রাজধনী ঢাকার চানখাঁরপুলে ৬ হত্যা মামলার সাক্ষ্য শুরু আজ

রাজধনী ঢাকার চানখাঁরপুলে ৬ হত্যা মামলার সাক্ষ্য শুরু আজ

হাইকোর্ট ফাইল ছবি

 

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় সংঘটিত হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে আজ। রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের সূচনা বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে শুরু হবে এই সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া। জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সাক্ষ্য দেবেন এই মামলায়। এ ছাড়াও গত ৫ই আগস্ট চানখাঁরপুলে দায়িত্বরত পুলিশের এসআই, কনস্টেবল, এপিবিএনের সদস্যসহ জুলাই আন্দোলনে আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা এই মামলায় সাক্ষ্য দেবেন।গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের চানখাঁরপুল এলাকায় ৬ আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এতে শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ মাহদি হাসান জুনায়েদ, মো. ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক এবং মানিক মিয়া শাহরিক নিহত হন। তদন্তে উঠে এসেছে, পলাতক আসামি হাবিবুর রহমানসহ অন্যান্য আসামিরা ঘটনাস্থলে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন অথবা তা তত্ত্বাবধান করেছেন। প্রতিবেদনে অভিযুক্ত অন্যরা হলেন- ডিএমপি’র সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্ত্তী, রমনা জোনের সাবেক এডিসি শাহ আলম মো. আকতারুল ইসলাম ও এসি মো. ইমরুল, শাহবাগ থানার সাবেক পুলিশ পরিদর্শক আরশাদ হোসেন, কনস্টেবল সুজন, ইমাজ হোসেন ও নাসিরুল ইসলাম। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার আসামিরা হলেন-ইন্সপেক্টর আরশাদ, কনস্টেবল মো. সুজন, ইমাজ হোসেন ইমন ও নাসিরুল ইসলাম। এদের মধ্যে চারজন গ্রেপ্তার হলেও বাকি চারজন পলাতক। তারা অধীনদের নির্দেশ প্রদান, সহযোগিতা ও সহায়তার মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটনে ভূমিকা রাখেন। এ ছাড়া তারা এসব অপরাধ সংঘটন থেকে অধীনদের বিরত রাখেননি বা পরবর্তী সময়ে কোনো ব্যবস্থাও নেননি।এদিকে, গত ২রা জুলাই আদালত অবমাননার মামলায় হাসিনার ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের রায়ের পর্যবেক্ষণে প্রসিকিউসন জানায়, ফোনে হুমকি-ধমকি দেয়া ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার শামিল। বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হলে সেটি ‘কনটেম্পট অব কোর্ট’। বিচারকাজকে বাধাগ্রস্ত করতে দিল্লিতে বসে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নানা বক্তব্য দিচ্ছেন। মামলার ভুক্তভোগী, সাক্ষী এবং বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত তদন্ত কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের হুমকির মাধ্যমে তিনি এ প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। শেখ হাসিনার বিতর্কিত এই কথোপকথনটি পুলিশের সিআইডি’র মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রায়ে কনভারসেশনটি প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি করা হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই রায়ের কপি পুলিশের আইজিপি’র কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানান ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মনোয়ার হোসেন তামিম।আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার শাসনামলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো দ্বারা গুম, খুন ও জুলাই-আগস্টে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে এখন পর্যন্ত ৪৫০টি অভিযোগপত্র জমা পড়েছে। এদের মধ্যে ৩০টি অভিযোগ বিবিধ মামলা হিসেবে দায়ের করা হয়েছে। গুমের অভিযোগে পাঁচটি মামলার বিচারকাজ চলমান। বাকি ২৫টি মামলা জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে চলা হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা। এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে চারটি মামলার ফরমাল চার্জ দাখিল করা হয়েছে। সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে দু’টি মামলার। এসব মামলায় গ্রেপ্তার রয়েছেন ৮৪ জন। এদের মধ্যে আটজনকে একাধিক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আসামিদের মধ্যে ১৩২ জন পলাতক। কারাগারে মৃত্যুবরণ করেছেন একজন। এ ছাড়াও ২০৯ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে বিচার চলমান।আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একজন প্রসিকিউটর মানবজমিনকে বলেন, ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে এই সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হবে। চিফ প্রসিকিউটরের পরে শহীদ পরিবারের সদস্যগণ মামলায় সাক্ষ্য দেবেন। মামলার প্রয়োজনে ২০ থেকে ২৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ নেয়া হতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সাক্ষ্য দেবেন এই মামলায়। এদিকে, ঘটনার দিন রমনা জোনের সাবেক এডিসি শাহ আলম মো. আকতারুল ইসলাম এক পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে রাইফেল কেড়ে নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি ছুড়েছেন। যে পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নেয়া হয়েছিল সেও এই মামলায় সাক্ষ্য দেবেন। এ ছাড়াও দায়িত্বরত পুলিশের এসআই, কনস্টেবল, এপিবিএনের সদস্যরা মামলায় সাক্ষ্য দেবেন বলে মানবজমিনকে নিশ্চিত করেছেন তিনি। শাহবাগ থানার সাবেক পুলিশ পরিদর্শক আরশাদ হোসেনের আইনজীবী সাদ্দাম হোসেন অভি মানবজমিনকে বলেন, এই মামলায় ১১জন পুলিশ কর্মকর্তার জবানবন্দি নিয়েছেন তদন্ত সংস্থা। তারা সাবেক এডিসি মো. আকতারুল ইসলামসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন। কেউই আরশাদ হোসেনের বিরুদ্ধে কিছুই বলেনি। তারপরেও আরশাদের বিরুদ্ধে সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটি এবং কমান্ড রেসপন্সিবিলিটির আওতায় মামলায় চার্জ গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, সেদিন আরশাদ তার দায়িত্ব পালনে আইন অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। তার গুলি করার সপক্ষে প্রসিকিউশন ইতিমধ্যে কিছু দেখাতে পারেনি। আামরা মামলার চূড়ান্ত স্টেজ পর্যন্ত লড়ে যাবো। ট্রাইব্যুনালের কাছে আমরা ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি।উল্লেখ্য, গত ১৪ই জুলাই হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল-১। সেইসঙ্গে ১০ই আগস্ট এ মামলায় প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন এবং ১১ই আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। এই মামলায় ১৯৫ দিনের তদন্ত শেষে ৯০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে মোট ৭৯ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে সংযুক্ত আছে ১৯টি ভিডিও, ১১টি পত্রিকার প্রতিবেদন, ২টি অডিও, ১১টি বই ও রিপোর্ট এবং ৬টি মৃত্যু সনদ। এই দু’টি অডিও কলের একটিতে শেখ হাসিনা সরাসরি নির্দেশ দেয়ার রেকর্ড রয়েছে। এতে হাসিনা পুলিশকে গুলি করে মানুষ হত্যার নির্দেশনা রয়েছে। এ ছাড়াও সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের নির্দেশনাও রয়েছে। হাসিনা যে মানুষ হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন সেটি হাবিবুর রহমান ওয়্যারলেসের মাধ্যমে অন্য কর্মকর্তাদের জানাচ্ছিলেন। অর্থাৎ পুলিশ কমান্ড সেন্টার থেকে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে দমাতে চাইনিজ রাইফেল দিয়ে সরাসরি গুলি চালানোর নির্দেশ দেয় হাবিবুর রহমান। এই গণহত্যায় সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটির জন্য শেখ হাসিনার ও তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ আরও অনেকে রয়েছে। তবে, তাদের নামে আলাদা মামলা হওয়ায় এখানে আসামি করা হয়নি।