তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে বেসিস আইটি এক্সপোটার্স নাইট অনুষ্ঠিত

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে বেসিস আইটি এক্সপোটার্স নাইট অনুষ্ঠিত

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানি খাতের অগ্রযাত্রা, অর্জন ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা ও উদযাপনের মধ্য দিয়ে রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলো “বেসিস আইটি এক্সপোটার্স নাইট ২০২৬"।

মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) আয়োজিত এবং বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিল-এর সহযোগিতায় এ বিশেষ আয়োজনটি অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে দেশের আইটি ও আইটিইএস সেবা খাতের শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা, বিভিন্ন দেশের কুটনৈতিকবৃন্দ, শিল্প নেতৃবৃন্দ ও বেসিস সহায়ক কমিটির সদস্যবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। 

আয়োজনটির মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের আইটি রপ্তানি খাতের দীর্ঘ ২৮ বছরের পথচলা, অর্জন, বৈশ্বিক বিস্তার এবং ভবিষ্যতের কৌশলগত পরিকল্পনা তুলে ধরা।

বেসিসের এই আয়োজনে বাংলাদেশের আইটি রপ্তানি খাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা ২০২৪–২৫ অর্থবছরে শীর্ষ ১০টি আইটি ও আইটিইএস রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো-বিআইজেআইটি লিমিটেড, ব্রেইন স্টেশন ২৩ লিমিটেড, উল্কাসেমি প্রাইভেট লিমিটেড, সেলিস ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মস, সেফালো বাংলাদেশ লিমিটেড, স্যামসাং আর অ্যান্ড ডি ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ লিমিটেড, এনোসিস সলিউশনস, থেরাপ (বিডি) লিমিটেড, রেডিয়েন্ট ডাটা সিস্টেমস লিমিটেড এবং ডাটা পাথ লিমিটেড। এসব প্রতিষ্ঠান সফটওয়্যার উন্নয়ন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, গবেষণা ও উন্নয়ন, ফিনটেক, হেলথটেক এবং উচ্চমূল্যের আইটি সেবায় বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতা তুলে ধরছে।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বেসিস -এর সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে বিশ্বের ১০৪টিরও বেশি দেশে সফটওয়্যার ও আইটি সেবা রপ্তানি করছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রায় ৫০০টি বেসিস সদস্য প্রতিষ্ঠান রপ্তানিতে যুক্ত, যার মধ্যে প্রায় ৩০০টি নিয়মিতভাবে সক্রিয় রপ্তানিকারক। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, নরওয়ে, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, হংকং, সিঙ্গাপুর ও কানাডা বাংলাদেশের শীর্ষ ১০ আইটি রপ্তানি গন্তব্য।

অনুষ্ঠানে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণে তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানির সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন সেলিস বাংলাদেশ লিমিটেড-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর জুলিয়ান আন্দ্রিন ওয়েবার, ব্রেইন স্টেশন ২৩ পিএলসি-এর চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার রাইসুল কবির, সেফালো বাংলাদেশ লিমিটেড-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর ফেরদৌস মাহমুদ শাওন, জাইকা বাংলাদেশ-এর সিনিয়র প্রতিনিধি মোরিকাওয়া ইউকো। এছাড়া সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। আলোচকরা আইটি রপ্তানি সম্প্রসারণে নীতিনির্ধারক, আর্থিক খাত এবং বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দেন। প্যানেল আলোচনা সঞ্চালনা করেন বেসিস সহায়ক কমিটির সদস্য মুশফিকুর রহমান ও রাশেদ কামাল।

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে বেসিসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বেসিস সহায়ক কমিটির সদস্য মোস্তফা রফিকুল ইসলাম ডিউক বলেন, “বেসিসের যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি স্বপ্ন ও অঙ্গীকার নিয়ে, বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে বিশ্ববাজারে একটি শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার। আজ আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, সেই স্বপ্ন বাস্তব রূপ পেয়েছে এবং দেশের আইটি শিল্প বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ক্রমেই শক্ত অবস্থান তৈরি করছে।”

