মাধ্যমিক শিক্ষা: শেয়াল থেকে বাঘের মুখে?
জাকিরুল ইসলাম
দীর্ঘ অপেক্ষার পর সরকার অবশেষে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ভেঙে দুটি পৃথক অধিদপ্তর গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ের জন্য গঠিত হচ্ছে স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, আর কলেজ পর্যায়ের জন্য উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর। সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী। কারণ দীর্ঘদিন ধরে মাধ্যমিক শিক্ষা একটি বৃহৎ প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে চাপা পড়ে ছিল। তাই এই উদ্যোগকে শিক্ষকসমাজ সাধুবাদ জানায়।
কিন্তু এখানেই প্রশ্ন ওঠে—এই পরিবর্তন কি মাধ্যমিক শিক্ষাকে শেয়ালের হাত থেকে সত্যিই মুক্ত করবে, নাকি এটি বাঘের মুখে ঠেলে দেবে?
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারকে কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত করা হচ্ছে। বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখার কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত হচ্ছে নতুন মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। অর্থাৎ দেশের বৃহত্তম ক্যাডার প্রশাসনিকভাবে নতুন রূপ নিচ্ছে। এই পরিবর্তন কাগজে-কলমে ইতিবাচক হলেও এর বাস্তব প্রয়োগই নির্ধারণ করবে, এটি সংস্কার নাকি শুধু পুনর্বিন্যাস।
মাধ্যমিক শিক্ষা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি। অথচ এতদিন এই স্তরের শিক্ষা পরিচালিত হয়েছে এমন এক কাঠামোর মাধ্যমে, যেখানে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার চেয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতাই মুখ্য ছিল। শিক্ষকরা নীতি প্রণয়নের অংশ না হয়ে কেবল বাস্তবায়নকারী হিসেবে থেকে গেছেন। নতুন অধিদপ্তর যদি সেই একই মানসিকতায় পরিচালিত হয়, তবে কাঠামো বদলালেও বাস্তবতা বদলাবে না।
শিক্ষকদের সবচেয়ে বড় আশঙ্কা এখানেই। যদি নতুন মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নেতৃত্বে অভিজ্ঞ মাধ্যমিক শিক্ষকরা না থাকেন, যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণে শ্রেণিকক্ষের অভিজ্ঞতা মূল্য না পায়, তবে শিক্ষকরা আবারও বৈষম্যের শিকার হবেন। তখন পদোন্নতি, মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তার সংকট আগের মতোই থেকে যাবে। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থাও শক্তিশালী হবে না।
শিক্ষকরা বছরের পর বছর ধরে সরকারি কলেজের ক্যাডারভুক্ত শিক্ষকদের তুলনায় বঞ্চিত হয়ে আসছেন। একই ক্যাডারের অন্তর্ভুক্ত হয়েও মাধ্যমিক শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা এক স্তরে আসেনি। এতে শুধু শিক্ষক ক্ষতিগ্রস্ত হন না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার মান। কারণ পেশাগত নিরাপত্তা ও সম্মান ছাড়া মনোযোগী শিক্ষা দেওয়া কঠিন।
এই বঞ্চনা যদি নতুন অধিদপ্তরেও বহাল থাকে, তবে শিক্ষকসমাজ বিক্ষুব্ধ হবে, সেটাই স্বাভাবিক। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, তখন শিক্ষকরা রাজপথে নামবেন, আন্দোলন হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অচল হবে। তার দায় কোনোভাবেই শিক্ষকদের নয়, দায় নিতে হবে রাষ্ট্রকেই। আর ক্ষতিগ্রস্ত হবে মাধ্যমিক শিক্ষার্থী, যারা দেশের ভবিষ্যৎ।
নতুন মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর তখনই সফল হবে, যখন এটি হবে শিক্ষকদের আস্থার জায়গা। এখানে প্রয়োজন বাস্তব পদসোপান, ন্যায্য পদোন্নতি, আর্থিক স্বচ্ছলতা এবং সর্বোপরি সিদ্ধান্ত গ্রহণে শিক্ষকদের নেতৃত্ব। তা না হলে শেয়াল থেকে মুক্তি মিললেও বাঘের মুখে পড়বে মাধ্যমিক শিক্ষা।
এখন সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার। সরকার যদি সত্যিই মাধ্যমিক শিক্ষায় গুণগত পরিবর্তন চায়, তবে নতুন অধিদপ্তরকে ক্ষমতার দপ্তর নয়, শিক্ষা সংস্কারের দপ্তর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। নইলে ইতিহাস বলবে—কাঠামো বদলেছিল, কিন্তু শিক্ষা বাঁচেনি।
লেখক: শিক্ষক, কুষ্টিয়া জিলা স্কুল