসংবাদস্বরূপ তোমার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করলাম।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৮৯)

কাজেই কোরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি কোরআন অনুধাবনে মনোযোগী হতে হবে।