মানসিক সুস্থতার অন্তরায় হতাশা ও ভোগবাদ

মানসিক সুস্থতার অন্তরায় হতাশা ও ভোগবাদ

মানসিক সুস্থতার অন্তরায় হতাশা ও ভোগবাদ। ছবিঃ সংগৃহীত

___ পূর্বেপ্রকাশিতের পর ___

মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার মূলে রয়েছে ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তির নেতিবাচক চিন্তা করা কিংবা অপর কারও থেকে মানসিক আঘাত পাওয়া। মানবতার ধর্ম ইসলাম মানসিক ব্যাধির মূলকেই উৎপাটন করেছে। যে বিষয়ের চিন্তা-ভাবনা করা ক্ষতিকর কিংবা যে বিষয়ের চিন্তা-ভাবনায় হতাশা ও বিষন্নতা বাড়ে, ইসলাম সেই বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে নিষধ করেছে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘আর তোমাদের মনে যা আছে, তোমরা তা প্রকাশ করো অথবা গোপন রাখো, আল্লাহ সেটার হিসাব তোমাদের কাছ থেকে গ্রহণ করবেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ২৮৪) সুতরাং এমন কোনো বিষয়ে মনে মনে চিন্তা করা, যার কারণে মানসিক অবসাদ আসতে পারে, সেটার জন্যও আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

পড়াশোনায় অকৃতকার্যতা, কর্মক্ষেত্রে অস্থিরতা, উপার্জনে অক্ষমতা, দাম্পত্য জীবনে অসুখী, নিঃসন্তান থাকা এবং কাক্সিক্ষত বস্তু অর্জন করতে না পারাসহ প্রভৃতি বিষয়ে ব্যর্থ হয়ে মানুষ ভয়ংকর রকমের বিষন্নতায় ভোগে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘বিষন্ন হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা তওবা, আয়াত ৪০)

মুমিন ব্যক্তির বিষন্নতায় ভোগা উচিত নয়। তবে মুমিন ব্যক্তির মনেও বিষন্নতা আসতে পারে। কিন্তু তা স্থায়ী হয় না। কেননা তারা সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে। আল্লাহ তাদের বিষন্নতা দূর করে দেন। মুমিন ব্যক্তি যদি এমন বস্তুর আশা করে যা তার জন্য ক্ষতিকর, তবে আল্লাহ সেটা তাকে দেন না। হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়, হতাশায় না ভুগে ধৈর্যশীল হলে আল্লাহতায়ালা মুমিনকে তার কাক্সিক্ষত বস্তুর দ্বিগুণ পরিমাণ দিয়ে থাকেন।

মানুষকে কষ্ট দেওয়া হারাম। তা শারীরিক কষ্ট হোক বা মানসিক কষ্ট। আল্লাহতায়ালা এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘যারা বিনা অপরাধে বিশ্বাসী পুরুষ ও নারীদের কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।’ (সুরা আহজাব, আয়াত ৫৮) রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সেই প্রকৃত মুসলমান, যার জিহ্বা ও হাতের অনিষ্টতা থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদে থাকে।’ (সহিহ বুখারি)

ইসলাম অল্পে তুষ্ট থাকার শিক্ষা দেয়। কাক্সিক্ষত বস্তু অর্জিত না হলেও অল্পে তুষ্টির শিক্ষা মানুষকে বিষন্নতা থেকে মুক্ত রাখে। সর্বোপরি পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে ইসলামি অনুশাসন মেনে চললে এবং পরিপূর্ণভাবে মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করলে আশা করা যায়, কারও পরিবারের কোনো সদস্যই মানসিক অবসাদে ভুগবে না। তবুও আকস্মিক কোনো দুর্ঘটনায় কেউ মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হলে পরিবারের সদস্যদের উচিত তাকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া।

মানসিক রোগী পাগল নয়। দুঃখন্ডকষ্ট ও হতাশায় ভুগে যে কারও এমন অবস্থা হয়ে যেতে পারে। অনেক সময় এমন ব্যাধিগ্রস্ত মানুষের প্রতি অসহ্য হয়ে পরিবার-পরিজনরা নানা অপ্রীতিকর ও জঘন্য খারাপ আচরণ করে থাকে। যা একদম ঠিক নয়। বরং এই সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ এবং পরিবার-পরিজনদের সহমর্মিতা ও যত্নশীলতায় ধীরে ধীরে সেরে উঠতে পারে হতাশায় ভুগে স্থায়ীভাবে মানসিক ভারসাম্য হারাতে থাকা মানুষটি।

