এবারও বিশ্বে শীর্ষ সুখী দেশ ফিনল্যান্ড
ছবিঃ সংগৃহীত।
বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশ হিসেবে ফিনল্যান্ড আবারও শীর্ষস্থান দখল করেছে এবং টানা নবমবারের মতো দেশটি এই স্বীকৃতি পেয়েছে।‘ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট’ অনুযায়ী ২০২৬ সালের শীর্ষ সুখী দেশগুলো হলো: ১. ফিনল্যান্ড ২. আইসল্যান্ড ৩. ডেনমার্ক ৪. কোস্টা রিকা ৫. সুইডেন ৬. নরওয়ে ৭. নেদারল্যান্ডস ৮. ইসরায়েল ৯. লুক্সেমবার্গ ১০. সুইজারল্যান্ড।
প্রতি বছর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের 'ওয়েলবিয়িং রিসার্চ সেন্টার', জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থার সাথে যৌথভাবে ‘ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট’ বা বিশ্ব সুখ প্রতিবেদন তৈরি করে।
এই প্রতিবেদনে দেশগুলোকে ক্রমানুসারে সাজাতে প্রচুর তথ্য ব্যবহার করা হয়।
এর মধ্যে একটি জনমত জরিপও অন্তর্ভুক্ত থাকে, যেখানে সারা বিশ্বের মানুষকে জিজ্ঞাসা করা হয় তাদের জীবন কতটা সার্থক বা পরিপূর্ণ বলে তারা মনে করেন।
১৪৭টি দেশের মধ্যে ২৯তম সুখী দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্যের অবস্থান এখনও বেশ ওপরের দিকেই রয়েছে, তবে গত বছরের রিপোর্টের তুলনায় দেশটি ছয় ধাপ নিচে নেমে গেছে।
এ বছরের চিত্রটা কেমন এবং গবেষকরা এই ফলাফল সম্পর্কে কী ভাবছেন?
একটি দেশ কতটা সুখী তা কীভাবে পরিমাপ করা হয়? ‘সুখ’ শব্দটির অনেক ধরনের অর্থ হতে পারে। আপনি হয়তো সুখ বলতে প্রথমে এমন একটি আবেগের কথা ভাবেন, যা আপনি কোনো ভালো কাজ করলে বা আপনার সাথে ভালো কিছু ঘটলে অনুভব করেন।
কিন্তু বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত একজন চিন্তাবিদ বা দার্শনিক সুখের বিষয়টি একটু ভিন্নভাবে চিন্তা করতেন। অ্যারিস্টটল নামক একজন গ্রিক দার্শনিক, যিনি ২,০০০ বছরেরও বেশি সময় আগে ছিলেন, তার লেখাগুলো সুখ আসলে কী—সে সম্পর্কে মানুষকে ধারণা দিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
শিক্ষক এবং চিন্তাবিদরা অ্যারিস্টটলের সুখের ধারণাকে ‘একটি সুন্দর জীবনযাপন’ হিসেবে গ্রহণ করেছেন, যেখানে মানুষ তার পূর্ণ সম্ভাবনা অনুযায়ী সফল হতে সক্ষম হয়।
আর এই ধারণাটিকেই ‘ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট’-এর পেছনের গবেষক দলটি বিভিন্ন দেশের সুখের মাত্রা নির্ধারণে ব্যবহার করেন।
তারা ‘গ্যালাপ ওয়ার্ল্ড পোল’ নামক একটি জরিপ ব্যবহার করেন, যেখানে প্রতিটি দেশের প্রায় ১,০০০ মানুষকে তাদের জীবনকে একটি মইয়ের সাথে তুলনা করতে বলা হয়। সেই মইয়ের একদম ওপরের ধাপটি হলো তাদের জীবনের সম্ভাব্য শ্রেষ্ঠ রূপ।
মানুষ তখন সেই মইয়ের কোন ধাপে বর্তমানে অবস্থান করছে তা জানায়। এরপর এই স্কোরগুলো যোগ করে এবং বিশ্লেষণ করে প্রতিটি দেশের জন্য একটি গড় মান বের করা হয়।
তরুণদের সুখ কমেছে যেসব দেশে
সারা বিশ্বে ১৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষ এবারের জরিপে সাড়া দিয়েছে।
তবে প্রতিবেদনটি যখন বিভিন্ন বয়সের ভিত্তিতে দেখা হয়, তখন চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন হয়।
১৩৬টি দেশের মধ্যে ৮৫টিতে দেখা গেছে, ২৫ বছরের কম বয়সীরা ২০ বছর আগের তুলনায় এখন বেশি সুখী। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে এই বয়সীদের মধ্যে সুখের মাত্রা কমে গেছে।
যুক্তরাজ্যেও তরুণদের মধ্যে সুখের মাত্রা কমেছে, তবে তা অন্য দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। মানুষের আবেগীয় সুখের মাত্রা নিয়ে সংগ্রহ করা অন্যান্য তথ্যে দেখা গেছে যে, নেতিবাচক আবেগ বাড়লেও ইতিবাচক আবেগের হার এখনও তার দ্বিগুণ।
কেন কিছু দেশ অন্য দেশের তুলনায় বেশি সুখী?
এ বছর গবেষকরা তরুণদের সুখের ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব খতিয়ে দেখেছেন এবং মিশ্র ফলাফল পেয়েছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, সামগ্রিকভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের একটি ইতিবাচক প্রভাব থাকলেও, ইংরেজি ভাষাভাষী দেশগুলোতে অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের সাথে তরুণদের সুখ কমে যাওয়ার একটি যোগসূত্র রয়েছে। যদিও এটিই একমাত্র কারণ নাও হতে পারে।
সাধারণত গবেষকরা একটি দেশের সুখকে সে দেশের মাথাপিছু পণ্য ও পরিষেবার উৎপাদন (জিডিপি), মানুষের গড় আয়ু এবং স্বাধীনতা, সামাজিক সহায়তা, উদারতা ও দুর্নীতির মাত্রার সাথে যুক্ত করেন।
স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এবং নর্ডিক দেশগুলো যেমন—ফিনল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে, আইসল্যান্ড এবং ডেনমার্ক প্রায়ই এই রিপোর্টে খুব ভালো ফলাফল করে। এ বছর তারা সবাই শীর্ষ ছয়টি সুখী দেশের তালিকায় রয়েছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টের সম্পাদক জান-ইমানুয়েল ডি নেভ বলেন, বন্ধুরাও এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে।
তিনি বলেন, ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে আমরা সামাজিক সহায়তার খুব উচ্চ স্তর দেখতে পাই, যেখানে বিপদে পড়ার সময় পাশে দাঁড়ানোর মতো বন্ধু থাকে। তারা একে অপরকে বিশ্বাস করে, আর এটি অমূল্য।