মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ : জ্বালানিসংকট সামলাতে প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা
সংগৃহীত ছবি
মার্কিন-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধে পুড়ছে মধ্যপ্রাচ্য। সরাসরি এই তিন দেশ যুদ্ধ করলেও আক্রান্ত হয়েছে কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, লেবাননও। এসব দেশের তেল শোধনাগারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও অবকাঠামোতে একের পর এক হামলা হচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জ্বালানি তেল-গ্যাসের উৎস।
বন্ধ রয়েছে দেশগুলোর স্বাভাবিক কাজকর্ম। ব্যাহত হচ্ছে দেশে দেশে বিমান চলাচল। প্রবাসীরা কাজহীন অসহায় অবস্থায়।
এই সংঘাত এখন কেবল আঞ্চলিক সীমায় আবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি বৈশ্বিক জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ কার্যত স্থবির হয়ে পড়ায় এবং তেল শোধনাগারগুলোতে উপর্যুপরি হামলার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এরই মধ্যে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলার অতিক্রম করেছে এবং পরিস্থিতি শান্ত না হলে এটি ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো এক ভয়াবহ সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে, যার প্রভাব প্রতিটি খাতে গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে।
কী নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে : চলমান এই সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা বাংলাদেশে পড়তে শুরু করেছে।
এখানে জ্বালানি তেলের দুষ্প্রাপ্যতা গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে। দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের রেশনিং শুরু হয়েছে। তেলের এই অভাব সরাসরি পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চলাচল সীমিত হয়ে পড়ছে। পণ্য পরিবহনের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে।
এর ফলে রাজধানীসহ সারা দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। সাধারণ মানুষের যাতায়াত খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনি পরিবহনের উচ্চ ব্যয়ের কারণে বাজারে প্রতিটি পণ্যের দামও সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
জ্বালানিসংকটের প্রভাব অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে দেশের কৃষি এবং শিল্প খাতেও। বর্তমানে বোরো মৌসুম চলায় সেচকাজের জন্য ডিজেলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তেলের সংকট ও উচ্চমূল্যের কারণে কৃষকরা সময়মতো সেচ দিতে পারবেন কি না এমন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যদি তা ব্যাহত হয়, তবে ধানসহ অন্যান্য ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এর পাশাপাশি প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের কারণে সার কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। দেশে সারের পর্যাপ্ত উৎপাদন ও সরবরাহ না থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো জ্বালানির অভাবে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে শিল্প-কারখানাগুলোতে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বাড়ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের মতো রপ্তানিমুখী শিল্পে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমবে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব। জ্বালানি তেল ঘিরে পুরো সরবরাহব্যবস্থায় খরচ বাড়লে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দামও বাড়ে পাল্লা দিয়ে। এই প্রভাব শুরু হয়ে গেছে। এমনিতেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। নতুন করে এর মাত্রা বাড়লে সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার মান আরো নিচে নেমে যাবে। উচ্চমূল্যের বাজারে টিকে থাকতে গিয়ে মানুষ তাদের সঞ্চয় হারানোসহ মৌলিক চাহিদাগুলো কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছে। জ্বালানির এই সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং তেলের দাম ১৫০ ডলারে পৌঁছে, তবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা নেমে আসতে পারে, যা পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন হবে। সামগ্রিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ বাংলাদেশকে এক বহুমুখী সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে খাদ্য, বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই এখন চরম ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার এরই মধ্যে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও চীন থেকে জরুরি ভিত্তিতে তেল আমদানি শুরু করেছে। তেলের সংকট সামাল দিতে দেশজুড়ে এরই মধ্যে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে এবং ফিলিং স্টেশনগুলোতে বিক্রির পরিমাণ সীমিত করা হয়েছে। এটি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার একটি সাময়িক ব্যবস্থা।
