কোরআন শুধু পড়েন নাকি বুঝেও পড়েন?

কোরআন শুধু পড়েন নাকি বুঝেও পড়েন?

ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র কোরআন মহান আল্লাহ তাআলার অমূল্য নেয়ামত, যা সমগ্র মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান ও আলোকবর্তিকা। এটি এমন এক কিতাব, যা পাঠ করলে সওয়াব মেলে, আবার এর অর্থ অনুধাবন করলে মেলে হেদায়েত, প্রশান্তি ও আল্লাহর নৈকট্য। নবীজি (স.) বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি হরফ পাঠ করবে, সে নেকি পাবে। আর প্রতিটি নেকির পুরস্কার দশগুণ।’ (তিরমিজি: ২৯১০)

তবে কোরআনের প্রকৃত স্বাদ, আত্মিক শক্তি ও পরিপূর্ণ লাভ পাওয়ার জন্য এর অর্থ বোঝা ও তা নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘আমি আপনার প্রতি এ বরকতপূর্ণ কিতাব নাজিল করেছি; তারা যেন এর আয়াতগুলো অনুধাবন করে এবং জ্ঞানীরা উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সুরা সোয়াদ: ২৯)

কোরআন বুঝে পড়ার তাৎপর্য ও সুবিধা

১. ওহির মূল উদ্দেশ্য হৃদয়ঙ্গম করা

কোরআন নাজিলের প্রধান উদ্দেশ্য হলো মানুষকে সঠিক পথে পরিচালনা করা। শুধু তেলাওয়াত করলে সওয়াব মিললেও এর প্রকৃত দিকনির্দেশনা ও আদর্শ বোঝা সম্ভব হয় না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ গভীরভাবে চিন্তা-গবেষণা করে এবং বুদ্ধিমানরা উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সুরা সোয়াদ: ২৯)

২. আত্মার পরিশুদ্ধি ও অন্তর সতেজ করা

অন্তর যখন গাফলতি, পাপ ও দুনিয়ার মায়ায় আচ্ছন্ন হয়, তখন তা মরিচা ধরা লোহার মতো কঠিন হয়ে পড়ে। কোরআন সেই অন্তরকে পরিশুদ্ধ ও জীবন্ত করে তোলে। আল্লাহ বলেন- ‘হে মানুষ! নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে উপদেশ এসেছে এবং যা অন্তরের রোগের নিরাময়, হেদায়েত ও রহমত মুমিনদের জন্য।’ (সুরা ইউনুস: ৫৭)

৩. আল্লাহর সঙ্গে সংলাপের অনুভূতি

কোরআন পাঠ করা মানে আল্লাহর সঙ্গে সংলাপে মগ্ন হওয়া। যখন মুমিন বান্দা অর্থ বুঝে তেলাওয়াত করে, তখন সে যেন তার রবের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনে লিপ্ত হয়। রাসুলুল্লাহ (স.)-ও কোরআন পাঠের সময় আয়াতের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করতেন- ‘যখন তিনি আল্লাহর প্রশংসার আয়াত পড়তেন, তখন প্রশংসা করতেন; যখন দোয়ার আয়াত পড়তেন, তখন দোয়া করতেন; আর যখন আশ্রয় প্রার্থনার আয়াত আসত, তখন আশ্রয় চাইতেন।’ (মুসলিম)

৪. আল্লাহর নির্দেশনা সরাসরি উপলব্ধি

কোরআন মানবজাতির প্রতি আল্লাহর সরাসরি বার্তা। অর্থ না বুঝে পড়লে সেই বার্তা হৃদয়ে প্রবেশ করে না। আল্লাহ বলেন, ‘তারা কি কোরআন নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে না? যদি এটি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে হত, তবে তারা এতে অনেক বৈপরীত্য দেখতে পেত।’ (সুরা নিসা: ৮২)

