মুক্তিযুদ্ধ : দুই পাঞ্জাবির প্রতি শ্রদ্ধা
সংগ্রহীত ছবি
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় বাঙালি মুসলমানের অবদান অসামান্য। কিম্ভূতকায় এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেয় মুসলিম লীগ। দলটির জন্ম ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। এ উপলক্ষে আয়োজিত সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ।
১৯৪০ সালে মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে ভারতবর্ষের মুসলমানের জন্য একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব গৃহীত হয়। মুসলিম লীগের ওই সম্মেলনে প্রস্তাবটি পেশ করেন অবিভক্ত বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে অবিভক্ত বাংলায় মুসলমানের জন্য সংরক্ষিত আসনে বিপুলভাবে জয়ী হয় মুসলিম লীগ। সরকার গঠনেও সক্ষম হয় তারা।
বর্তমান পাকিস্তানের চার প্রদেশের মধ্যে পাঞ্জাব ও সিন্ধুতে মুসলিম লীগ একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। তবে পাঞ্জাবে সরকার গঠনে ব্যর্থ হয় তারা। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের মুসলমানরা নির্বাচনে কংগ্রেসের পক্ষে ভোট দেয়। অর্থাৎ পাকিস্তান নয়, অবিভক্ত ভারতের পক্ষেই ছিল তারা।
পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ বেলুচিস্তান। যার আয়তন বাংলাদেশের দ্বিগুণের বেশি। বেলুচরা পাকিস্তান আন্দোলনের ধারেকাছেও ছিল না। তারা ছিল নিজেদের স্বাধীন সত্তা বজায় রাখার পক্ষে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সাত মাস পর ছলেবলে-কৌশলে গায়ের জোরে বেলুচিস্তান দখলে নেন জিন্নাহ সাহেবরা।
ব্রিটিশ শাসনামলে প্রায় ৫০০ দেশি রাজ্য ছিল ভারতবর্ষজুড়ে। যার মধ্যে অন্যতম কাশ্মীর। এ রাজ্যের জনসংখ্যার বেশির ভাগই মুসলমান। তবে রাজ্যের মহারাজা হরি সিং ছিলেন হিন্দু। কাশ্মীরের নেতা শেরে কাশ্মীর শেখ আবদুল্লাহ ও তাঁর দল জম্মু এবং কাশ্মীর ন্যাশনাল কনফারেন্স ছিল রাজনৈতিক মতাদর্শগত দিক থেকে ভারতীয় কংগ্রেসের বন্ধুপ্রতিম দল। তবে কাশ্মীরের মহারাজা ভারত বা পাকিস্তানে যোগদানের বদলে নিজেদের স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রাখার পক্ষে ছিলেন। পাকিস্তান কৌশলগত কারণে তাতে সায় দেয়। কারণ কাশ্মীরের প্রধান রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল কনফারেন্স ভারতে যোগদানের পক্ষপাতী ছিল। জনমতও ছিল সেদিকে। আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু নিজেই কাশ্মীরী বংশোদ্ভূত। ফলে কাশ্মীরের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অতি উৎসাহী। ভারত ভাগের সময় কাশ্মীরের স্বাধীন সত্তা মেনে নেওয়া হলেও শেষরক্ষা হয়নি। ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে পাকিস্তান উপজাতীয় যোদ্ধাদের দিয়ে কাশ্মীর দখলের প্রয়াস চালায়। পাকিস্তানের পাঠানো উপজাতীয় যোদ্ধারা রাজধানী শ্রীনগরের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। মহারাজা হরি সিং রাজধানী ছেড়ে পলাতক অবস্থায় ভারতের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। দিল্লির পক্ষ থেকে বলা হয়, ভারতে যোগদান করলেই পাকিস্তানি অনুপ্রবেশকারীদের ঠেকাতে তারা সেনা পাঠাবে নতুবা নয়। বাধ্য হয়ে মহারাজা ভারতের সঙ্গে কাশ্মীরকে একীভূত করতে রাজি হন। এ-সংক্রান্ত শর্তাবলি নির্ধারণে ভূমিকা রাখেন কাশ্মীরের অবিসংবাদিত নেতা শেখ আবদুল্লাহ; যিনি কাশ্মীরের আলাদা বৈশিষ্ট্য বজায় রাখার শর্ত তুলে ধরেন। শর্ত অনুযায়ী রাজ্যের অভ্যন্তরে কাশ্মীরের আলাদা পতাকা ব্যবহার ও রাজ্যের মন্ত্রিপরিষদের প্রধানকে মুখ্যমন্ত্রীর বদলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিহিত