১৩ ডিসেম্বর এই দিনে মার্কিন সপ্তম নৌবহর যাত্রার খবরে নৌশক্তি জোরদার সোভিয়েতের
সংগ্রহীত ছবি
ঢাকা ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলা মুক্ত হওয়ার খবর আসছে প্রতিমুহূর্তে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আত্মসমর্পণ করছে পাকিস্তানি সেনারা। ঢাকা ছাড়া বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলাশহর শত্রুমুক্ত হয়ে গেছে বলে জানায় স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র। এদিকে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীসহ মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকার দ্বারপ্রান্তে।
লক্ষ্য এখন ঢাকাকে মুক্ত করা।
এরই মধ্যে পাকিস্তানি বাহিনীকে সাহায্য করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহর রওনা হওয়ার খবর জানাজানি হওয়ার পর তৈরি হয় ব্যাপক চাঞ্চল্য। বঙ্গোপসাগরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসএস এন্টারপ্রাইজকে প্রতিহত করার জন্য সোভিয়েত রাশিয়াও মোতায়েন করে রণতরি।
১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনায় মুজিবনগর সরকারের কর্মকর্তা এবং লেখক ও গবেষক মঈদুল হাসান ‘মূলধারা
‘৭১’ বইয়ে লিখেছেন, লে. জেনারেল গুল হাসান টেলিফোনে নিয়াজিকে জানান, ১৩ ডিসেম্বরের মধ্যাহ্নে পাকিস্তানি বাহিনীকে সাহায্য করার জন্য উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে বন্ধুরা এসে পড়বে।
এখানে দক্ষিণের বন্ধু বলতে বোঝানো হয়েছে সপ্তম নৌবহরকে। মুজিবনগর সরকারের আরেক কর্মকর্তা রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী তাঁর ‘৭১ এর দশমাস গ্রন্থে’ তৎকালীন মার্কিন বিদেশ সচিব হেনরি কিসিঞ্জারের ‘হোয়াইট হাউজ ইয়ারস’ বইয়ের বরাত দিয়ে জানান, পরবর্তী সংবাদে নিয়াজিকে জানানো হয়, পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়তার জন্য মিত্রদের আগমন আটচল্লিশ ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সপ্তম নৌবহরের যাত্রার খবরের উত্তেজনার মধ্যেই চলছিল বুদ্ধিজীবী অপহরণ ও নিধনযজ্ঞ। মঈদুল হাসান লিখেন, ‘গুল হাসানের সংবাদের পর ঢাকার সামরিক কর্তৃপক্ষ নিজেদের প্রতিরক্ষার আয়োজন নিরঙ্কুশ করার জন্য চব্বিশ ঘণ্টার জন্য কারফিউ জারি করে ঘরে ঘরে তল্লাশি শুরু করে।
সম্ভবত এই সময়েই কোনো পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী তারা মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সহানুভূতিশীল পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীদের আটক করার সিদ্ধান্ত নেয়; পাকিস্তানিদের পরাজয়ের প্রাক্কালে যাদেরকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়।’
ঢাকাকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ১৩ ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ও ভারতের স্থলবাহিনীর অভিযানে অগ্রসর হওয়ার চিত্রও উঠে আসে মূলধারা ‘৭১ বইয়ে। মঈদুল হাসান লেখেন, উত্তর দিক থেকে জেনারেল নাগরার বাহিনী এবং কাদের সিদ্দিকী পরিচালিত মুক্তিযোদ্ধাগণ এদিন সন্ধ্যায় পাক বাহিনীর হালকা প্রতিরোধ ব্যর্থ করে কালিয়াকৈর পর্যন্ত এসে পৌঁছায়। বাংলাদেশ নিয়মিত বাহিনীর সর্বপ্রথম ইউনিট হিসেবে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ঢাকার শীতলক্ষ্যার পূর্বপারে মুরাপাড়ায় উপস্থিত হয় এই দিনে।
