৯৩ হাজারেরও বেশি, মহারাষ্ট্রে এত বেশি নারী নিখোঁজ হয় কেন

৯৩ হাজারেরও বেশি, মহারাষ্ট্রে এত বেশি নারী নিখোঁজ হয় কেন

সংগৃহীত ছবি

সংখ্যাটা ছোট নয়। গত দুই বছরে ভারতের মহারাষ্ট্রে ৯৩ হাজারেরও বেশি নারী নিখোঁজ হয়েছেন। সরকারি হিসাব বলছে, এদের মধ্যে ৬৭ হাজারের বেশি নারীকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, কেন এত বেশি নারী হারিয়ে যাচ্ছেন এই রাজ্যে।

ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো এনসিআরবি জানিয়েছে, নারী নিখোঁজের তালিকায় মহারাষ্ট্র শীর্ষে। শিশু নিখোঁজের তালিকায় রয়েছে মধ্যপ্রদেশ। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর এই দুই রাজ্যে নিখোঁজের ঘটনা ছিল সর্বাধিক। ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে মোট নিখোঁজ ব্যক্তির ৬৮ শতাংশই ছিলেন নারী।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালে মহারাষ্ট্রে ৪৫ হাজারের বেশি নারী নিখোঁজ হন। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮ হাজারের বেশি। পুলিশি অভিযানে ২০২৪ সালে ৩৬ হাজার ৫৮১ জন এবং ২০২৫ সালে ৩০ হাজার ৮৭৭ জন নারীকে উদ্ধার করা হয়েছে।

অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালে নিখোঁজ অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ৩১৩। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয় ১২ হাজার ১১৩।

২০১৯ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এনসিআরবিকে নির্দেশ দেয় নিখোঁজ ব্যক্তি, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের তথ্য বিশ্লেষণ করতে। লক্ষ্য ছিল পাচারের কারণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করা।

এনসিআরবির বিশ্লেষণে উঠে আসে কয়েকটি কারণ। মানসিক অসুস্থতা, ভুল বোঝাবুঝি, পারিবারিক সহিংসতা, অপরাধের শিকার হওয়া। ফ্লেম ইউনিভার্সিটির বিশ্লেষণ বলছে, অনেক নারী পারিবারিক সহিংসতা, বৈবাহিক বিরোধ বা চরম নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে ঘর ছাড়েন। এই সুযোগে পাচারকারীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। ঝুঁকিতে থাকা নারীরা জোরপূর্বক শ্রম বা যৌন শোষণের শিকার হন।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন মিসিং উইমেন ধারণা সামনে আনেন। লিঙ্গবৈষম্যের কারণে নারীর অকাল মৃত্যু ও অনুপস্থিতিকে তিনি এভাবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০ কোটি নারী সামাজিক বৈষম্যের কারণে হারিয়ে গেছেন। ২০২০ সালে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল জানায়, গত ৫০ বছরে বিশ্বে নিখোঁজ নারীর সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।

ন্যাশনাল ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান উইমেনের পুনে স্টেট সেক্রেটারি লতা ভিসে সোনাওয়ানে, পুলিশ ও সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর ভাষায়, সংখ্যা দেওয়া হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মামলাগুলোতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, কতজন অপরাধী ধরা পড়েছে, সেই তথ্য কোথায়।

ভারতের পুলিশ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ব্যুরোর সাবেক মহাপরিচালক ও পুনের সাবেক পুলিশ কমিশনার ড. মীরান চাড্ডা বোরওয়ানকার, সম্ভাব্য অপরাধী চক্রের সক্রিয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, এর পেছনে ক্রাইম সিন্ডিকেট থাকতে পারে। তবে শুধু পুলিশের ওপর দায় চাপিয়ে লাভ নেই। সমাজ, পঞ্চায়েত, অভিভাবক, শিক্ষক সবাইকে দ্রুত নিখোঁজের খবর জানাতে হবে। তিনি ক্রাইম অ্যান্ড ক্রিমিনাল ট্র্যাকিং নেটওয়ার্ক অ্যান্ড সিস্টেমস ব্যবহারের ওপর জোর দেন এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিট পুলিশিং জোরদারের কথা বলেন।

দিল্লির সেন্টার ফর সোশ্যাল রিসার্চের পরিচালক রঞ্জনা কুমারী বলেন, বড় সংখ্যা সামনে আসা মানে পুলিশ এখন মামলাগুলো নথিভুক্ত করছে। তবে সব মামলাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, লাখ লাখ নারী নিখোঁজের তথ্য সামনে এলে স্বাভাবিকভাবেই অপহরণ বা খুনের আশঙ্কা জাগে। কিন্তু প্রকৃত চিত্র বুঝতে হলে বিস্তারিত বিশ্লেষণ দরকার। শুধু উদ্ধার নয়, নিখোঁজ হওয়ার মূল কারণ চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে তালিকা প্রতি বছরই বড় হতে থাকবে।