শরীরের চেয়ে মনের সুস্থতার ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। অথচ যারা মানসিক সমস্যায় ভোগে তাদের বেশির ভাগ কখনো চিকিৎসাই নিতে যায় না। সর্বশেষ ২০১৮ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে ১৮.৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১৩ শতাংশ শিশু-কিশোরদের মধ্যে মানসিক সমস্যা রয়েছে। কিন্তু তাদের মধ্যে ৯২ শতাংশ মানুষই কোনো ধরনের চিকিৎসা নেয় না।

"إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَوْا وَالَّذِينَ هُم مُّحْسِنُونَ"
— নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সাথেই আছেন, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে ও সৎকর্ম করে।
(সূরা নাহল ১৬:১২৮)

আরেক শ্রেণির মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত মানুষ আছে, যারা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বিষফোঁড়া। যাদের মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার মূল কারণ দুশ্চিন্তা নয়, বরং লোভ ও ভোগবাদিতা। ভোগবাদিতার কারণে তাদের মানবিক বোধ লোপ পায়। লোভ ও ভোগের নেশায় তারা যেকোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে ফেলে। ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে সমাজের অসহায় দুর্বলদের ওপর নির্যাতন করে, তাদের রক্ত চুষে নিজেদের ভোগবাদের সাম্রাজ্য কায়েম করে। তারা এসব করে মূলত মানসিক স্বাস্থ্যহীনতার কারণে। ধর্মীয় ভীতি ও সুশিক্ষার অভাবে তাদের মানস থাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন। সমাজে যেখানে সাম্য শান্তির চর্চা হয় সেখানে এমন ভোগবাদী মানসিকতা পোষণ করলে সেটা মানসিক অসুস্থতা হিসেবেই সংজ্ঞায়িত হবে।

রাসুল (সা.)-এর আগমনের আগে জাহেলি যুগের সামাজিক অবস্থা ছিল এমন ভোগবাদিতায় আচ্ছন্ন। যে যাকে পিষে, পীড়ন করে চলতে পারে, খেতে পারে, সর্বত্র ছিল এই নীতি। সবলরা দুর্বলদের সম্পদে চালাত জবরদখলি। মানসিক স্বাস্থ্যহীনতার কারণেই তারা এসব করত এবং এ কারণেই তারা বর্বর জাতি হিসেবে খ্যাত ছিল। আর তাদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য রাসুল (সা.)-এর আগমন ঘটেছিল। তিনি ভোগবাদিতা বিলোপ করতে ইসলামের সাম্য বাণী প্রচার করেন এবং ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে মানবিক বোধ সৃষ্টি করে মানসিকভাবে সুস্থ করে তোলেন।

আমরা দীর্ঘ সময় ধরে দেখে আসছি ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, হেফাজতে মৃত্যু, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ বিভিন্ন অরাজকতা। জাহেলি যুগকে জাহেলি যুগ বলে আখ্যায়িত করা হয় সে যুগে মূর্খতা, অরাজকতা, দমন, পীড়ন, নির্যাতন ও ভোগবাদের চর্চা হতো বলে। হাল সময়ের উৎকর্ষ আধুনিকতায় এসেও মানুষ মূর্খতা, অরাজকতা, দমন, পীড়ন, নির্যাতন ও ভোগবাদের যে জাল বিস্তার করেছে, তা জাহেলি যুগকেও হার মানায়। হাল সময়ে এমন লোভাতুর ভোগবাদী মানুষের মগজে অরাজকতার যে ব্যাধি বাসা বেঁধে আছে সেটা থেকে তাদের পুনর্বাসনের উপায় কী? রাষ্ট্রের ভঙ্গুর শাসনব্যবস্থা কি এই দায় এড়াতে পারবে? ধর্মভীতি, ধর্মচর্চা, দেশের শাসন বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে এমন মানসিক ব্যাধিগ্রস্তকে দ্রুত পুনর্বাসন করা সম্ভব।

আমাদের দেশে বিষন্নতায় ভুগে এবং লোভাতুর ভোগবাদে আসক্ত হয়ে যে পরিমাণ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের বিপর্যয় হচ্ছে, তাতে আশঙ্কা করা যায়, আমরা একটি ভঙ্গুর ও অরাজক জাতিতে পরিণত হচ্ছি। তাই আসুন, সময় থাকতে মনের যতœ নিই। সুস্থ থাকি।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার