ইসলামে প্রত্যেক সৎকাজ বা সৎকর্মতেই সদকার সওয়াব
ইসলামে প্রত্যেক সৎকাজ বা সৎকর্মতেই সদকার সওয়াব। ফাইল ছবি।
ইসলামে সদকা বা -দান খয়রাত এক মহৎ ইবাদত। এর মাধ্যমে সমাজে দরিদ্রদের অভাব দূর হয়। তাদের মুখে সুখের হাসি ফুটে । আখিরাতে অপরিসীম সওয়াব লাভ করা যায়।
এবং রবকে সন্তুষ্ট করার অন্যতম মাধ্যম এই সদকা। তবে অনেকেই মনে করেন,সদকা কেবল অর্থ দান করার নাম। বাস্তবে তা নয়; আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অনেক সহজ, ক্ষুদ্র, ও ইতিবাচক কাজকেও নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদকার সমতুল্য বলে ঘোষণা করেছেন ।তাই শুধু বিত্তবান সম্প্রদায় নয়; দরিদ্র অসহায় ব্যক্তিদেরও সদকার সুযোগ রয়েছে ইসলামে।
হজরত জাবের রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,"প্রত্যেক সৎকাজ বা সৎকর্ম সদকা। (বুখারি: ৬০২১ মুসলিম: ১০০৫)
সেটা যেকোনো ধরনের সৎকাজ হতে পারে। চাই সেটা যত ছোট থেকে ছোট হোক কিংবা বড় । ছোট একটা উপমা- আপন ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করা। যেমনটা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, দান-খয়রাত স্বরূপ তোমার ভাইয়ের সঙ্গে তোমার হাসিমুখে সাক্ষাৎ এবং তোমার বালতি থেকে তোমার ভাইয়ের পাত্রে একটু পানি ঢেলে দেওয়াও সৎ কাজের অন্তর্ভুক্ত।(আদাবুল মুফরাদ: ৩০৪)
আরো কয়েকটি হাদিস শুনুন। কোনো অভাবী দুঃখ ভারাক্রান্ত মানুষকে সাহায্য করা। অন্ধকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া ।বোবা যাতে বুঝতে পারে সেভাবে তাদের শোনানো সদকার অংশ।( সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস :৩৩৭৭) এবং কাউকে ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকাও সদকার অন্তর্ভুক্ত।( বুখারি: ১৪৪৫ মুসলিম: ১০০৮) এমনকি কোনো মানুষকে উত্তম কথা বলাও সদকা। (বুখারী, হাদীস:৬০২৩ মুসলিম, হাদীস:১০১৬)
কী চমৎকার বিধান! আদম সন্তানের উপকার করো, সদকার সওয়াব পাবে। উপকার করতে পারছো না? তবে কমপক্ষে ক্ষতি করা থেকে বিরত থেকো,তাতেও সদকা। এটাই আমাদের ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব। ইসলাম সর্বদা মানব সম্প্রদায়ের সম্মান ও নিরাপত্তাকেই নিশ্চিত করেছে। কখনো নষ্ট হতে দেয়নি ।এমনকি নিশ্চিত করেছে জীবজন্তুর নিরাপত্তাকেও ।
সৎকাজের আদেশ করা ও অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখা। এটা আমাদের মৌলিক দায়িত্ব। এ ব্যাপারে দয়াময় আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, তোমরা সর্বোত্তম উম্মত, যাদের আবির্ভাব হয়েছে মানবজাতির (কল্যাণের) জন্য।
তোমরা সৎকাজের আদেশ করো। ও মন্দ কাজে নিষেধ করো। (সুরা আল -ইমরান,আয়াত: ১১০)
সুতরাং যারা এটা করবে তাদের জন্য রয়েছে সদকার সওয়াব। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, প্রত্যেক ভাল কাজের আদেশ দেওয়া ও মন্দ কাজ করতে দেখলে নিষেধ করা ও বাধা দেওয়া একটা সদকা। (মুসলিম:২২১৯)
যানবাহনের আরোহণে অক্ষম কোনো মানুষকে আরোহনে সাহায্য করা। তার মাল- সামানা উঠাতে সাহায্য করা। এবং রাস্তা থেকে কোনো কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়াও সদকার অন্তর্ভুক্ত ।নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেন, সূর্য উদিত হয় এমন প্রতিদিনে, মানুষের শরীরের প্রতি জোড়া গ্রন্থির উপর সদকা করা ওয়াজিব হয়। দু'জন মানুষের মাঝে ন্যায় বিচার করা একটা সদকা।
কোনো মানুষকে যানবাহনে উঠার ক্ষেত্রে সাহায্য করা কিংবা যানবাহনে তার মাল-সামানা উঠিয়ে দিতে সাহায্য করা একটা সদকা। নামাজে যাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রতিটি পদক্ষেপ সদকা। রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া সদকারই অংশ। (বুখারি ও মুসলিম)
অন্য হাদিসে নবিজী বলেন, ঈমানের সত্তর বা ষাটের বেশি শাখা রয়েছে। তার মধ্যে সর্বোত্তম হলো, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা ।এবং সর্বনিম্ন হল রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস সরিয়ে দেয়া (বুখারি: ৯ মুসলিম: ৩৫)
হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আদম সন্তানের প্রত্যেককে তিনশত ষাটটি গ্রন্থির সমন্বয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহু আকবার বললো, আলহামদুলিল্লাহ বললো ,সুবহানাল্লাহ বললো, আস্তাগফিরুল্লাহ বললো, মানুষের চলার রাস্তা থেকে পাথর সরালো, অথবা মানুষের চলার রাস্তা থেকে কাটা অথবা হাড় সরালো ,কিংবা ভালো কাজের আদেশ করলো ,অথবা মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করলো ।সবমিলিয়ে তিনশত ষাট টি পূর্ণ কর্ম করলো ।সে ওই দিন এমন অবস্থায় সন্ধ্যা করলো, যে সে নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করে নিল। (বুখারি: ২৯৮৯, মুসলিম: ৯০০৯)
এ সকল মহৎ কাজ আমরা চলার পথে প্রতিনিয়তই করতে পারি ।তবে হাদিসে এত বিশাল সওয়াবের প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও বাস্তব জীবনে আমাদের অবস্থা একদমই বিপরীত।
গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান !এটা আমাদের সমাজের প্রচলিত স্লোগান। এই বৃক্ষ রোপণেও রয়েছে সদকার সওয়াব। শুধু তাই নয়; তা থেকে যা খাওয়া হবে, যা চুরি হবে, সব সদকা। হযরত জাবের রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত ,রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "কোনো মুসলিম যখন গাছ লাগায় । এবং তা থেকে যা খাওয়া হয়, সেটা তার জন্য সদকা। যতটুকু চুরি হয় সেটাও তার জন্য সদকা।
কেউ যদি তার ক্ষতি করে, সেটাও তার জন্য সদকা। মুসলিম শরীফের অন্য এক বর্ণনায় আছে, কোনো মুসলমান যখন কোনো গাছ লাগায় ,সে গাছ থেকে কোনো মানুষ বা জন্তু কিংবা পাখি যা কিছু খায় তা কেয়ামত পর্যন্ত তার জন্য সদকা"। মুসলিম শরীফের অন্য এক বর্ণনায় আছে ,কোনো মুসলমান যে গাছ লাগায় এবং ফসল বুনে তা থেকে কোনো মানুষ কোনো জন্তু বা অন্য কিছু যা খায় তা তার জন্য সদকা। (মুসলিম: ১৫৫২)
অর্থাৎ যা খাওয়া হলো বা চুরি হলো বা নষ্ট করল (বা নিজে নিজেই নষ্ট হলো) আর সে হাঁ- হুতাশ না করে সবর করলো। তবে সে ওই পরিমাণ জিনিস সদকা করার সওয়াব পাবে ।আর তা কেয়ামত পর্যন্ত তার জন্য সদকা হবে।
সুতরাং প্রমাণিত হলো, সদকার ধারণা কেবল অর্থের লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভালো কথা বলা, মানুষের উপকার করা ,গাছ লাগানো ,ইত্যাদি কাজ করার দ্বারাও সদকা হয়। এর মাধ্যমে বুঝা যায়। ইসলাম কত সহজ ও মানবিক একটি ধর্ম। যেখানে প্রতিদিনের সাধারণ জীবনের অজস্র ইতিবাচক কাজও আখিরাতের পুঁজি হতে পারে। তাই আমাদের উচিত। প্রতিটি মুহূর্তকে সদকার রঙে রাঙানো। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন। আমিন!