ঠকবাজ/প্রতারককে ক্ষমা করেন না আল্লাহ
ঠকবাজ/প্রতারককে ক্ষমা করেন না আল্লাহ। ছবিঃ সংগৃহীত
বর্তমান সমাজে প্রতারণা এমনভাবে শিকড় গেড়েছে, যেন এটি জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় মানুষ একে অপরের প্রতি আস্থা রাখত, কথা মানে ছিল অঙ্গীকার, বিশ্বাস মানে ছিল বন্ধন। কিন্তু এখন সেই বন্ধন ছিন্ন হয়েছে স্বার্থের কাঁচি দিয়ে। সামান্য লাভের আশায় মানুষ ঠকাচ্ছে মানুষকে, প্রতারণা করছে আপনজনকেও। এই প্রবণতা শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য বা অর্থনৈতিক লেনদেনে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, এমনকি ধর্মীয় আচরণেও ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ ইসলাম এই প্রবণতাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। প্রতারক ও ঠকবাজকে মহান আল্লাহ ক্ষমা করবেন না, বরং যাকে ঠকানো হয়েছে, যার সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর যে কেউ ওয়াদা ভঙ্গ করলে তার ওয়াদা ভঙ্গের পরিণাম বর্তাবে তারই ওপর। আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে দেওয়া ওয়াদা পূরণ করবে, অচিরেই আল্লাহ তাকে মহাপুরস্কার দেবেন।’ (সুরা ফাতাহ ১০) এই আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন, বিশ্বাসঘাতকতা ও ওয়াদা ভঙ্গ এক প্রকার গুনাহ, যার দায় শেষ পর্যন্ত মানুষকেই বহন করতে হয়।
বর্তমান সমাজে মানুষকে ঠকানোর নানা রূপ দেখা যায়। কেউ অর্থের লোভে প্রতারণা করে, কেউ ক্ষমতার মোহে, আবার কেউ খ্যাতির আশায়। অনলাইন কেনাবেচা এখন মানুষের জীবনের অংশ। কিন্তু এই সুবিধার সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা গ্রাহককে প্রতিনিয়ত ধোঁকা দিচ্ছে। বিজ্ঞাপনে দেখানো পণ্য এক রকম, হাতে পাওয়া জিনিস অন্যরকম। আবার অনেক সময় টাকা নেওয়ার পর পণ্য পাঠানোই হয় না। এ যেন নতুন যুগের পুরনো প্রতারণা রূপ পাল্টে এসেছে।
আরেকটি বড় প্রতারণা হচ্ছে চাকরি বা শিক্ষার সুযোগের নামে মানুষকে ফাঁদে ফেলা। হাজারো তরুণ প্রতিদিন প্রতারিত হচ্ছে চাকরির আশায়, কেউ কেউ আবার বিদেশে পাঠানোর কথা বলে সর্বস্ব হারাচ্ছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ গরিব পরিবারের সন্তান, যারা ধার-দেনা ভাগ্যের চাকা বদলাতে চায়। কিন্তু প্রতারকরা তাদের সেই আকাক্সক্ষাটুকু শেষ করে দেয়।
একইভাবে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ওজনে কম দেওয়া, ভেজাল পণ্য বিক্রি করা বা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে গ্রাহককে ঠকানো এখন যেন স্বাভাবিক ব্যাপার। অথচ পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন, ‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা পরিমাপে কম দেয়।’ (সুরা মুতাফফিফিন ১) এই আয়াতের প্রতিটি শব্দ যেন আমাদের ব্যবসায়িক সমাজের আয়নায় প্রতিফলিত হয়।
— নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সাথেই আছেন, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে ও সৎকর্ম করে।
(সূরা নাহল ১৬:১২৮)
হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করবে, সে আমাদের লোক নয়। আর যে আমাদের প্রতারণা করবে, সেও আমাদের লোক নয়।’ (সহিহ মুসলিম) এই হাদিসে প্রতারণাকে এমন পর্যায়ে নিন্দা করা হয়েছে যে, প্রতারককে মুসলিম সমাজের অন্তর্ভুক্ত বলা হয়নি। অর্থাৎ প্রতারণা শুধু একটি সামাজিক অপরাধ নয়, এটি ইমান নষ্টেরও কারণ।
আমাদের সমাজে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রতারণা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিবাহের মতো পবিত্র বন্ধনেও দেখা যাচ্ছে মিথ্যা পরিচয়, আর্থিক প্রতারণা, এমনকি আবেগের সুযোগ নিয়ে ঠকানো। কেউ মিথ্যা ভালোবাসার অভিনয় করে অপরজনের আবেগ ও সম্পদ লুটে নিচ্ছে। আবার কেউ ব্যবসায়িক লেনদেনে আস্থার মানুষ হয়ে প্রবেশ করছে, তারপর একদিন কৌশলে পালিয়ে যাচ্ছে।
প্রতারকদের আচরণে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হয় না ভুক্তভোগী, ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমাজের আস্থা ও নৈতিকতা। মানুষ যখন একে অপরকে বিশ্বাস করতে পারে না, তখন সমাজ ভেঙে পড়ে। বন্ধুত্ব হয় সন্দেহের, ব্যবসা হয় ঝুঁকির আর সম্পর্ক হয় ভয়ের। এমন সমাজে শান্তি কখনো প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।
ইসলামের দৃষ্টিতে প্রতারণা শুধু অন্যের ক্ষতি নয়, নিজের ক্ষতিও বয়ে আনে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তারা আল্লাহ ও মুমিনদের সঙ্গে ধোঁকাবাজি করে। প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেদের ছাড়া আর কারও সঙ্গে ধোঁকাবাজি করে না। আর তারা তা বুঝতেও পারে না।’ (সুরা বাকারা ৯) অর্থাৎ প্রতারণা মানুষকে এমন অন্ধ করে দেয় যে, সে নিজের ক্ষতির দিকটাও বুঝতে পারে না।
নবী করিম (সা.) প্রতারকদের বিষয়ে বলেছেন, ‘শেষ বিচারের দিনে প্রত্যেক প্রতারকের পুনরুত্থান ঘটবে তার বিশ্বাসঘাতকতার পতাকা বহন করা অবস্থায়।’ (সহিহ বোখারি) এই হাদিসের বর্ণনা আমাদের মনে ভয় সৃষ্টি করে, কারণ যে পতাকা সে বহন করবে, তা হবে তার লজ্জা ও অপমানের প্রতীক।
বর্তমান সমাজে দেখা যাচ্ছে, অনেকেই নিয়মিত নামাজ পড়েন, রোজা রাখেন, হজ করেন, কিন্তু মানুষের সঙ্গে প্রতারণা থেকে বিরত থাকেন না। অথচ ইসলাম এমন দ্বৈত আচরণকে গ্রহণ করে না। কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো।’ (সুরা বাকারা ২০৮) অর্থাৎ ইসলাম শুধু নামাজ বা রোজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর মূল শিক্ষা হলো সত্যবাদিতা, ন্যায়বিচার ও আমানত রক্ষায়।
বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণা সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘মহান আল্লাহ বলেছেন, হাশরের দিন আমি তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে যাব, তাদের একজন সে, যে কথা দিয়ে কথা রাখেনি।’ (বুখারি) ভাবতে অবাক লাগে, প্রতারণার জন্য আল্লাহ নিজেই বিরোধিতা করবেন। এর চেয়ে বড় সতর্কবার্তা আর কী হতে পারে!
প্রতারণার কারণে মানুষ যে খারাপ পরিণতির মুখোমুখি হয়, তা কখনো কখনো দুনিয়াতেই দেখা যায়। অনেক প্রতারক জীবনের শেষভাগে নিঃস্ব হয়ে পড়ে, সমাজে সম্মান হারায়, পরিবারে অবিশ্বাস জন্ম নেয়। কারণ প্রতারণা যতই গোপনে করা হোক না কেন, একদিন না একদিন সেটার পরিণতি প্রকাশ পায়।
ইসলাম মানুষের মাঝে ভালোবাসা, সত্যবাদিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার শিক্ষা দেয়। সমাজ তখনই সুন্দর হয়, যখন মানুষ পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকে। যদি আমরা সত্যবাদী না হই, তাহলে কোনো আমলই আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না।
অতএব এখনই সময়, আমরা নিজেদের আত্মসমালোচনা করি। নিজের জীবনে, ব্যবসায়, আচরণে, সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোথাও যেন প্রতারণা না থাকে। অন্যকে ঠকানো মানে নিজেকে ধ্বংস করা। মহান আল্লাহ আমাদের এমন সমাজ গড়ার তৌফিক দান করুন, যেখানে কেউ কারও সঙ্গে প্রতারণা করবে না, বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, ধোঁকাবাজি করবে না। সবাই একে অপরের নিরাপত্তা ও সম্মানের নিশ্চয়তা দেবে। আর আল্লাহর ভয়ে, ইমানের শক্তিতে আমরা যেন সত্য, ন্যায় ও বিশ্বস্ততার পথে অটল থাকতে পারি।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক