দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়ায় ৬ মাসে ৪৩ মামলা, ১ লাখ ২০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার
সংগ্রহীত ছবি
দক্ষিণ চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ জনপদ পটিয়ায় গত ছয় মাসে মাদকবিরোধী অভিযানে উল্লেখযোগ্য তৎপরতার চিত্র উঠে এসেছে। গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম খ সার্কেল পটিয়া ৪৩টি মামলা দায়ের করেছে। এ সময় ১ লাখ ২০ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার এবং ৪৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অভিযান-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পটিয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান পরিচালিত হয়।
বিশেষ করে কক্সবাজার সীমান্তঘেঁষা রুট ব্যবহার করে ইয়াবা পাচার ঠেকাতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। অধিকাংশ মামলাই ইয়াবা ও গাঁজাসংক্রান্ত হলেও কয়েকটিতে আন্তঃজেলা চক্রের সম্পৃক্ততার তথ্য মিলেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককেন্দ্রিক সক্রিয় কয়েকটি সরবরাহকারী চক্র দীর্ঘদিন ধরে পটিয়াকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল। মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে উৎপাদিত ইয়াবা নাফ নদী ও সমুদ্রপথে কক্সবাজারে প্রবেশ করে সড়কপথে পটিয়া হয়ে চট্টগ্রাম শহরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে।
মাইক্রোবাস, সিএনজি, প্রাইভেটকার, ট্রাক ও লোকাল যানবাহনে বিশেষ কৌশলে মাদক পরিবহন করা হয়। কখনো গাড়ির সিটের নিচে, টায়ারের ভেতরে কিংবা পণ্যবাহী বস্তার আড়ালে ইয়াবা লুকিয়ে আনার তথ্য মিলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের মোবাইল সিম ব্যবহার করে যোগাযোগের প্রমাণও পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পটিয়ার খরনা ও কাদের এলপিজি ফিলিং স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় তল্লাশি চৌকি বসানো হলেও, কিছু ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ সহায়তা বা দুর্নীতির সুযোগে পাচারকারীরা পার পেয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে র্যাব-৭-এর অভিযানে পটিয়ায় ৬০ হাজার পিস ইয়াবাসহ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক এএসআই গ্রেপ্তার হন। তার কাছ থেকে গাড়ি, ওয়াকিটকি, ইউনিফর্ম ও নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি মাদকবিরোধী কার্যক্রমে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আনে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাদক চক্রের বড় শক্তি উচ্চ মুনাফা ও সীমান্তের দুর্বলতা। এর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ সহায়তা যুক্ত হলে চক্র ভাঙা কঠিন হয়ে পড়ে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক রামেশ্বর দাস বলেন, ‘গত ছয় মাসে আমরা ধারাবাহিক ও গোয়েন্দাভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করেছি। ৪৩টি মামলায় ৪৬ জনকে আটক এবং ১ লাখ ২০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। তবে আমরা শুধু পরিসংখ্যান বাড়াতে চাই না চক্রের মূল হোতাদের শনাক্তে কাজ করছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘মাদক নিয়ন্ত্রণ শুধু আইন প্রয়োগের বিষয় নয়; সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পটিয়াকে মাদকমুক্ত রাখতে অভিযান অব্যাহত থাকবে।’
পটিয়ার সচেতন মহল বলছে, উদ্ধার ও মামলার সংখ্যা যেমন তৎপরতার ইঙ্গিত দেয়, তেমনি এটি এলাকায় মাদক প্রবণতার বাস্তব চিত্রও তুলে ধরে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ইয়াবা বিস্তার উদ্বেগজনক।
একজন স্থানীয় শিক্ষাবিদ বলেন, শুধু গ্রেপ্তার নয়, স্কুল-কলেজভিত্তিক সচেতনতা কর্মসূচি বাড়াতে হবে। না হলে চাহিদা কমবে না, আর চাহিদা থাকলে সরবরাহ বন্ধ করা কঠিন।
বিশ্লেষকদের মতে, পটিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর এবং সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় এলাকাটিকে পাচারকারীদের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। স্থানীয়-জাতীয়-আন্তর্জাতিক স্তরে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, উচ্চ মুনাফা এবং সীমান্তের ছিদ্রযুক্ততা পুরো চক্রকে টিকিয়ে রাখছে।
তাদের মতে, অভিযানের ধারাবাহিকতা, বিচার প্রক্রিয়ার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিশ্চিত করা গেলে মাদক কারবারিদের জন্য কঠোর বার্তা যাবে।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি লড়াইয়ের শেষ নয় বরং দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের একটি ধাপ মাত্র। পটিয়ায় মাদকবিরোধী এই অভিযান সাময়িক সাফল্যের ইঙ্গিত দিলেও, চক্রের শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে আইনি কঠোরতা, গোয়েন্দা নজরদারি এবং সামাজিক প্রতিরোধ এ তিনটির সমন্বিত প্রয়াসই এখন সময়ের দাবি।