দুর্যোগ মোকাবেলায় ইসলাম মানুষকে ভয় নয়, বরং সচেতনতার শিক্ষা দেয়
ছবিঃ সংগৃহীত
প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের ঝুঁকি কমানোর জন্য সচেতন করতে বিশ্বব্যাপী পালতি হয় আন্তর্জাতিক দুর্যোগ হ্রাসকরণ দিবস। ইসলাম এ বিষয়ে দুর্যোগের কারণ, মানবিক দায়িত্ব ও প্রতিরোধমূলক করণীয়সহ সবকিছুর সমন্বিত দিকনির্দেশনা দিয়েছে। কোরআন ও হাদিসে এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে।
ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, পৃথিবীতে সংঘটিত বিপর্যয়গুলো শুধু প্রাকৃতিক নিয়ম নয়, বরং অনেক সময় মানুষের অন্যায়, অবাধ্যতা ও অবিচারের ফলাফল। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের কারণে জলে ও স্থলে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, যাতে তিনি তাদের কৃতকর্মের কিছু ফল ভোগ করান, যেন তারা ফিরে আসে।’ (সুরা রুম ৪১)
অর্থাৎ দুর্যোগের অন্যতম কারণ মানুষের সীমালঙ্ঘন ও দায়িত্বহীনতা।
কিন্তু একই সঙ্গে ইসলাম মানুষকে ভয় নয়, বরং সচেতনতা ও প্রস্তুতির শিক্ষা দিয়েছে। নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া ইমানদারের বৈশিষ্ট্য।’ (সহিহ মুসলিম) ইসলামি সভ্যতায় দুর্যোগ মোকাবিলার এই বাস্তব শিক্ষা স্পষ্ট। খলিফা ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর সময়ে যখন এক এলাকায় প্লেগ দেখা দেয়, তিনি অন্যত্র যাওয়ার নির্দেশ দেন। তখন বলা হয়, আপনি কি আল্লাহর তকদির থেকে পালাচ্ছেন? তিনি জবাব দেন, ‘আমি আল্লাহর এক তকদির থেকে অন্য তকদিরে যাচ্ছি।’ (সহিহ বুখারি ৫৭২৯) এটি ইসলামের দৃষ্টিতে দুর্যোগ প্রশমনের সবচেয়ে গভীর দৃষ্টান্ত অর্থাৎ আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে মানবিক পদক্ষেপ গ্রহণ।
ইসলাম দুর্যোগের সময় সহনশীলতা, মানবসেবা ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনরা পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল ও দয়ালু। তারা এক শরীরের অঙ্গের মতো। এক অঙ্গ কষ্ট পেলে অন্য অঙ্গও জাগ্রত হয়ে ওঠে।’ (সহিহ বুখারি ৬০১১) দুর্যোগকালীন মানবিক সহযোগিতা তাই ইমানেরই অংশ।
“তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।” — (সূরা আল-বাকারা ২:১৫২)
আল্লাহতায়ালা আমাদের প্রকৃতি দান করেছেন। আমাদের বসবাসের উপযোগী করে এই সুন্দর বসুন্ধরা সাজিয়েছেন অপরূপ মায়াবী কারুকার্যে। যাবতীয় প্রয়োজনীয় বস্তু সামগ্রী দিয়েই মানুষকে পাঠিয়েছেন পৃথিবীর বুকে। এই প্রকৃতি মহান আল্লাহ কর্র্তৃক সৃষ্ট ও পরিচালিত। তবে মাঝেমধ্যে প্রকৃতি বিরূপ রূপ ধারণ করে। আমাদের ওপর আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড়, কালবৈশাখী, শিলাবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস ভারী বর্ষণ, বন্যা, খরা, দাবানল, শৈত্যপ্রবাহ, দুর্ভিক্ষ, মহামারী, ভূমিকম্প, সুনামিসহ ইত্যাকার প্রাকৃতিক দুর্যোগসমূহ। এসব বিপদ থেকে বাঁচার জন্য মহান আল্লাহর কাছে আমাদের দ্বারস্থ হতে হবে।
কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দিলে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিচলিত হয়ে পড়তেন। আল্লাহর শাস্তির ভয় করতেন। বেশি বেশি তওবা-ইস্তেগফার করতেন এবং অন্যদেরও তা করার নির্দেশ দিতেন। ঝড়-তুফান শুরু হলে তিনি মসজিদে চলে যেতেন। নফল নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা জানাতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এ আমল দ্বারা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুহূর্তে আমাদের করণীয় কী তা জানতে পারি। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুমিনের বিষয়টি সত্যিই আশ্চর্যের! তার প্রতিটি কাজই কল্যাণকর। যদি তারা সুখে থাকে তবে শুকরিয়া আদায় করে। যার ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর সে বিপদে পড়লে ধৈর্য ধরে, তাও তার জন্য মঙ্গলজনক হয়।’ (মুসলিম)
আল্লাহতায়ালা মানুষকে বিভিন্ন বিপদাপদ দিয়ে পরীক্ষা ও সতর্ক করে থাকেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা, জান, মাল ও ফলফলাদির ক্ষতির মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। যারা নিজেদের বিপদের সময় বলে, নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা আল্লাহরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। তাদের ওপরই রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও রহমত এবং তারাই হেদায়াতপ্রাপ্ত।’ (সুরা বাকারা ১৫৫-১৫৭)
প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ হলো আল্লাহতায়ালার অসন্তুষ্টি। আল্লাহতায়ালা মানুষকে আশরাফুল মখলুকাত হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। তিনি অযথা কাউকে শাস্তি দিতে চান না। আল্লাহর আজাব থেকে বাঁচার জন্য আমল পরিশুদ্ধ করতে হবে। যে আমলে আল্লাহ খুশি হন, সে আমল বেশি বেশি করতে হবে। নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা ইত্যাদি ভালো কাজ করতে হবে। হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, ‘সদকা আল্লাহর অসন্তুষ্টিকে নিভিয়ে দেয় এবং অপমৃত্যু রোধ করে।’ সুনানে তিরমিজি
মুমিন বান্দার উচিত, সবসময় আল্লাহর পথে অগ্রসর হওয়া, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা, তার নির্দেশিত বিধিবিধান পালন করা। বিশেষ করে তার নিষেধাজ্ঞাগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করা। তবেই আল্লাহতায়ালা পার্থিব জীবনের কঠিন বিপদাপদ ও দুর্যোগ থেকে মুক্তি দেবেন এবং মৃত্যুর পরে উত্তম প্রতিদান দেবেন।
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার
-সংগৃহীত