করার বিধান রাখা হয়। তড়িঘড়ি ভারতে যোগদানের চুক্তি সম্পাদনের পর কাশ্মীরে অনুপ্রবেশকারী পাকিস্তানি উপজাতীয় যোদ্ধাদের ঠেকাতে ভারত সেনা পাঠায়। তারা অনুপ্রবেশকারীদের শ্রীনগর থেকে পিছু হটতে বাধ্য করে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে যুদ্ধবিরতি মেনে নেয় ভারত ও পাকিস্তান। ভারতের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়, যেসব রাজ্য (কাশ্মীর, হায়দরাবাদ, জুনাগড় ইত্যাদি) এখনো কোনো দেশে যোগ দেয়নি, তারা কোন দেশে যোগ দেবে গণভোটের মাধ্যমে সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক। ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেন ১৯৪৭ সালের ১ নভেম্বর এ প্রস্তাব নিয়ে লাহোরে জিন্নাহর সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু সে প্রস্তাব নাকচ করেন কায়েদে আজম জিন্নাহ। পরে কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে ভারত জাতিসংঘে যায়। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের জনগণ ভারত বা পাকিস্তান কোনো দেশে যোগদান করবে, এ নিয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু নানান অজুহাতে তা কখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় বাঙালি মুসলমানের জোশ ছিল পাঞ্জাবি ও সিন্ধিদের চেয়ে ঢের বেশি। এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে বিবিসির জরিপে যাঁকে ‘হাজার বছরের সেরা বাঙালি’ অভিহিত করা হয়েছে, সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবও ছিলেন ছাত্রাবস্থায় ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ আন্দোলনের সামনের সারির যোদ্ধা। জীবনে প্রথম জেলও খেটেছেন কংগ্রেস সমর্থকদের দেওয়া মামলায়।
দুই
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় বাঙালি মুসলমানের অবদান যেমন অবিস্মরণীয়, তেমন বাঙালির সঙ্গে পাকিস্তানি শাসকদের প্রতারণারও দ্বিতীয় কোনো নজির নেই। পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৫৬ ভাগ ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) অধিবাসী। কিন্তু পাকিস্তানের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান জিন্নাহ ছিলেন পশ্চিম অংশের। প্রথম প্রধানমন্ত্রীও করা হয় ভারত থেকে আসা মোহাজের লিয়াকত আলী খানকে। পাকিস্তানের রাজধানী করা হয় পশ্চিম অংশে। সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদে সিনিয়র ও সুযোগ্য বাঙালি জেনারেলকে ডিঙিয়ে সেনাবাহিনী প্রধান করা হয় জেনারেল আইয়ুব খানকে। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস ছিল পাট। পাট উৎপাদিত হতো বাংলাদেশে। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগ ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানে। পাকিস্তানের বাজেটের সবচেয়ে বড় অংশ ব্যয় হতো সেনাবাহিনীর পেছনে। অথচ সেনাবাহিনীতে বাঙালির সংখ্যা ছিল ১০ শতাংশের কম। সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদর দপ্তরও ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করলেও বাঙালি ছিল সব ক্ষেত্রে উপেক্ষার শিকার। