শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি আবারও ‘রাজনৈতিক পুনর্বাসন কেন্দ্র’ হতে যাচ্ছে?
জাকিরুল ইসলাম
বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে আমরা বড় বড় কথা বলতে ভালোবাসি। স্কুলের দেয়ালে লেখা থাকে— “শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড”। বক্তৃতার মঞ্চে বলা হয়— শিক্ষকরা নাকি জাতি গড়ার কারিগর। কিন্তু বাস্তবতা মাঝে মাঝে এমন প্রশ্ন তোলে, মনে হয় যেন এই কথাগুলো কেবল সাইনবোর্ডে টাঙিয়ে রাখার জন্যই বলা হয়।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষা খাতকে জাতীয় উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়। সেখানে শিক্ষকদের মর্যাদা, বেতন এবং সামাজিক অবস্থান অত্যন্ত উচ্চ। শিক্ষক হওয়া মানেই সেখানে সেরা মেধাবীদের একটি পেশা। কারণ তারা জানে, একটি শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া কোনো জাতি এগিয়ে যেতে পারে না।
কিন্তু আমাদের বাস্তবতা যেন ঠিক উল্টো পথে হাঁটে। এখানে শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা ও মর্যাদা সবচেয়ে কম। তার চেয়েও বড় কথা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার কাঠামোর মধ্যেই এমন কিছু ব্যবস্থা রাখা হয়েছে যা প্রায়ই শিক্ষার পরিবেশকে দুর্বল করে দেয়।
বাংলাদেশে মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের প্রায় ৯৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে। আর বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, এই কমিটির সভাপতির হাতে অনেক ক্ষেত্রে এমন ক্ষমতা থাকে যা প্রায় “অসীম ক্ষমতা” বললেও খুব বাড়িয়ে বলা হয় না।
বহু প্রতিষ্ঠানের জমি, দোকান, সম্পদ ও নানা ধরনের আয়ের উৎস থাকে। অভিযোগ আছে, এসব সম্পদকে অনেক সময় শিক্ষা উন্নয়নের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহারের প্রতিযোগিতা বেশি দেখা যায়। কোথাও কোথাও আবার নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে এমন সব গল্প শোনা যায়, যা শুনলে মনে হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, যেন অন্য কোনো ব্যবসায়িক ক্ষেত্রের গল্প।
এক সময় শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ পুরোপুরি কমিটির হাতে ছিল। তখন যোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেত অন্য বিষয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই মেধাবীরা নয়, অন্যরাই সুযোগ পেত। এই পরিস্থিতি কিছুটা বদলাতে এনটিআরসিএ-এর মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ ব্যবস্থা চালু করা হয়। এতে অন্তত শিক্ষক নিয়োগে একটি স্বচ্ছতার পরিবেশ তৈরি হয়।
সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ নিয়োগেও প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষাবিদদের অনেকেই এটিকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছেন।
এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল সহজ— একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে অন্তত এমন একজন মানুষ থাকবেন যিনি শিক্ষার মূল্য বোঝেন।
কিন্তু এখন সেই শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করার আলোচনা নতুন করে শুরু হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি আবার সেই পুরোনো পথেই ফিরে যেতে চাই?
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতির পদটি কি এমন একটি পদ, যেখানে শিক্ষার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না থাকলেও চলে? একটি স্কুল বা কলেজ পরিচালনার নেতৃত্বে যদি এমন কেউ থাকেন, যিনি শিক্ষার পরিবেশ, একাডেমিক পরিকল্পনা কিংবা শিক্ষকদের মর্যাদার বিষয়টি উপলব্ধি করার মতো প্রস্তুতিই নেননি, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান কোন দিকে এগোবে?
বাংলাদেশের বহু শিক্ষক তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বলেন। কোথাও কোথাও অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত সভাপতির সামনে অধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষককে অপমানিত হতে হয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শিক্ষকদের নানা অযৌক্তিক চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। এমন ঘটনাও ঘটেছে যেখানে শিক্ষকদের নীতির প্রশ্নে আপত্তি জানানোই তাদের জন্য চাকরি টিকিয়ে রাখা কঠিন করে দিয়েছে। এসব বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
রাজনীতির মাঠে কর্মীদের পুনর্বাসনের জন্য অনেক জায়গা থাকতে পারে। কিন্তু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সেই তালিকায় থাকা উচিত কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
একটি স্কুল বা কলেজ মূলত একটি জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। সেখানে নেতৃত্বের মান যদি দুর্বল হয়, তার প্রভাব পড়ে শিক্ষকদের উপর, শিক্ষার্থীদের উপর এবং শেষ পর্যন্ত পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার উপর।
তাই শিক্ষাগত যোগ্যতার মান শিথিল করার প্রস্তাব অনেকের কাছে এমন একটি সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা আবারও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবের পুরোনো চক্রে ফিরিয়ে দিতে পারে।
তবে এ কথাও সত্য, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সম্পর্কে শিক্ষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ইতিবাচক ধারণা রয়েছে। অনেকে বিশ্বাস করেন, তিনি শিক্ষা খাতের বাস্তব সমস্যাগুলো বোঝেন এবং তা সমাধানে আন্তরিক।
এই কারণেই অনেক শিক্ষক আশা করছেন, বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি আরও গভীরভাবে বিষয়টি বিবেচনা করবেন। কারণ একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতির জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি একটি মৌলিক প্রয়োজন।
শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি যদি সত্যিই আমাদের লক্ষ্য হয়, তাহলে নেতৃত্বের মান কমানোর নয়, বরং আরও উন্নত করার পথই বেছে নিতে হবে।
অন্যথায় আমরা হয়তো আবার সেই পুরোনো বাস্তবতার দিকে ফিরে যাব, যেখানে স্কুল-কলেজ জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রের চেয়ে অন্য কিছুর পরিচয়ে বেশি পরিচিত হয়ে উঠেছিল।
বাংলাদেশের মানুষ এখন পরিবর্তন দেখতে চায়। তারা বিশ্বাস করতে চায় যে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নেবে। শিক্ষা খাত সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি।
আশা করা যায়, সরকার এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না যা শিক্ষকদের আবারও বিব্রত করবে বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসবে।
কারণ একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শ্রেণিকক্ষের উপর। আর সেই শ্রেণিকক্ষকে শক্তিশালী করার পথ কখনোই নেতৃত্বের মান কমিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে যায় না।
লেখক: শিক্ষক, কুষ্টিয়া জিলা স্কুল।