তিনি আরো বলেন, “বেসিস আইটি এক্সপোটার্স নাইট ২০২৬ কেবল একটি সম্মাননা অনুষ্ঠান নয়; এটি বেসিসের দীর্ঘ পথচলার একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক, যেখানে আমরা অতীত অর্জন স্মরণ করছি, বর্তমান বাস্তবতা অনুধাবন করছি এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণের জন্য একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করছি।”

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী, এনডিসি। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের আইটি ও আইটিইএস খাত এখন দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। দক্ষ মানবসম্পদ, উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং সরকারের সময়োপযোগী নীতিগত সহায়তার ফলে এই খাত আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমেই আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করছে। সরকার তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে অগ্রাধিকার দিয়ে নানামুখী নীতিগত সহায়তা প্রদান করছে। ক্যাশ ইনসেনটিভ, কর অবকাশ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ সহজীকরণের মাধ্যমে আইটি রপ্তানি খাতের সক্ষমতা আরও বাড়ানো হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “বেসিস আইটি এক্সপোটার্স নাইট ২০২৬-এর মতো উদ্যোগ দেশের শীর্ষ আইটি রপ্তানিকারকদের স্বীকৃতি প্রদানের পাশাপাশি উদীয়মান প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুপ্রাণিত করবে এবং সরকার–বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বাজার সম্প্রসারণ ও টেকসই প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে বলে আমি আশা রাখি।”

বেসিস আইটি এক্সপোটার্স নাইট ২০২৬-এর আহ্বায়ক ও বেসিস সহায়ক কমিটির সদস্য রওশন কামাল জেমস বলেন, “বাংলাদেশের আইটি ও আইটিইএস খাত এখন শুধু সম্ভাবনার নয়, বরং বাস্তব সাফল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। বেসিস আইটি এক্সপোর্টার্স নাইট ২০২৬ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের শীর্ষ আইটি রপ্তানিকারকদের যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান করা এবং তাদের সফলতার গল্প তুলে ধরে নতুন উদ্যোক্তা ও উদীয়মান প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুপ্রাণিত করা।”

তিনি আরও বলেন, “এই আয়োজন তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বাজার সম্প্রসারণ, নতুন আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গঠন এবং নীতিনির্ধারক ও শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর সংলাপ জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের আইটি রপ্তানি খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করবে।”

সভাপতি হিসেবে বক্তব্য রাখেন স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব ও বেসিস প্রশাসক আবুল খায়ের মোহাম্মদ হাফিজুল্লাহ্ খান। তিনি বলেন, “মাত্র ১৮টি সদস্য প্রতিষ্ঠান নিয়ে বেসিসের যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং বর্তমানে সদস্য সংখ্যা ২,৭০০ ছাড়িয়েছে। এই সংগঠনের সদস্যরাই বাংলাদেশের আইটি রপ্তানির মূল চালিকাশক্তি। বেসিস আইটি এক্সপোর্টার্স নাইট ২০২৬ কেবল একটি উদযাপনমূলক আয়োজন নয়; এটি বাংলাদেশের আইটি রপ্তানি খাতের অতীত অর্জন পর্যালোচনা, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ চিহ্নিতকরণ এবং ভবিষ্যৎ করণীয় ও কৌশল নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী প্ল্যাটফর্ম।”

তিনি আরও বলেন, “ক্যাশ ইনসেনটিভ, কর অবকাশ, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার—এই চারটি মৌলিক স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের আইটি রপ্তানি খাত আগামী দিনে আরও টেকসই ও দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে সরকার, বেসরকারি খাত ও শিল্প সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন  বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও পরিচালক (রপ্তানি উইং) বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিল-এর উপসচিব ড. মো. রাজ্জাকুল ইসলাম; অপারেশনস ম্যানেজার (বাংলাদেশ ও ভুটান), বিশ্বব্যাংক-এর গেইল মার্টিন এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।

অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশের আইটি রপ্তানি খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে অতীতের অর্জনকে সম্মান জানিয়ে ভবিষ্যতের জন্য একটি সম্মিলিত ও সুস্পষ্ট রোডম্যাপের আহ্বান জানানো হয়।