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৫ শতাংশ ছিল বাংলাভাষী। অথচ মাত্র ৫ শতাংশ মানুষের ভাষা উর্দুকে দেশটির রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বাঙালি উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেওয়ার দাবি জানালে গায়ের জোরে সে দাবি স্তব্ধ করার অপচেষ্টা চালান পাকিস্তানি শাসকরা। পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে ঢাকার সংবর্ধনা সভায় ঘোষণা করেন উর্দু এবং একমাত্র উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। স্বভাবতই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার রেশ না কাটতেই বাংলাদেশের মানুষের মোহভঙ্গ হয়। তার সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে। ৩০৯ আসনের পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদে মুসলিম লীগ জয়ী হয় মাত্র ৯টি আসনে। বাদবাকি আসনে জয়ী হয় শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী ও শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট এবং তাদের মিত্র দলগুলো। বলা যায়, ওই নির্বাচনে পাকিস্তানি চেতনার কবর রচিত হয়। বাংলাদেশের মানুষের এ রায়কে ভালো চোখে দেখেননি পাকিস্তানি শাসকরা। নির্বাচনের পর শেরেবাংলার নেতৃত্বে পূর্ববাংলায় সরকার গঠিত হয়। মাত্র ৫৬ দিন পর কেন্দ্রীয় সরকার প্রাদেশিক মন্ত্রিপরিষদ বরখাস্ত করে। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও মওলানা ভাসানীকে ভারতের দালাল হিসেবে চিহ্নিত করার ধৃষ্টতাও দেখান পাকিস্তানি শাসকরা।
তিন
বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন একাত্তরের স্বাধীনতা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, গাঙ্গেয় বদ্বীপের মানুষ হাজার হাজার বছর আগেও বীর জাতি হিসেবে পরিচিত ছিল। আনুমানিক ৪ হাজার বছর আগে ভারতবর্ষে আর্যদের আগমন ঘটে। আর্যরা ভারতবর্ষের অধিকাংশ এলাকায় তাদের আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হয়। এর তিন হাজার বছর পর অর্থাৎ আজ থেকে ৯০০ বছর আগে কর্ণাটক থেকে আসা সেনরা পাল শাসকদের পরাজিত করে ‘আর্য’ আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হয়। পালেরা ছিলেন বৌদ্ধ। পক্ষান্তরে সেনেরা ছিলেন হিন্দু। কর্ণাটক থেকে আসা সেনদের অধীনে বাংলা শাসিত হয় ১২৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। তারপর তুর্কি, পাঠান মোগলদের দ্বারা বাংলা শাসিত হয়েছে। এমনকি যে সিরাজদ্দৌলাকে আমরা বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব বলি, তিনিও কিন্তু স্বাধীন ছিলেন না। খাতাপত্রে হলেও ছিলেন মোগলদের অধীনে। ছিলেন না বাঙালিও। তবে এ কথা ঠিক, ভিনদেশ থেকে এলেও তাঁরা সবাই এ দেশকে নিজেদের দেশ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। এদিক থেকে ইংরেজরা ছিল ব্যতিক্রম। তারা এ দেশকে উপনিবেশ হিসেবেই ব্যবহার করেছে।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশের মানুষ দ্বিতীয়বার তাদের মতামত প্রকাশের সুযোগ পায় ১৯৭০ সালের নির্বাচনে। পাকিস্তানের সেই জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের দুটি বাদে সব আসনে জয়ী হয়। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬০টিতে জয়ী হয়। পাকিস্তান শাসনের ম্যান্ডেট পান শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের সদস্যরা। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বদলে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আনুমানিক ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ হারায় দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ-দেশীয় অনুচর রাজাকার, আলশামস, আলবদর বাহিনীর হাতে। পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার মুখে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষিত হয়। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ শেষে পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের এ-দেশীয় দোসররা পরাজিত হয়। পাকিস্তানি গণহত্যার বিরুদ্ধে সারা দুনিয়ার সাধারণ মানুষ ছিল বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে। তবে আত্মবিক্রীত কিছু ঘাতক দালাল পাকিস্তানি বাহিনীর তলপিবাহকের ভূমিকা পালন করে। তারা নিজেদের মা-বোনকে উপঢৌকন হিসেবে পাঠাত দখলদারদের কাছে। স্মর্তব্য যে একাত্তরে পাকিস্তানি দখলদারদের দোসর হিসেবে নগ্নভাবে ভূমিকা পালন করে যে ধর্মভিত্তিক দলটি, তারা ব্রিটিশের হাত থেকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেরও বিরোধিতা করেছে। তাদের নেতা প্রকাশ্যে পাকিস্তানকে নাপাকিস্তান বলে অভিহিত করতেন।