গ্যাসসংকটও বাড়ছে : গ্যাসের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো বেশি সংকটাপন্ন। বাংলাদেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঘাটতি পড়ছে। দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন প্রতিবছর প্রায় ৫ শতাংশ হারে কমছে, যার ফলে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বর্তমানে মোট সরবরাহের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। তবে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে কাতারসহ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিবদ্ধ সরবরাহকারীরা ‘ফোর্স মজিউর’ বা অনিবার্য পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় এলএনজি সরবরাহ চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে। খোলাবাজার বা স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে গিয়ে বাংলাদেশকে আগের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি দাম দিতে হচ্ছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।
গ্যাসের ঘাটতির কারণে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি সরকারি সার কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যাতে সেই গ্যাস বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা যায়। বিদ্যুৎ খাতের চাহিদাই প্রায় দুই হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট, কিন্তু সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ৮৫০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই বিশাল ঘাটতির কারণে শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন উভয়ই এখন চরম ঝুঁকির মুখে। সরকার পরিস্থিতি মোকাবেলায় জ্বালানি সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করেছে এবং অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা ও বিদ্যুৎ ব্যবহার সীমিত করার কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে। ভর্তুকি না বাড়িয়ে এবং জনগণের ওপর অতিরিক্ত দামের বোঝা না চাপিয়ে জ্বালানিসংকট মোকাবেলা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকার কৌশলগত কিছু পদক্ষেপ নিলে এই পরিস্থিতি সহনীয় মাত্রায় রাখতে পারে।
জ্বালানি আমদানিতে শুল্ক ও কর সমন্বয় : জ্বালানি তেলের ওপর বর্তমানে যে উচ্চহারের আমদানি শুল্ক, ভ্যাট এবং আগাম কর রয়েছে, সরকার সাময়িকভাবে তা কমিয়ে আনতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন প্রতি ব্যারেল তেলের দম ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে, তখন আমদানিতে করের হার কমালে খুচরা পর্যায়ে দাম খুব একটা না বাড়িয়েও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব। এতে সরকারের রাজস্ব কিছুটা কমলেও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা স্থিতিশীল থাকবে এবং শিল্প উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ সূত্র ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা : সরকার এরই মধ্যে যে ‘অটোমেটেড প্রাইসিং ফর্মুলা’ বা স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু করেছে, সেটিকে আরো স্বচ্ছ করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে তার সুফল যেমন দ্রুত দেশের বাজারে পৌঁছানো দরকার, তেমনি দাম বাড়লে বিপিসির আগের জমানো মুনাফা থেকে বড় অঙ্কের ‘প্রাইস স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড’ তৈরি করে দামের আকস্মিক বৃদ্ধি ঠেকানো যেতে পারে। এ ছাড়া জ্বালানি পরিবহনে সিস্টেম লস এবং চুরি রোধ করতে পারলে খরচ অনেকটা সাশ্রয় হবে।
জ্বালানি দক্ষতা ও অপচয় রোধ : গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে দক্ষতা বাড়াতে পারলে বছরে প্রায় ৩.৩ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব। সরকার শিল্প-কারখানাগুলোতে আধুনিক ও সাশ্রয়ী মোটর এবং বয়লার ব্যবহারে উৎসাহিত করতে পারে। একই সঙ্গে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং গ্যাসের পাইপলাইনের লিকেজ মেরামত করলে যে বিশাল পরিমাণ ‘সিস্টেম লস’ হয়, তা সাশ্রয় করে এলএনজি আমদানির চাপ কমানো সম্ভব।
অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান ও বিকল্প জ্বালানি : আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমাতে অভ্যন্তরীণ গ্যাসকূপগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। পুরনো কূপগুলোর রি-ড্রিলিং এবং নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়ানো হলে দীর্ঘ মেয়াদে ভর্তুকির চাপ কমবে। পাশাপাশি শিল্প ও বাণিজ্যিক ভবনের ছাদে ‘রুফটপ সোলার’ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে আমদানি করা যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক প্রত্যাহার করলে বিদ্যুতের জন্য তেল-গ্যাসের ওপর চাপ কমবে।
স্বল্পমূল্যের উৎস ও বিকল্প দেশ থেকে আমদানি : শুধু মধ্যপ্রাচ্য বা ওপেকভুক্ত দেশগুলোর ওপর নির্ভর না করে সরকার রাশিয়া বা অন্য কোনো বিকল্প উৎস থেকে তুলনামূলক কম দামে বা সুবিধাজনক শর্তে (যেমন—রুপি বা অন্য মুদ্রায় বিনিময়) জ্বালানি আমদানির কূটনৈতিক চেষ্টা চালাতে পারে। এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক গ্রিড ব্যবহারের মাধ্যমে সস্তায় বিদ্যুৎ আমদানির সুযোগও কাজে লাগানো যেতে পারে।
পরিবহন ও সেচ খাতে স্মার্ট ব্যবস্থাপনা : ডিজেলের একটি বড় অংশ খরচ হয় পরিবহন ও কৃষিতে সেচের জন্য। সরকার কৃষকদের জন্য সোলার সেচ পাম্পে ভর্তুকি বা সহজ ঋণের ব্যবস্থা করতে পারে এবং শহর এলাকায় ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে মানসম্মত গণপরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করে তেলের চাহিদা কমিয়ে আনতে পারে। সরকার যদি আমদানিতে কর কমিয়ে দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে নজর দেয়, তবে ভর্তুকি না বাড়িয়েও জ্বালানির দাম জনগণের জন্য সহনীয় রাখা সম্ভব হবে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও বার্তাপ্রধান
কালের কণ্ঠ