এদিকে এদিন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মুলতবি বৈঠকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব তৃতীয়বারের মতো সোভিয়েত ভোটের মুখে পড়ে।
অন্যদিকে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রশ্নে চীনের সম্মতির আশা যুক্তরাষ্ট্র তখনো পুরোপুরি ছাড়েনি। এই ভরসাতেই চব্বিশ ঘণ্টা নিশ্চল রাখার পর সপ্তম নৌবহরকে পুনরায় সচল করা হয় বঙ্গোপসাগরের দিকে।
লেখক ও গবেষক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী তাঁর ‘উনিশশো একাত্তরের ডিসেম্বর’ লেখায় জানান, ১৩ ডিসেম্বর লে. কর্নেল শফিউল্লাহর ‘এস’ ফোর্স ঢাকার উপকণ্ঠে ডেমরা পৌঁছে যায়। এদিন থেকেই রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্রের অনুষ্ঠান প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। কলকাতার স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র জানায়, ঢাকা ছাড়া বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলাশহর মুক্ত হয়ে গেছে এবং যৌথবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। কুমিল্লা হয়ে সিলেটের মুক্তাঞ্চল পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে একটি বড় হেলিকপ্টারে উড়ে জেনারেল ওসমানী এদিন বিকেলে কুমিল্লা শহরে পৌঁছান।
মুক্তিযুদ্ধে ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার রফিকুল ইসলাম বীর উত্তমের ‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে’ বইয়ে এদিন রণাঙ্গনের চিত্র ও কিছু যুদ্ধের বর্ণনা পাওয়া যায়। সীতাকুণ্ডের কুমিরায় কিভাবে পাকিস্তানের শক্তিশালী ঘাঁটিকে মোকাবেলা করেছেন তার বর্ণনায় রফিকুল ইসলাম লিখেন, ‘ভূমি বৈশিষ্ট্যের কারণে এই জায়গাটি শত্রুদের খুবই অনুকূলে ছিল। পশ্চিমে সাগর ও পূর্বে উঁচু পাহাড়ের মধ্যবর্তী সরু এলাকাজুড়ে পাকিস্তানিরা সুদৃঢ় অবস্থান নিয়ে বসেছিল। সড়কের একস্থানে গভীর খালের ওপর সেতুটি ওরা ধ্বংস করে দিয়েছিল। রাস্তার ওপর প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী উঁচু পাহাড়ে যক্ষ্মা হাসপাতালের কাছে ছিল তাদের মূল প্রতিরক্ষা ঘাঁটি। পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টা উভয়পক্ষে তুমুল সংঘর্ষ হয়।’
সংঘর্ষে মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকজন হতাহত হলেও ১৪ ডিসেম্বর ভোর রাত ৩টার মধ্যে কুমিরা পুরোপুরি শত্রুমুক্ত হয় বলে জানান রফিকুল ইসলাম। বেসামরিক জনসাধারণ শত্রুসেনাদের অবস্থান সম্পর্কে নিয়মিত খবর দেওয়ায় সে অনুযায়ী সঠিক লক্ষ্যস্থলের ওপর কামান দেগে পাকিস্তানি সেনাদের ঘায়েল করা হয়েছে বলে জানান এই সেক্টর কমান্ডার।
এদিন মুজিবনগরে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভার এক জরুরি বৈঠকে শত্রুমুক্ত জেলাগুলোতে অবিলম্বে প্রশাসন চালু করার ব্যাপারে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দুটি জেলায় অসামরিক প্রশাসন ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধানন্ত হয়। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। ত্রাণ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামান জানান, ভারতে থেকে দ্রুত শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে ভারতের পুনর্বাসন মন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়েছে। মন্ত্রিসভা বৈঠকে তিনি জানান, ভারতে এক কোটি শরণার্থী ছাড়াও বাংলাদেশে তিন কোটি রিক্ত দুর্ভিক্ষপীড়িত আবাল-বৃদ্ধ-নরনারী রয়েছেন। তাঁদের আহারের ব্যবস্থা করতে হবে।