রাজনীতির দুষ্টচক্র থেকে মুক্ত করতে হবে অর্থনীতি

রাজনীতির দুষ্টচক্র থেকে মুক্ত করতে হবে অর্থনীতি

প্রতিকী ছবি

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা এখন তুঙ্গে। দিনরাত একাকার করে প্রার্থীরা প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন। জনগণকে দেওয়া হচ্ছে নানা প্রতিশ্রুতি। কিন্তু দেশের জনগণ একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে কী প্রত্যাশা করে? রাজনৈতিক দলগুলোকে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

একটি দেশের চালিকা শক্তি হলো অর্থনীতি। অর্থনীতি না বাঁচলে দেশ বাঁচে না। কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ না হলে মানুষ ভালো থাকতে পারে না। একজন মানুষ যা আয় করেন, তা দিয়ে সুখে শান্তিতে থাকতে পারলেই তিনি খুশি।

কিন্তু অতীতে কোনো সরকারই মানুষের এই সামান্য মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারেনি। জনগণ আশাহত হয়েছে। এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নতুন সরকারের কাছে তাই মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি।

আর এই প্রত্যাশা পূরণের জন্য সরকারকে সবার আগে মনোযোগ দিতে হবে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়। ক্ষমতার চারপাশে থাকা কিছু মানুষের রাতারাতি ভাগ্যের পরিবর্তন না।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানে সব মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন। সরকারের একার পক্ষে এটা সম্ভব নয়।

শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী বেসরকারি খাত, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং জনবান্ধব নীতি ও জবাবদিহিতা। করণীয় নির্ধারণের আগে নতুন সরকারকে প্রথমেই বিগত সময়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনকালে দেশের অর্থনীতি ছিল দুর্নীতি আর লুটপাটের। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছিল বাংলাদেশ। সর্বত্র ছিল তাদের দৌরাত্ম্য। এই চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল অধিকাংশ ব্যাংকের চাবি। তারা ইচ্ছামতো ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করেছে। বিদ্যুৎ থেকে তথ্য প্রযুক্তি সবক্ষেত্রে কিছু লুটেরা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ইচ্ছামতো লুটপাট করেছে। বেসরকারি খাতের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ব্যাবসায়ী, শিল্প উদ্যোক্তাদের বাধ্য করা হতো সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করতে। না করলে ব্যবসা করা ছিল অসম্ভব। গ্যাসের লাইন থেকে শুরু করে বিনিয়োগ ছাড়পত্র- সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করা হতো রাজনৈতিক বিবেচনায়। বিগত ১৫ বছরে বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে চলেছে লুটপাট আর অরাজকতা। শাসক দলের রাজনৈতিক দালালরা অবাধে দুর্নীতি আর কমিশন বাণিজ্য করেছে। বাইরে উন্নয়নের ফাঁপা চিত্র ভিতরে তৈরি হয়েছে বিশাল ক্ষত। কালো অর্থনীতির বিস্তার ঘটেছে ব্যাপকভাবে। মাদক, অস্ত্রসহ নানা ধরনের অবৈধ ব্যবসা জাকিয়ে বসেছিল দেশজুড়ে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়। প্রশাসন হয়ে উঠেছিল দুর্নীতিগ্রস্ত। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় প্রশাসনে জবাবদিহিতার অভাব ছিল প্রকট।

এসবের বিরুদ্ধে গণক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০২৪ এর ৫ আগস্ট। আওয়ামী লীগের পতনের পর দেশের মানুষ আশা করেছিল পরিবর্তনের। সবাই মিলে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার আকাক্সক্ষা ছিল জনমনে। কিন্তু গত ১৭ মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতি ভুল পথেই হাঁটছে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্র্বর্তী সরকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি। এই সময়ে অবশ্যই কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। 

আর্থিক খাতে, বিশেষ করে ব্যাংকিং সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে যা প্রশংসার দাবি রাখে। দেউলিয়া কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করার মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু উচ্চ সুদের হারের কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা ও অনাগ্রহ। ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অর্থনীতির বড় ক্ষতি করেছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান মব সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে। বহু কলকারখানায় অগ্নি সংযোগ ও লুটপাট হয়েছে। সাবেক সরকারের দোসর বানিয়ে ব্যাবসায়ীদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে। 

মিথ্যা হত্যা মামলা দিয়ে চাঁদাবাজির ঘটনা বেসরকারি খাতে সৃষ্টি করেছে আতঙ্ক। চাঁদাবাজির কারণে বহু ব্যবসায়ী ব্যবসাবাণিজ্য বন্ধ করে দিয়েছেন। ঢালাও ভাবে বিভিন্ন শিল্প উদ্যোক্তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। দুর্নীতির তদন্তের নামে হয়রানি করা হয়েছে অনেককে। এর ফলে, বহু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। বেকার হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। সরকার বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের আস্থায় নিয়ে অর্থনীতিকে চাঙা করতে পারেনি। ফলে, সংকট আর আতঙ্কে গতিহীন হয়ে পড়েছে বেসরকারি খাত। রপ্তানি কমেছে, হয়নি নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। দেশি বিনিয়োগকারীদের এই হতাশা প্রভাব ফেলেছে বিদেশি বিনিয়োগে। 

সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ। একমাত্র ভরসা হচ্ছে রেমিট্যান্স। কিন্তু জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রেও তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা। অনেক দেশেই বাংলাদেশিদের জন্য দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে সরকার কিছুই করেনি। অতীতে যারা জনশক্তি রপ্তানিতে প্রতারণা এবং জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও নতুন করে রাজনৈতিক বিবেচনায় জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে দু শরও বেশি প্রতিষ্ঠানকে। জনশক্তি রপ্তানি এক সিন্ডিকেট থেকে আরেক সিন্ডিকেটের কাছে বন্দি হয়েছে।

অর্থ পাচার প্রতিরোধে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে কোনো সাফল্য আসেনি। এসবের প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। মুদ্রাস্ফীতির কারণে বেড়েছে জিনিসপত্রের দাম। বাজারে গিয়ে মানুষ হাঁসফাঁস করছে। এরকম একটি হতাশাজনক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে। দায়িত্ব গ্রহণের পরই নতুন সরকারকে দেশের অর্থনৈতিক সংকট সামাল দিতে হবে। দূর করতে হবে অনিশ্চয়তা। যারাই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ১০টি আশু পদক্ষেপ নিতে হবে। এগুলো হলো-

১) বেসরকারি খাতকে আস্থায় আনতে হবে। তাদের রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা অতীত সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক না খুঁজে দেখতে হবে দেশের অর্থনীতিতে তার অবদান এবং প্রয়োজনীয়তা। ব্যবসাবাণিজ্যকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতেই হবে। আর সেটা করতে হবে প্রথম দিন থেকেই। ব্যাবসায়ীদের মধ্যে আমার লোক, তাদের লোক খোঁজার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে নতুন সরকারকে। বিনিয়োগকারী এবং ব্যবসায়ীদের ভাবতে হবে দেশের লোক। দেশের উন্নয়নের জন্য তাদের সহযোগিতা করতে হবে।

২) আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে। যেকোনো দেশের উন্নয়নের প্রধান শর্ত হলো নিরাপত্তা ও সুরক্ষা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল না থাকলে দেশিবিদেশি কোনো বিনিয়োগকারী আগ্রহী হবেন না। যারা ব্যাবসা করেন তারাও এরকম মব সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি অব্যাহত থাকলে বিনিয়োগ গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবেন। তাই নতুন সরকারকে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হবে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

৩) দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলে, যখন যেদল ক্ষমতায় আসে, তখন তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি হয় দুর্নীতিবাজদের দুষ্টচক্র। সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে এই চক্র দুর্নীতি করে দেশের ক্ষতি করে। নতুন সরকারকে দুর্নীতি বন্ধ করতেই হবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য নয়, সত্যিকারের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। দুর্নীতি বন্ধ করতে না পারলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন অসম্ভব।

৪) পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে হবে। গত পনেরো বছরে, কিংবা তারও আগে বাংলাদেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে তা উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য অর্থ পাচার ইস্যুকে ব্যবহার না করে, প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

৫) আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত রাখতে হবে। অতীতে দেখা গেছে, যখন যারা ক্ষমতায় গেছে তারা, রাষ্ট্রীয় এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। সরকারি ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, দলীয় লোকদের। প্রয়োজন না থাকলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় ইচ্ছামতো ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। কিছু দলীয় সুবিধাবাদীকে ঋণ দিয়ে সংকটে ফেলা হয়েছে ব্যাংকগুলোকে। রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া ঋণের শতভাগই খেলাপি হয়ে থাকে। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে নতুন সরকারকে।

৬) বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও নীতিমালা তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশে ব্যবসা করার ঝামেলা প্রতি ধাপে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে ব্যবসা শুরু করার আগেই হতাশ হয়ে পড়েন উদ্যোক্তারা। নানারকম অনুমতির দীর্ঘ তালিকা থাকে। যেসব শর্ত পূরণ করতে ধাপে ধাপে দিতে হয় অর্থ। উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পেতে হয়রানি- এদেশে বিনিয়োগের পথে বাধা। এসব বাধা দূর করতে হবে। ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করতে হবে যাতে বিনিয়োগকারী সহজেই ব্যবসা শুরু করতে পারেন।

৭) ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের দিতে হবে সহায়ক পরিবেশ। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। কিন্তু তারা কোনো ধরনের সহায়তা পান না। তাদের জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

৮) ব্যবসাবান্ধব প্রশাসন তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের বিকাশে বড় বাধা হলো আমলাতন্ত্র। তারা লালফিতায় বন্দি করে রাখেন বেসরকারি উদ্যোগ। অযথা জটিলতা সৃষ্টি করা হয়। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অবসান ঘটাতে হবে।

৯) নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। কিছু প্রশিক্ষণ ও সহায়তা করলে নারীরা দেশের অর্থনীতিতে আরও বেশি অবদান রাখতে পারবেন।

১০) রপ্তানির নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের রপ্তানি খাত মূলত পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। একক পণ্যের ওপর রপ্তানি নির্ভরতা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের প্রচুর খাত রয়েছে যা রপ্তানি যোগ্য। একটু সহায়তা পেলে এসব পণ্য রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। কৃষিজাত পণ্য, ওষুধ শিল্প, চামড়া শিল্প ইত্যাদি অনেক রপ্তানি সম্ভাবনাময় খাতকে বিকশিত করতে হবে। বহু মাত্রিক পণ্য রপ্তানি করে একক পণ্য নির্ভরতা কমাতে হবে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই ১০টি উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারলে বদলে যাবে অর্থনীতি। বাড়বে কর্মসংস্থান, কমবে দারিদ্র্য, মুদ্রাস্ফীতি। বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে বহুদূর।