আত্মরক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে যা বলেছেন নবীজি
ছবি: সংগৃহীত
ইসলাম দিয়েছে সতর্কতা, শক্তি অর্জন ও আত্মরক্ষার শিক্ষা-
ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবিক জীবনব্যবস্থা। এটি যেমন অন্যায়-অবিচার ও জুলুমকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছে, তেমনি নিজের সম্মান, জীবন, সম্পদ ও স্বাধীনতা রক্ষায় আত্মরক্ষার অনুমতিও দিয়েছে। বরং পরিস্থিতিভেদে আত্মরক্ষা ইসলামে মর্যাদাপূর্ণ আমল।
আত্মরক্ষা মানুষের স্বীকৃত অধিকার-
আত্মরক্ষাকে ইসলাম মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে— ‘সুতরাং যে তোমাদের ওপর আক্রমণ করেছে, তোমরাও তার ওপর আক্রমণ করো, যেমনভাবে সে তোমাদের ওপর আক্রমণ করেছে।’ (সুরা বাকারা: ১৯৪)
আরও বলা হয়েছে—‘তোমরা নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে ফেলো না।’ (সুরা বাকারা: ১৯৫) ‘অত্যাচারিত হওয়ার পর যারা প্রতিশোধ নেয়, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।’ (সুরা শুরা: ৪১)
শরীরচর্চা ও আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণের প্রতি উৎসাহ-
ইসলামে আত্মরক্ষা শুধু অনুমোদিতই নয়, বরং প্রস্তুতির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা কাফেরদের (মোকাবেলা করার) জন্য তোমাদের সাধ্যানুযায়ী শক্তি ও পালিত ঘোড়ার দল প্রস্তুত রাখ, যার দ্বারা তোমরা ভীত-সন্ত্রস্ত করবে আল্লাহর দুশমন ও তোমাদের দুশমনদের এবং ওরা ছাড়াও অন্যদের, যাদের তোমরা জান না। আল্লাহ ওদের জানেন।’ (সুরা আনফাল: ৬০)
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন— ‘আল্লাহর কাছে শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের তুলনায় অধিক প্রিয়। যদিও উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম: ২৬৬৪)
এ দলিলগুলো প্রমাণ করে, আত্মরক্ষার জন্য শারীরিক সক্ষমতা অর্জন করাও ইসলামের শিক্ষা।
আত্মরক্ষার আগে চাই সতর্কতা ও সচেতনতা-
রাসুলুল্লাহ (স.) নিজে সতর্কতার আদর্শ স্থাপন করেছেন। ওহুদ যুদ্ধে তিনি দুটি বর্ম পরিধান করেন। (তিরমিজি: ১৬৯২)
মদিনায় রাতের বেলায় পাহারার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে সাহাবিদের পাহারার অনুমতি দেন। খুলাফায়ে রাশেদিনের আমলেও এই সতর্কতা ছিল। ওমর (রা.) শহীদ হওয়ার পর উসমান (রা.) ও পরে মুয়াবিয়া (রা.) রক্ষীদের পাহারায় স্বতন্ত্র মেহরাবে নামাজ আদায় করতেন। (ওয়াফাউল ওয়াফা: ২/৮৮)
জীবন, সম্পদ ও সম্ভ্রম রক্ষায় নিহত হলে শহীদ-
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন— ‘যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ, জীবন, পরিবার বা ইজ্জত রক্ষায় নিহত হয়, সে শহীদ।’ (তিরমিজি: ১৪২১; বুখারি: ২৪৮০)
আরও একটি হাদিসে এক সাহাবি প্রশ্ন করলেন— “যদি কেউ আমার সম্পদ নিতে আসে?” রাসুল (স.) বললেন- “তুমি তা দেবে না।” “সে যদি আমাকে হত্যা করতে চায়?” “তুমি তাকে প্রতিহত করবে।” “সে যদি আমাকে হত্যা করে?” “তুমি শহীদ।” “আমি যদি তাকে হত্যা করি?” “সে জাহান্নামি।” (সহিহ মুসলিম: ২২৫)
আত্মরক্ষায় আঘাত বা হত্যা হলে দায় নেই-
এক ব্যক্তি কারও মুখে কামড়ে ধরলে অপরজন হাত ছাড়াতে গিয়ে তার দাঁত ভেঙে ফেললে রাসুলুল্লাহ (স.) ক্ষতিপূরণ দিতে বলেননি। বরং বলেন— ‘সে কি তার হাত তোমার মুখে এমনভাবে রাখতে এসেছে, যেন তুমি খাবার চিবাচ্ছো?’ (সহিহ বুখারি: ২৯৭৬; মুসলিম: ১৬৭৪)
সম্ভ্রম রক্ষায় আত্মরক্ষা করলে শাস্তি নেই-
ওমর (রা.)-এর যুগে একজন বাঁদি ধর্ষণের হাত থেকে রক্ষা পেতে আক্রমণকারীকে পাথর ছুড়ে হত্যা করলে তিনি বলেন—‘সে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিহত হয়েছে, তার কোনো ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না।’ (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক: ১৭৯১৯)
শামের এক নারীও একইভাবে আত্মরক্ষায় হত্যার ঘটনা ঘটালে তৎকালীন শাসক জাহহাক ইবনে কাইস (রা.) তদন্ত করে চোরের দোষ প্রমাণিত হওয়ায় রক্তপণ বাতিল করেন। (ইবনে আবি শায়বা: ২৭৭৯৫)
শেষ কথা, ইসলামের শিক্ষা পরিপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও আত্মরক্ষা কেবল বৈধই নয়, বরং ক্ষেত্রবিশেষে তা ঈমানের বহিঃপ্রকাশ। সতর্কতা, আত্মপ্রস্তুতি ও আত্মরক্ষার মাধ্যমে মুসলমান তার জীবন, দ্বীন ও সম্মান রক্ষা করবে—এটাই রাসুলুল্লাহ (স.)-এর শিক্ষা।