পাদটীকা : মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির প্রতিপক্ষ ছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তা আর তাদের পদলেহী এ-দেশীয় ঘাতক দালালরা। পাকিস্তানের সাধারণ মানুষকে এ ব্যাপারে অন্ধকারে রাখা হয়। তবে বেলুচ পাঠানদের অনেকেই ছিলেন বাঙালির পক্ষে। পাকিস্তানি গণহত্যার প্রতিবাদে একজন পাঞ্জাবি ক্যাপ্টেন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। পাঞ্জাবের আরেক তরুণ গণহত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে জেল খাটেন। এমনকি পাকিস্তানি নাগরিকত্ব ত্যাগ করতেও বাধ্য হন। তাঁর নাম সৈয়দ আসিফ শাহকার। জন্ম পাকিস্তানের পাঞ্জাবের হরপ্পায়। ১৯৭১ সালে তাঁর বয়স ছিল ২২ বছর। তখন তিনি পাঞ্জাব স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২৫ মার্চের কালরাতে বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানি বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে নির্মম গণহত্যা শুরু করে। এর প্রতিবাদে পশ্চিম পাকিস্তানের নাগরিকের মধ্যে যারা প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন, তাদেরই একজন সৈয়দ আসিফ। বাংলাদেশের বিপন্ন মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ায় তিনি তাঁর পরিবার, সমাজ ও দেশের মানুষের কাছে ঘৃণার পাত্র হয়ে ওঠেন। তাঁকে দেশদ্রোহী হিসেবে জেলে ভরা হয়। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস তিনি পাকিস্তানের কারাগারে আটক ছিলেন। সে সময় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন সহ্য করেন। তাঁর বাবা তাঁকে কারাগারে দেখতে আসতেন এবং বাঙালির প্রতি দরদের জন্য কটুকথা বলতেন। তবু বাংলাদেশের বিপক্ষে যাননি সৈয়দ আসিফ শাহকার। একাত্তরের যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ের পর জেল থেকে ছাড়া পান তিনি। তারপর নিজ দেশে বেশি দিন থাকতে পারেননি সৈয়দ আসিফ। ১৯৭৭ সালে তিনি সুইডেনে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। পরে সুইডেন হাই কোর্ট বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগও পান।
পাকিস্তান ছাড়ার পর সৈয়দ আসিফ শাহকার মাত্র দুবার তাঁর দেশে আসেন। বাংলাদেশের জাতীয় নেতা শেখ মুজিবের প্রতি ছিল তাঁর অসীম শ্রদ্ধা। শেখ সাহেব একাত্তরে পাকিস্তানের শাহিওয়াল জেলে বন্দি ছিলেন। সেই জেলখানায় যান সৈয়দ আসিফ।
২০১২ সালে সৈয়দ আসিফ মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা গ্রহণের জন্য ঢাকায় আসেন। ৭৭ বছর বয়সি পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত সুইডিশ এই বিচারপতি মৃত্যুর পর বাংলাদেশে সমাধিস্থ হতে চেয়েছেন। তাঁর ইচ্ছা তাঁর কবর যেন হয় বাংলাদেশে। সৈয়দ আসিফ শাহকার বাংলাদেশে এসেছিলেন একবার। এ দেশে তাঁর কোন আত্মীয় নেই, তিনি বাংলাও বলতে পারেন না। তার পরও বাংলাদেশও যেন তাঁর স্বজন। এই বাংলাদেশের জন্য তাঁকে ছাড়তে হয়েছিল তাঁর মাতৃভূমি, স্বজন, আত্মীয়, বন্ধু। প্রাণও হারাতে বসে ছিলেন। ছাড়তে হয়েছিল তাঁর পরিচয়ও।
-শ্রদ্ধা পাঞ্জাবের দুই মহান মানবতাবাদীকে।
লেখক : সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন
ইমেইল : sumonpalit@gmail.com