ইনডাকশন ও ইনফ্রারেড চুলার মধ্যে পার্থক্য জানুন
ছবি: সংগৃহীত
তীব্র গ্যাস সংকটের এই সময়ে দেশের মানুষের রান্নাঘরের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে ইলেকট্রিক চুলা। বাজারে মূলত দুই ধরনের ইলেকট্রিক চুলা জনপ্রিয়—ইনডাকশন এবং ইনফ্রারেড। আপাতদৃষ্টিতে এদের দেখতে একই রকম মনে হলেও, এদের অভ্যন্তরীণ গঠন এবং তাপ তৈরির বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে এই দুই চুলার চুলচেরা বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।
কার্যপ্রণালীর বৈজ্ঞানিক ভিন্নতা
ইনডাকশন ও ইনফ্রারেড চুলার মূল পার্থক্য হলো তারা কীভাবে তাপ উৎপন্ন করে।
ইনডাকশন চুলা: এটি ‘ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ইনডাকশন’ বা তড়িৎ-চৌম্বকীয় আবেশ প্রক্রিয়ায় কাজ করে। চুলার ভেতরে থাকা কপার কয়েল একটি উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সি সম্পন্ন চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে, যা সরাসরি রান্নার পাত্রের অণুগুলোতে ঘর্ষণ সৃষ্টি করে তাপ উৎপন্ন করে। এখানে চুলা নিজে গরম হয় না, কেবল পাত্রটি গরম হয়।
ইনফ্রারেড চুলা: এটি মূলত ‘ইনফ্রারেড রেডিয়েশন’ বা অবলোহিত বিকিরণ পদ্ধতিতে কাজ করে। এর ভেতরে থাকা রেজিস্ট্যান্স কয়েল বা হ্যালোজেন ল্যাম্প প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে। এই তাপ ইনফ্রারেড রশ্মি হিসেবে গ্লাস-টপ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে উপরের পাত্রকে উত্তপ্ত করে।
পাত্র ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা
বিজ্ঞানের নির্দিষ্ট সূত্র মেনে চলায় ইনডাকশন চুলায় যেকোনো পাত্র কাজ করে না। যেহেতু এটি চৌম্বক ক্ষেত্রের ওপর নির্ভরশীল, তাই এতে কেবল লোহা বা ফেরোম্যাগনেটিক স্টিলের পাত্রই ব্যবহার করা যায়। অন্যদিকে, ইনফ্রারেড চুলা কেবল বিকিরণ বা রেডিয়েশন পদ্ধতিতে কাজ করে বলে এতে অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল, তামা, কাঁচ এমনকি মাটির পাতিলও ব্যবহার করা সম্ভব।
শক্তির অপচয় ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়
শক্তির রূপান্তরের ক্ষেত্রে ইনডাকশন চুলা অনেক বেশি দক্ষ। এতে সরাসরি পাত্র উত্তপ্ত হওয়ায় তাপের অপচয় হয় না বললেই চলে। গবেষণায় দেখা গেছে, ইনডাকশন চুলার দক্ষতা প্রায় ৯০ শতাংশ। বিপরীতে, ইনফ্রারেড চুলায় কয়েল থেকে গ্লাস এবং গ্লাস থেকে বাতাস—এই প্রক্রিয়ায় কিছুটা তাপ নষ্ট হয়। ফলে ইনফ্রারেড চুলার দক্ষতা প্রায় ৭০ শতাংশের কাছাকাছি। তাই বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের দিক থেকে ইনডাকশন চুলা অনেক এগিয়ে।
নিরাপত্তা ও পরিবেশগত প্রভাব
নিরাপত্তার দিক থেকে ইনডাকশন চুলা তুলনামূলক আধুনিক। যেহেতু চুলার উপরিভাগ সরাসরি গরম হয় না, তাই অসাবধানতাবশত হাত লাগলেও পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কম। রান্না শেষে দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যায়। ইনফ্রারেড চুলার উপরিভাগ রান্নার পরও অনেকক্ষণ উত্তপ্ত থাকে, যা অসাবধানতাবশত দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তবে ইনফ্রারেড চুলায় সাধারণ চুলার মতো সরাসরি রুটি সেঁকা বা ঝলসানোর কাজ করা যায়, যা ইন্ডাকশনে সম্ভব নয়।
গ্যাস সংকটে সঠিক সিদ্ধান্ত
বর্তমানে বাংলাদেশে গ্যাসের যে সংকট চলছে, তাতে দীর্ঘমেয়াদী সাশ্রয়ের জন্য ইন্ডাকশন চুলা বিজ্ঞানসম্মতভাবে শ্রেষ্ঠ। তবে যদি রান্নার জন্য সব ধরনের পাত্র ব্যবহারের স্বাধীনতা চান, তবে ইনফ্রারেড চুলা সুবিধাজনক। বিজ্ঞানীদের মতে, সঠিক পাত্রের সমন্বয় থাকলে ইনডাকাশন চুলা ব্যবহার করাই পরিবেশ ও পকেটের জন্য লাভজনক।