মানসিক সুস্থতার অন্তরায় হতাশা ও ভোগবাদ
মানসিক সুস্থতার অন্তরায় হতাশা ও ভোগবাদ। ছবিঃ সংগৃহীত
মানুষের জীবনযাত্রায় মানসিক স্বাস্থ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুস্থ মন ছাড়া শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্যও পূর্ণতা পায় না। ইসলাম মানুষের মানসিক সুস্থতাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। কোরআন ও হাদিসে এমন অনেক নির্দেশনা পাওয়া যায়, যা মনের প্রশান্তি, দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি এবং মানসিক ভারসাম্য রক্ষায় কার্যকর। আল্লাহতায়ালা কোরআনে বলেছেন, ‘জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয় প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাদ, আয়াত ২৮) এই আয়াত স্পষ্ট করে যে, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হৃদয়ের শান্তির মূল উৎস আল্লাহর স্মরণ। নিয়মিত নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া-জিকির মানুষের অন্তরে স্বস্তি আনে। এটি মানসিক চাপ হ্রাস করে এবং আত্মাকে দৃঢ় করে। ইসলাম সামাজিক বন্ধনকেও মানসিক সুস্থতার অংশ করেছে। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, পরস্পরকে সালাম দেওয়া, খোঁজখবর নেওয়া, এসব অভ্যাস একাকিত্ব ও বিষন্নতা দূর করে। দান-সদকা ও অপরের সাহায্য মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়।
বর্তমান সময়ের দ্রুতগতির জীবনে উদ্বেগ, হতাশা ও মানসিক চাপ বেড়েই চলেছে। বাড়ছে মানসিক রোগীর সংখ্যাও। আমাদের সমাজে দুই শ্রেণির মানসিক রোগী আছে। এক. দুঃখন্ডকষ্ট ও হতাশায় ভুগে মানসিক রোগে আক্রান্ত। দুই. দুনিয়ার ভোগবাদে গা ভাসিয়ে মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ। হতাশা ও ভোগবাদ কীভাবে মানসিক স্থাস্থ্যের ক্ষতি করে, শরীর ও মন এবং এর আনুষঙ্গিক বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণী উল্লেখ করা হলো।
মানব দেহে মনের অবস্থান কোথায়, মনের আকার কেমন, তা নিয়ে বিজ্ঞান, দর্শন, জড়বাদ ও ভাববাদে বিভিন্ন তর্ক থাকলেও মানব দেহে মন বিরাজমান, এই বিষয়টি মানুষ মাত্রই বিশ্বাস করেন কোনো যুক্তিতর্ক ছাড়াই। গল্প-সাহিত্যে মনের বহুল ব্যবহার এবং ‘মনে হয় না’, ‘মন চায় না’, ‘মন খারাপ’, ‘মন ভালো’, ‘মনে রেখো’, ‘মনে করি’, এসব বাক্য প্রতিটি মানুষ প্রতিদিনের আলাপচারিতায় এত অধিক পরিমাণে ব্যবহার করে যে, মনের ব্যাপারে ওইসব যুক্তিতর্কে না গিয়েও মানুষ বুঝতে পারে, মানব দেহে মন বিরাজমান।
শরীর ও মন একটি অপরটির পরিপূরক। তবে মন শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে নাকি শরীর মনকে, সেটা নিয়েও তর্ক রয়েছে। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের অবকাঠামো ও ক্রিয়াকলাপের বাহ্যিক রূপ বিদ্যমান। কিন্তু মনের বিষয়টি অভ্যন্তরীণ। আমরা মন বলতে বুঝি চিন্তা-চেতনা, আবেগ-আনুভূতি, কল্পনা ও ইচ্ছা প্রভৃতি কতগুলো মানসিক কাজের সমষ্টিকে।
কেউ শারীরিক ক্রিয়া সম্পাদন করলে শরীরের পরিশ্রম হয়। কিংবা কাউকে শারীরিক আক্রমণ করলে শরীর আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এতে শরীরের অঙ্গ বিকৃত হয়। আক্রান্ত স্থানে ব্যথা অনুভূত হয়। এ ক্ষেত্রে মনের ওপর শরীর প্রভাব বিস্তার করে। দৈহিক আঘাতের ব্যথায় মন ভারী হয়। প্রতিষেধক দ্রব্য গ্রহণ করলে শারীরিক এই ব্যথা দ্রুত সেরে ওঠে।
কিন্তু মনের বিষয়টি শরীরের মতো নয়। মানসিক কাজ যথা চিন্তা, অনুভূতি ও ইচ্ছা এগুলো দ্বারা যখন মন স্বীয় ক্রিয়াকলাপ সম্পাদন করে তখন মনেরও পরিশ্রম হয়। তবে কেউ কোনো কিছুর বিয়োগ, ভয় বা হতাশায় গভীরভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলে, কারও প্রবল ইচ্ছার মৃত্যু ঘটলে কিংবা কারও কার্যকলাপ বা কথায় প্রচণ্ড দুঃখ পেলে মন আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এই আঘাতের প্রভাব যখন মনে দীর্ঘস্থায়ী হয় তখন মানুষ মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। আর এই মানসিক অবসাদ শরীরকেও বিষিয়ে তোলে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জেনে রেখো, মানুষের শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে, যখন তা ঠিক থাকে, তখন সমস্ত শরীর ঠিক থাকে। আর যখন তা খারাপ হয়ে যায়, তখন সমস্ত শরীর খারাপ হয়ে যায়। জেনে রেখো, সেই গোশতের টুকরাটি হলো কলব বা হৃদয়।’ (সহিহ বুখারি)
— নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সাথেই আছেন, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে ও সৎকর্ম করে।
(সূরা নাহল ১৬:১২৮)
হাদিসে ব্যবহৃত কলব শব্দ দ্বারা গোশতের টুকরা অর্থাৎ হৃদয় উদ্দেশ্য। কোরআনে ব্যবাহৃত কলবের অর্থও করা হয় হৃদয় শব্দ দ্বারা। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তাদের কলব বা হৃদয়ে রোগ আছে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ১০) কোরআনে আরও বলা হয়েছে, ‘যদি তাদের কলব বা হৃদয় থাকত, যা দ্বারা তারা বিবেচনা করবে।’ (সুরা হজ, আয়াত ৪৬)
হাদিসের মর্ম দ্বারা বুঝা যায়, মনের অবস্থান হৃদয়ে। ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর মতে হৃদয়ই হলো বুদ্ধিমত্তা বা বিবেচনার কেন্দ্রস্থল। অ্যারিস্টটলও এমন মত পোষণ করেন। কোরআনের ক্ষেত্রেও তাই মনে হয়। কিন্তু কোরআনে কলব বা হৃদয়ের পর ব্যবহৃত শব্দ ‘আকল’ বা ‘বিবেচনা’ দ্বারা বুঝা যায় মনের অবস্থান মস্তিষ্কে। কেননা বিবেচনা বোধ মস্তিষ্কের কাজ। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত অনুযায়ী মস্তিষ্কই বিবেচনার আধার। বিখ্যাত দার্শনিক প্লেটোর থিওরি এমনটিই। তাফসিরে রুহুল মায়ানিতে উল্লেখ আছে, কোরআনে ব্যবহৃত কলব শব্দের ব্যাপারে অনেক স্কলার এই মত দিয়েছেন যে, এই কলবই হলো সব জ্ঞানের উৎস। আর তা হলো মস্তিষ্ক। আধুনিক বিজ্ঞানের ধারণা মতে, মনের অবস্থান মস্তিষ্কে। মন শরীরের বিভিন্ন স্থানে প্রভাব বিস্তার করে। তবে হৃদয়ে প্রভাব বিস্তারের মাত্রা বেশি। তাই মনে হয় হৃদয়েই মনের অবস্থান।
শারীরিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষার মতো মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষাও অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতায় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং প্রতিষেধক দ্রব্য গ্রহণ করা হলেও মনের অবকাঠামোগত কোনো বাহ্যিক আকৃতি না থাকায় মানসিক অসুখের সুস্থতার ক্ষেত্রে তা খুব একটা দেখা যায় না। অথচ বলা হয়, মন হলো শরীরের রাজা। কিন্তু শরীরের রাজা খ্যাত মন বিষন্নতায় ভুগে মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হয়ে ভ্রমাত্মক আচরণ করলে ধরে নেওয়া হয় অশরীরী জিন-ভূতের অনিষ্টতার কবলে পড়েছে। অনেক সময় এমন রোগীকে নিয়ে কবিরাজি চিকিৎসা-তদবিরের দারস্থ হতে দেখা যায়। এমন মানসিক ব্যাধির ক্ষেত্রে কবিরাজের ভুল চিকিৎসা আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
কঠোর পরিশ্রম ও সাধনা করে কাক্সিক্ষত বস্তু অর্জন করতে না পেরে, অপর কারও থেকে প্রতারণার শিকার হয়ে কিংবা মাদকের ভয়ংকর প্রভাবের ফলে অনেক সময় মানুষ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে চরম বিষাদ, অবসাদ ও বিষন্নতায় ভোগে। মানসিক এই অবসাদ ও বিষন্নতা যখন মানুষকে জেঁকে ধরে তখন মানুষের মস্তিষ্কে প্রচণ্ড চাপ অনুভূত হয়। ব্যথাতুর আবেগ শরীরকে বিষিয়ে তোলে। মনের আকাশে অবসাদের কালো মেঘ জড়ো হয়ে ভাসতে থাকে। হৃদযন্ত্রে বাড়ে ক্ষিপ্রতা। শুরু হয় না ঘুমানোর অসুখ। মনের আকাশে ভাসতে থাকা মেঘগুলো ছলছলে চোখ বেয়ে বৃষ্টি হয়ে নেমে আসে। পানাহারে আসে অনীহা। পানাহারকে বিষ আর বিষকে সুপেয় সংজ্ঞায়িত করতে থাকে মানুষের অসুস্থ মন।
এমন হতাশাগ্রস্ত মানুষের ভেতর যদি এই ব্যাধি কিছুদিন স্থায়ী হয় তাহলে মস্তিষ্কের স্নায়ুতে থাকা কোষগুলো ধীরে ধীরে নষ্ট হতে থাকে। মস্তিষ্কের স্নায়ুতে প্রায় এক বিলিয়ন কোষ থাকে। বিজ্ঞানের ধারণা মতে, এই কোষগুলোতেই মনের অবস্থান। এই কোষগুলো একবার নষ্ট হলে কোনো চিকিৎসার দ্বারাই সেটার প্রতিস্থাপন করা যায় না। তাই এমন ব্যাধিগ্রস্ত মানুষকে নিয়ে দ্রুত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। নয়তো সিজোফ্রেনিয়া ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে।
মানসিক ব্যাধিসমূহের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর মনে করা হয় সিজোফ্রেনিয়া ব্যাধিকে। মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত ব্যক্তি যদি সিজোফ্রেনিয়াতে আক্রান্ত হয়, তাহলে তার কাছে জগতের সবকিছু বিভ্রান্তিকর মনে হয়। কোনটা সত্য আর কোনটা কল্পনা সেটার মাঝে পার্থক্য করতে পারে না। এতে ধীরে ধীরে সে স্থায়ীভাবে পাগলে পরিণত হতে থাকে।
*** চলমান ***