পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম,দলিলসহ আলোচনা

পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম,দলিলসহ আলোচনা

ছবিঃ সংগৃহীত।

--- পূর্বে প্রকাশিতের পর ---

 

যেসব বস্তু ঘষে পবিত্র করা যায়

জুতা, মোজার নিচের অংশ, স্যান্ডেল ইত্যাদি, যদি সেগুলো এমন কোনো নাজাসাতে নাপাক হয়ে যায়— যার বস্তুমূলক আকৃতি আছে (جرم), তাহলে তা ঘষে পবিত্র করা যায়।

جرم (জারম) বলতে বোঝানো হয়: যেসব নাপাকি শুকিয়ে গেলে দৃশ্যমান থাকে, যেমন—

  • মল

  • পশুর গোবর

  • শুকনো রক্ত

  • শুকনো বীর্য

  • মাটি লেগে থাকা প্রস্রাব বা মদের ফোঁটা

এগুলো শুকনো হোক বা ভেজা হোক, ঘষে তুলে ফেললে পবিত্র হয়ে যাবে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

إذا جاء أحدكم المسجد، فليقلب نعليه ولينظر فيهما، فإن رأى خَبَثاً (أذى أو قذراً)، فليمسحه بالأرض، ثم ليصل فيهما

“তোমাদের কেউ যখন মসজিদে আসে, সে যেন তার জুতার নিচটা উল্টিয়ে দেখে। যদি নাপাক কিছু দেখে, তাহলে যেন তা মাটিতে ঘষে মুছে ফেলে, তারপর ওই জুতা পায়ে নামাজ পড়ুক।” (আহমদ ও আবু দাউদ)

[হাদীসটি ব্যাপক অর্থবোধক, এতে ভেজা বা শুকনোর পার্থক্য করা হয়নি]

সুতরাং ভেজা নাপাকিও ঘষে দূর করা জায়েয—এটাই অধিক গ্রহণযোগ্য মত।

কিন্তু যদি নাপাকির বস্তুরূপ না থাকে (অর্থাৎ, একেবারে তরল হয়ে গেছে বা চিহ্ন নেই, তখন তিনবার পানি দিয়ে ধুতে হবে, এমনকি তা শুকিয়ে গেলেও।

প্রতি ধোয়ার পর:

  • পানি ঝরে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

  • মোজা বা জুতা ভিজে থাকলেও সমস্যা নেই, তবে ভেজাভাব কেটে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

  • পুরোপুরি শুকিয়ে যাওয়া শর্ত নয়।

৪. নাপাকির চিহ্ন ঘষে (মুছে) দূর করা

যেসব বস্তু মসৃণ ও অভেদ্য জিনিস অর্থাৎ, ভিতরে কিছু ঢোকে না— তাতে যদি নাপাকি লাগে, তাহলে মুছে ফেললেই তা পবিত্র হয়ে যায়।

যেমন বস্তু:

  • তলোয়ার

  • আয়না

  • কাচ

  • পালিশকৃত বা লেপা ধাতব পাত্র

  • নখ

  • হাড়

  • চিনামাটির বাটি

  • খাঁজবিহীন রুপার পাত ইত্যাদি

এসব বস্তুর বৈশিষ্ট্য:

  • এগুলোর মধ্যে নাপাকি ঢুকে যেতে পারে না।

  • তাই শুধু ভিজা কাপড় দিয়ে মুছে ফেললেই বাহ্যিক নাপাকি দূর হয়ে যায়।

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাহাবিদের আমল

সাহাবিরা কাফেরদেরকে তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ করতেন, তলোয়ারে অনেক সময় রক্ত লাগানো থাকতো। এরপর তলোয়ারটি মুছে ফেলেই নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। এতে প্রমাণ হয়, নাপাকি মুছে ফেলেই পবিত্রতা অর্জন সম্ভব, যদি তা মসৃণ ও অভেদ্য জিনিসে থাকে।

  • হিজামার (শিঙ্গা বা রক্ত ঝরানোর) স্থান

যখন হিজামা করা হয়, তখন শরীরের এক স্থানে রক্ত বের হয়। সেই স্থান পবিত্র করার জন্য তিনটি পরিষ্কার ও ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে ফেললেই যথেষ্ট।

৫. রোদ বা হাওয়ায় শুকিয়ে নাপাকির চিহ্ন দূর হওয়া

যদি কোনো স্থায়ী বস্তু (যেমন: মাটি, গাছ, ঘাস, পাকা মেঝে ইত্যাদি) নাপাক হয়ে যায়, তবে রোদ বা বাতাসে শুকিয়ে গেলে এবং নাপাকির চিহ্ন (দাগ, গন্ধ) চলে গেলে— তখন সেগুলো পবিত্র হয়ে যায়। তবে এই পবিত্রতা শুধু নামাজ পড়ার জন্য যথেষ্ট, কিন্তু তইয়াম্মুম করার জন্য যথেষ্ট নয়।

  • কিন্তু নিচের জিনিসগুলো:

যেমন—

  • কাপড়

  • বিছানার চাদর

  • পাটি

  • দেহ

  • যেকোনো স্থানান্তরযোগ্য জিনিস

  • এগুলো শুকিয়ে গেলে পবিত্র হয় না, ধুতে হবে পানি দিয়ে।

এই হুকুমের ভিত্তি

  • ইসলামী একটি মূলনীতি

“مذكاة الأرض يبسها”

অর্থ: “পৃথিবী বা জমিনের জন্য পবিত্রতা হলো তার শুকিয়ে যাওয়া।”

  • হাদীস থেকেও প্রমাণ: ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) বলেন:

“আমি নবিজি ﷺ-এর যুগে মসজিদে রাত কাটাতাম, তখন কুকুরেরা এসে সেখানে পেশাব করত ও ঘোরাফেরা করত, কিন্তু সাহাবিরা মসজিদে কোনো কিছু ছিটাতেন না।” [সহীহ বুখারী]

নামাজ আর তইয়াম্মুমে পার্থক্য

  • নামাজের জন্য প্রয়োজন: শুধু পবিত্রতা (طهارة)

  • তইয়াম্মুমের জন্য প্রয়োজন: পবিত্র বস্তু (طهُورية), যেমন—পবিত্র মাটি

  • শুকিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে শুধু পবিত্রতা পাওয়া যায়, কিন্তু তা তইয়াম্মুমের যোগ্যতা অর্জন করে না।

৬. মাটি স্পর্শকারী লম্বা কাপড় দিয়ে হাঁটলে কাপড় পবিত্র হয়ে যায়

যে কাপড় মাটিতে ঘষা লাগে, যেমন—নারীদের লম্বা জামার পেছনের অংশ যদি পবিত্র ও নাপাক জায়গা দিয়ে হাঁটার সময় মাটি স্পর্শ করে, তাহলে বারবার হাঁটার ফলে কাপড় পবিত্র হয়ে যায়।

হাদীস প্রমাণ:

উম্মু সালমা (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা) বললেন:

“আমি একজন মহিলা, আমার জামার পেছনের অংশ অনেক লম্বা হয়, আমি যখন নাপাক জায়গার উপর দিয়ে হাঁটি তখন কী হবে?”

রাসুলুল্লাহ বললেন:

“তারপর যেসব জায়গা দিয়ে হাঁটবে, সেগুলোই তাকে পবিত্র করে দেবে।” (সহীহ – আবু দাউদ)

হানাফি, মালিকি, হাম্বলি সব মাজহাব এই হুকুমের সাথে একমত।

চলমান ...