৫. উত্তম চরিত্র গঠন

আয়েশা (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘তাঁর চরিত্র ছিল কোরআন।’ কোরআনের শিক্ষা অনুধাবন ও তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগের মাধ্যমেই প্রকৃত ইসলামি চরিত্র গড়ে ওঠে।

৬. বাস্তব জীবনের দিকনির্দেশনা

কোরআন শুধু ইবাদতের কিতাব নয়, বরং এটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি বিষয়ে কোরআন দিকনির্দেশনা দেয়। যারা এর অর্থ বুঝে চর্চা করে, তারা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়।

৭. ঈমানের দৃঢ়তা বৃদ্ধি

কোরআনের আয়াতগুলো মনোযোগসহ শুনা বা পাঠ করার মাধ্যমে মুমিনের ঈমান আরও সুদৃঢ় হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘মুমিন তো তারা, যাদের অন্তরসমূহ কেঁপে উঠে যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয়। আর যখন তাদের ওপর তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে।’ (সুরা আনফাল: ২)

৮. অন্তরে প্রশান্তি ও তৃপ্তি লাভ

জাগতিক সম্পদ হয়তো সাময়িক আনন্দ দেয়, কিন্তু স্থায়ী প্রশান্তি আসে আল্লাহর জিকির ও কোরআনের আলো থেকে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা ঈমান আনে এবং তাদের অন্তর আল্লাহর জিকির দ্বারা শান্তি লাভ করে—জেনে রাখো, আল্লাহর জিকির দ্বারাই অন্তরসমূহ শান্তি পায়।’ (সুরা রাদ: ২৮)

কোরআন থেকে পূর্ণাঙ্গ উপকার লাভের শর্ত

কোরআন পাঠের উদ্দেশ্য যদি শুধু তেলাওয়াত হয়, কিন্তু মন ও দেহ অপবিত্র থাকে বা নিয়ত খাঁটি না হয়, তবে প্রকৃত উপকার পাওয়া যায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘আল্লাহ এর (কোরআনে বর্ণিত দৃষ্টান্ত) মাধ্যমে বহুজনকে পথভ্রষ্ট করেন এবং বহুজনকে পথপ্রদর্শন করেন। এর মাধ্যমে বস্তুত পাপীদের পথভ্রষ্ট করা হয়।’ (সুরা বাকারা: ২৬)

তাই আলেমরা বলেন- কোরআন দ্বারা উপকৃত হতে হলে পবিত্র মন-দেহ নিয়ে, মনোযোগসহ অর্থ বোঝার চেষ্টা করতে হবে এবং অন্তরে সৎপথ লাভের আকাঙ্ক্ষা থাকতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি তাদের পথ দেখান, যারা তাঁর অভিমুখী।’ (সুরা রাদ: ১৩)

মোটকথা, কোরআনকে শুধু তেলাওয়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। এটি গবেষণা, অনুধাবন ও বাস্তবায়নেরও কিতাব। না বুঝে তেলাওয়াত করলে সওয়াব মেলে, কিন্তু এর অগাধ জ্ঞান, হেদায়েত ও আত্মশুদ্ধির ফল থেকে বঞ্চিত থাকতে হয়।

তাই আসুন, আমরা কোরআনের অর্থ বুঝে পড়ি, চিন্তা করি এবং জীবনে তা বাস্তবায়ন করি। এতে আমরা সেই সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারব, যাদের সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘আল্লাহর কিছু পরিবারভুক্ত লোক আছে।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, তারা কারা? নবীজি (স.) বললেন, ‘যারা কোরআনের ধারক-বাহক; এরা আল্লাহর পরিবারভুক্ত ও তাঁর বিশেষ লোক।’ (তারগিব ওয়া তারহিব: ০২/৩০৩)

কোরআনের সান্নিধ্যেই নিহিত আছে আমাদের দুনিয়ার প্রশান্তি, আত্মার পরিশুদ্ধি ও আখিরাতের মুক্তি।