মেধার মৃত্যুঘণ্টা: সরকারি মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তির 'বয়স-শিথিলতা' এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত

মেধার মৃত্যুঘণ্টা: সরকারি মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তির 'বয়স-শিথিলতা' এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত

জাকিরুল ইসলাম

সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির প্রক্রিয়া নিয়ে চলমান বিতর্ক প্রতি বছরই নতুন মাত্রা যোগ করে। এবছর ডিসেম্বরের ৫ তারিখ আবেদন শেষ এবং আগামী ১১ ডিসেম্বর লটারি হলেও, শিক্ষাবিদদের মনে এখন শান্তি নেই। উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শিক্ষা প্রশাসনের একটি চরম বিতর্কিত ও বাস্তবতাবিবর্জিত সিদ্ধান্ত: দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তির ক্ষেত্রে বয়সের ধারাবাহিকতা রক্ষার শর্ত তুলে দেওয়া বা লাগামহীন শিথিলতা আনা। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের গৌরবময় শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তিমূলে আঘাত হানছে।

আমরা দেখতে পাচ্ছি, একসময় মেধার তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত সরকারি স্কুলগুলোর মান এখন দুই কারণে হুমকির মুখে—প্রথমত, কেন্দ্রীয় ডিজিটাল লটারি, যা মেধাকে অস্বীকার করে ভাগ্যকে প্রাধান্য দিয়েছে; দ্বিতীয়ত, বয়স সংক্রান্ত নীতিমালার চরম শিথিলতা, যা শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ ও শৃঙ্খলাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।

অসঙ্গতির বেড়াজাল: এক শ্রেণিতে পাঁচ বছরের ব্যবধান

নীতিমালা অনুসারে, প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির একটি নূন্যতম বয়স (৫+ বা ৬+ বছর) বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গত ৩ ডিসেম্বর ২০২৫-এর সংশোধনীতে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তির ক্ষেত্রে সেই বয়সের ধারাবাহিকতা রক্ষার শর্তটি তুলে দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত শিক্ষাক্ষেত্রে কী ধরনের জটিলতা তৈরি করছে, তা কর্তৃপক্ষ 'এসি রুমে' বসে অনুধাবন করতে পারছেন না।

ধারণ ক্ষমতার বিপর্যয়: এর সুযোগ নিয়ে অসাধু অভিভাবকরা পঞ্চম শ্রেণির পড়ুয়া শিক্ষার্থীকে বয়স কম দেখিয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করাচ্ছেন। আবার প্রথম শ্রেণির ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন ছাত্রও তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করছে। ফলে একই ক্লাসে ঢুকছে ১০-১১ বছর বয়সী এবং ৬-৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকের পক্ষে একইসাথে ঐ দুই ভিন্ন মানসিক পরিপক্কতার স্তরের শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা কার্যত অসম্ভব। এই 'জগাখিচুড়ি মার্কা' শ্রেণি বিভাজন আমাদের গুণগত শিক্ষাকে তলানিতে নিয়ে যাচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ: যারা কম ধারণ ক্ষমতা নিয়ে উপরের ক্লাসে উঠে যাচ্ছে, তারা ক্লাসের পড়া বুঝতে না পেরে তীব্র মানসিক চাপ অনুভব করছে। চাপ সামলাতে না পেরে তারা একসময় পড়ালেখায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে বা ঝরে পড়ছে।

শ্রেণিকক্ষে মাস্তানি ও বিশৃঙ্খলা: বয়সের ব্যাপক পার্থক্য জন্ম দিচ্ছে চরম বিশৃঙ্খলা। অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সী শিক্ষার্থীরা সুযোগ পেয়ে ছোটদের ওপর 'মাস্তানি' করছে, ভয়-ভীতি দেখাচ্ছে বা শারীরিক নির্যাতন করছে। শিক্ষকের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ শুনতে এবং সেগুলোর বিচার করতে গিয়ে। ফলে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষাদান ব্যাহত হচ্ছে, যা শিক্ষকদের জন্য চরম বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

'বারোটা বাজে' শিক্ষাব্যবস্থা: অদক্ষ প্রশাসনের ফল

সরকারি স্কুলে খরচ কম, ফল ভালো এবং শিক্ষকরা অত্যন্ত দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত—এই সুবিধার কারণে অভিভাবকরা যে কোনো মূল্যে এখানে সন্তানকে ভর্তি করাতে চান। এমনকি দুই লক্ষ টাকা ঘুষ বা তদবিরের মাধ্যমেও ভর্তি করাতে প্রস্তুত থাকেন। বয়স শিথিলতা সেই অসুস্থ প্রতিযোগিতাকে আরও উসকে দিয়েছে। অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা না ভেবে, কেবল একবার চান্স পাওয়ার লোভে একই ক্লাস দুইবার পড়ানোর মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

অথচ, এই সমস্ত সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব যাদের, অর্থাৎ শিক্ষানীতি নির্ধারকদের, তাদের বাস্তবতার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে মাধ্যমিকের কোনো শিক্ষককে রাখা হয় না, যারা ক্লাসরুমের ভেতরের সমস্যাগুলো বোঝেন। তাই তারা শ্রেণিকক্ষের প্রকৃত সমস্যাগুলো উপলব্ধি না করে 'অবাস্তব' সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যা সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর।

আমাদের দাবি: অবিলম্বে এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার হোক

সরকারি মাধ্যমিকের এই সুদীর্ঘ ঐতিহ্য, পড়ালেখার মান এবং শৃঙ্খলা এই চরম বয়স-শিথিলতার কারণে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে। আমরা চাই, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে এই আত্মঘাতী নীতি প্রত্যাহার করুক।

১. বয়সের ধারাবাহিকতা পুনরুদ্ধার: প্রথম শ্রেণির বয়সকে ভিত্তি ধরে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তির জন্য বয়সের একটি যৌক্তিক ও অপরিবর্তনীয় ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে আনা হোক।

২. মেধা যাচাইয়ের পুনর্বহাল: লটারি প্রথা পুরোপুরি বাতিল করা না গেলে, অন্তত ৫০% আসন মেধা যাচাই পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তির ব্যবস্থা চালু করা হোক।

শিক্ষাকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। শিক্ষাঙ্গনকে মাস্তানি ও বিশৃঙ্খলার আখড়া বানানোর দায় শিক্ষা প্রশাসন এড়াতে পারে না। জাতিকে মেধাশূন্যতার হাত থেকে বাঁচাতে অবিলম্বে এই আত্মঘাতী ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে হবে। এটাই হোক সচেতন শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের সম্মিলিত দাবি।

লেখক : শিক্ষক, কুষ্টিয়া জিলা স্কুল।