অনিশ্চয়তায় জামায়াতের ১১ দলীয় জোট, ভেতরে বাড়ছে অবিশ্বাস

অনিশ্চয়তায় জামায়াতের ১১ দলীয় জোট, ভেতরে বাড়ছে অবিশ্বাস

ফাইল ছবি

চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ অন্তত দুটি দলের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর টানাপোড়েনের কারণে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় আসন সমঝোতার জোট। জোটের ভেতরেই এখন জামায়াতকে নিয়ে ‘অবিশ্বাস’ ও ‘সন্দেহের’ কথা প্রকাশ্যে আসছে। ইসলামী আন্দোলনের নেতারা আলাদা জোট গঠনের ইঙ্গিতও দিয়েছেন।

গত দুদিন ধরে দফায় দফায় বৈঠক হলেও দলগুলো এখনো কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি। এ কারণে আসন সমঝোতার চূড়ান্ত অবস্থান জানাতে পূর্বঘোষিত সংবাদ সম্মেলনও স্থগিত করা হয়েছে।

এমন প্রেক্ষাপটে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের জন্য আসন সমঝোতার প্রশ্নে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন এই জোট শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে নাকি ভেঙে যাবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, কেন এই জোটে এমন সংকট তৈরি হলো এবং সমস্যার মূল কোথায়।

যদিও জামায়াতের নেতারা বলছেন, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধান করে জোট টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যখন কোনো জোটে অবিশ্বাস ও সন্দেহ তৈরি হয়, তখন সংকট অনেক গভীরে পৌঁছে যায়।

ওয়ান বক্স পলিসি থেকে ১১ দলের জোট

‘ওয়ান বক্স পলিসি’, অর্থাৎ ইসলামী দলগুলোর এক বাক্সে ভোট- এই স্লোগান সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ আটটি ইসলামী দল প্রায় নয় মাস আগে আসন সমঝোতার একটি মোর্চা গঠন করে। নির্বাচনের আগে জুলাই সনদ ও সংস্কার বাস্তবায়নের দাবিতে ওই মোর্চা আন্দোলনেও নামে।

তবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর আন্দোলন থেকে সরে এসে তারা মূলত আসন সমঝোতা নিয়ে তৎপর হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে সরাসরি ধর্মভিত্তিক নয়, এমন তিনটি দল আসন ভাগাভাগিতে যুক্ত হলে মোর্চাটিকে ১১ দলের আসন সমঝোতার জোটে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন আর ‘ইসলামী দলগুলোর এক বাক্সে ভোট’ স্লোগানটি সামনে রাখা হয়নি।

এ নিয়ে জোটের ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে- এটি আদৌ কোনো রাজনৈতিক জোট, নাকি কেবল আসন ভাগাভাগির একটি প্ল্যাটফর্ম।

আসন সমঝোতা ঘিরে বিভেদ

বর্তমানে ১১ দলের এই আসন সমঝোতাকেই কেন্দ্র করে বিভেদ বেড়েছে এবং ঐক্য সংকটে পড়েছে। শুরুতে যে ইসলামী আন্দোলন ইসলামী দলগুলোর ভোট এক বাক্সে আনার স্লোগান দিয়েছিল, তারাই এখন প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানাচ্ছে।

ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের দাবি, ১১ দলের আসন ভাগাভাগিতে তারা শুরুতে ১০০টি আসন চেয়েছিল। ঐক্যের স্বার্থে পরে সেই দাবি কমিয়ে অন্তত ৫০টি আসনে নেমে আসে। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী ৪০টির বেশি আসনে ছাড় দিতে রাজি নয়।

এ ছাড়া বরিশাল-৫ আসন নিয়েও বিরোধ তীব্র হয়েছে। চরমোনাই ইউনিয়ন ইসলামী আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি এবং সেখানে দলটির দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম প্রার্থী। ওই আসনেও জামায়াত প্রার্থী রাখায় ইসলামী আন্দোলন ক্ষুব্ধ হয়েছে।

ইসলামী আন্দোলনের নেতারা বলছেন, আসন নিয়ে তাদের সঙ্গে ‘অপমান’ ও ‘অবহেলা’ করা হচ্ছে।

খেলাফত মজলিস অন্যান্য দলের অসন্তোষ

মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২০ থেকে ২৫টি আসন চেয়েছিল। জামায়াত তাদের ১৩টি আসনে ছাড় দিয়েছে, যা নিয়ে দলটি অসন্তুষ্ট।

এ ছাড়াও আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)সহ আরও কয়েকটি দল আসন ভাগাভাগি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। প্রত্যাশিত আসনে ছাড় না পেলে ইসলামী আন্দোলনসহ আরও দু-একটি দল জোট ছাড়তে পারে বলে নেতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন।

আসন ভাগাভাগিই বিভেদের পেছনে একমাত্র কারণ?

বিশ্লেষকদের মতে, যেহেতু এই মোর্চা এখন মূলত একটি নির্বাচনী আসন সমঝোতার জোটে পরিণত হয়েছে, তাই সংকটের প্রধান কারণ আসন বণ্টন। পাশাপাশি ধর্মভিত্তিক দলগুলোর নিজ নিজ রাজনৈতিক স্বার্থও এই বিভেদের পেছনে ভূমিকা রাখছে।

তবে ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে তাদের মধ্যে গভীর ‘অবিশ্বাস’ ও ‘সন্দেহ’ তৈরি হয়েছে।

এর পেছনে কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হচ্ছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের একক বৈঠক ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দল ভালোভাবে নেয়নি। যদিও জামায়াত বলছে, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানাতে গিয়ে ওই বৈঠক হয়েছিল, তবে সেখানে নির্বাচনের পর সরকার গঠন ও রাজনৈতিক বিষয়েও আলোচনা হয়েছে, এমন ধারণা থেকে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি এবং এবি পার্টির মতো ধর্মভিত্তিক নয়- এমন দলগুলোকে জোটে যুক্ত করা ও আসন সমঝোতার ক্ষেত্রে জামায়াত অন্য শরিকদের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা করেনি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের অভিযোগ, ঐক্যের কথা বললেও জামায়াত অনেক ক্ষেত্রে দলীয় স্বার্থে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন,'জামায়াত একেবারে বিএনপি-আওয়ামী লীগের মতো আচরণ করছে। তারা এমন ভাব করছে যেন আসন ছাড় দেওয়া তাদের দয়া।'

তিনি আরও বলেন,'যেসব আসনে সমঝোতার কথা বলা হচ্ছে, সেসব আসনেও জামায়াত তাদের প্রার্থী রেখে প্রচারণা চালাচ্ছে। এটা আমাদের জন্য অপমানজনক।'

সংকট কতটা গভীরে?

জোটের একাধিক দল মনে করছে, আসন সমঝোতা নিয়ে একদিকে অস্পষ্টতা রয়েছে, অন্যদিকে ঐক্যের কোনো সুস্পষ্ট রাজনৈতিক নীতিমালাও নির্ধারিত হয়নি।

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক স্মারক থাকা দরকার ছিল, যা এখনো হয়নি। তিনি জানান, এখনো পর্যন্ত সব দলকে নিয়ে একসঙ্গে কোনো বৈঠকও হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের সঙ্গে পীরকেন্দ্রিক ও কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক দলগুলোর অতীতে সম্পর্ক ভালো ছিল না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে সেই সম্পর্ক কিছুটা ঘনিষ্ঠ হয় এবং তারই ধারাবাহিকতায় এই জোটের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

ধর্মীয় বিশ্লেষক শরীফ মুহাম্মদ বলেন, আকিদা ও ধর্মীয় তাত্ত্বিক বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে বড় মতপার্থক্য রয়েছে। এরপরও ঐক্যের চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু এখন সেই ঐক্য গভীর সংকটে।

জোট টিকবে নাকি ভাঙবে?

জোট টিকিয়ে রাখতে জামায়াতে ইসলামী ও খেলাফত মজলিসের উভয় পক্ষই তৎপর রয়েছে। দুদিন ধরে শীর্ষ নেতাদের বৈঠক চলছে।

জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, আসন সমঝোতা নিয়ে কিছুটা সমস্যা হয়েছে। সেগুলো নিয়ে আলোচনা চলমান।

আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান হবে এবং তাদের ঐক্য বহাল থাকবে বলে তারা বিশ্বাস করেন।

নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ২০শে জানুয়ারি।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেছেন, তারা ১১ দলের নির্বাচনী সমঝোতার জোট টিকিয়ে রাখতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। দু'একদিনের মধ্যেই সমাধান হবে বলে তারা আশা করছেন।

দলটির মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদও একই মন্তব্য করেছেন।

তবে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে জোট ছাড়ার ইঙ্গিত ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। দলটির নেতারা জানান, তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষোভ চরমে।

দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান জানান, তাদের সারাদেশের নেতা-কর্মীরা জামায়াতের কাছে অপমান, অবহেলার শিকার হচ্ছেন। ফলে তাদের তৃণমূল ক্ষুব্ধ।

ইসলামী আন্দোলনের এই নেতা বলেন,'আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো অবস্থায় তো আমরা আছি। এখানে কেউ যদি আমাদের প্রতি কোনো অবিচার করে বা কেউ যদি অসম্মান করে, অবহেলা করে তাহলে সেটাকে আমরা স্বাভাবিকভাবে তো নিতে পারি না। আত্মসম্মানবোধ তো সবারই আছে। তাই না?'

বিশ্লেষক শরীফ মুহাম্মদ বলছেন, এই জোট টিকিয়ে রাখার জোর চেষ্টা আছে। তবে অবিশ্বাস, সন্দেহ তৈরি হয়েছে; একটা ফাটল ধরেছে। যদি জোট টিকে যায়, এরপরও ঐক্যে আন্তরিকতা ও আস্থা কতটা থাকবে সেই সন্দেহ রয়েছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা