ইউএনও কার্যালয়ে ঢুকে নিয়োগ পরীক্ষার কাগজপত্র ছিনিয়ে নিলেন বিএনপি নেতা

ইউএনও কার্যালয়ে ঢুকে নিয়োগ পরীক্ষার কাগজপত্র ছিনিয়ে নিলেন বিএনপি নেতা

সংগৃহীত ছবি

ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে ঢুকে একটি কলেজের কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষার কাগজপত্র নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠেছে উপজেলা বিএনপির সভাপতির বিরুদ্ধে। শুক্রবার (১৩ মার্চ) বিকেলে উপজেলা পরিষদ চত্বরে ইউএনওর কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।

প্রশাসন ও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, হরিপুর উপজেলার মেদিনী সাগর বিএম মহাবিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও আয়া পদে নিয়োগের জন্য সম্প্রতি একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।

শুক্রবার ওই দুই পদের নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা শেষে ইউএনও কার্যালয়ে নিয়োগ-সংক্রান্ত কার্যক্রম চলছিল।

এসময় উপজেলা বিএনপির সভাপতি জামাল উদ্দিন ইউএনওর কার্যালয়ে যান। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ করার দাবি জানান।

তার সঙ্গে থাকা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন নেতাকর্মী এসময় ইউএনওর সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। উপস্থিতদের মধ্যে উপজেলা বিএনপি নেতা ইরফান আলী, উপজেলা যুবদলের সভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, যুবদল নেতা মো. ফারুক ও মোখলেসুর রহমানসহ আরও কয়েকজন ছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বাগবিতণ্ডার এক পর্যায়ে জামাল উদ্দিনকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি আমার মহাসচিবের সঙ্গে কথা বলে তারপর এখানে এসেছি। আপনি রাতে অফিসে কিছু কিছু ক্লায়েন্ট নিয়ে আসেন...’

তখন ইউএনও রায়হানুল ইসলাম বলেন, ‘রাতে অফিস করব কি না, সেটা আমার বিষয়।

আমাদের অফিস ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে।’

এসময় জামাল উদ্দিন ইউএনওকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি নিয়োগ নিয়ে বাণিজ্য শুরু করেছেন।’

এসময় উপস্থিত একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনি অফিস দিনে বা রাতে করুন, আমাদের আপত্তি নেই। এর আগের ইউএনও বিকাশ চন্দ্র বর্মন ছিলেন, তাকেও আমরা এখানে ‘সেভ’ করেছি।’ জবাবে ইউএনও বলেন, ‘এই মব কালচার করে তখনও এমন ঘটনা ঘটানো হয়েছিল।

বাগ্‌বিতণ্ডার একপর্যায়ে জামাল উদ্দিন অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের ‘ফ্যাসিস্টদের’ নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। ইউএনও তখন বলেন, ‘অধ্যক্ষ যদি অবৈধভাবে কিছু করে থাকেন, তাহলে বোর্ডকে বলুন নিয়োগ বাতিল করতে। আমাদের কোনো সমস্যা নেই।’

পরে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে জামাল উদ্দিন তার সঙ্গে থাকা লোকজনকে বলেন, ‘এই প্রিন্সিপালকে নিয়ে বাইরে চলো।’ তখন তাদের কয়েকজন মেদিনী সাগর বিএম মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ হারুন অর রশিদকে বাইরে যেতে বলেন। এ সময় তাদের একজন অধ্যক্ষের কাছ থেকে নিয়োগ-সংক্রান্ত ফাইল নেওয়ার চেষ্টা করেন।

এরপর জামাল উদ্দিন কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের প্রতিনিধি জাবেদ আলীকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে জানতে চান। ইউএনও তখন বলেন, ‘এখন নিয়োগের কাজ চলছে। আপনাদের সব কিছু দেখানোর বাধ্যবাধকতা নেই। আপনারা অবৈধভাবে নিয়োগ বোর্ডে ঢুকেছেন।’

এ সময় বিএনপি নেতাকর্মীরা হট্টগোল শুরু করেন। একপর্যায়ে জামাল উদ্দিন কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের প্রতিনিধির কাছ থেকে নিয়োগের কাগজপত্র নিয়ে নেন। একই সঙ্গে তার সঙ্গে থাকা লোকজনও অধ্যক্ষের কাছ থেকে কাগজপত্র নিয়ে ইউএনওর কার্যালয় থেকে বের হয়ে যান। অধ্যক্ষ হারুন অর রশিদ তাদের পিছু নেন।

মহাবিদ্যালয়টির অধ্যক্ষ ও নিয়োগ পরীক্ষার সদস্যসচিব হারুন অর রশিদ বলেন, ‘উপজেলা বিএনপির সভাপতি লোকজন নিয়ে এসে নিয়োগ পরীক্ষা বন্ধের জন্য ইউএনওকে হুমকি ধামকি দেন। একপর্যায়ে তারা পরীক্ষার কাগজপত্র নিয়ে যান। কাগজপত্র ফেরত পাওয়ার জন্য আমি তাদের কাছে অনুরোধও করেছি।’

অন্যদিকে উপজেলা বিএনপির সভাপতি জামাল উদ্দিন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘তাদের কাছে তথ্য ছিল নিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেন হয়েছে।’ তিনি দাবি করেন, ইউএনও তার কার্যালয়ের দরজা বন্ধ করে চারজনের নিয়োগ পরীক্ষা নিচ্ছিলেন। বিষয়টির প্রতিবাদ করতেই ছেলেরা সেখানে গিয়েছিল। পরে তারা আমাকে জানালে আমিও সেখানে যাই। নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগ নিয়েই তার সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছে।

কাগজপত্র নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, পরে সেগুলো ইউএনওর কার্যালয়েই ফেলে রেখে আসা হয়েছে।

এ বিষয়ে ইউএনও রায়হানুল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলা বিএনপির সভাপতি নিয়োগ পরীক্ষা চলাকালে মব বাহিনী নিয়ে পরীক্ষাটি বন্ধ করার দাবি করেন। রাজি না হওয়ায় তারা উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করেন। এক পর্যায়ে কাগজপত্র ছিনিয়ে নিয়ে চলে যান। এই ঘটনায় একটি মামলার প্রস্তুতি চলছে।’