স্কুলে ভর্তিতে লটারি থেকে মেধা যাচাইয়ে ফেরা: শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বস্তির নতুন সূচনা
জাকিরুল ইসলাম
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিনের সমালোচনার প্রেক্ষিতে বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে ভর্তি পরীক্ষা পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও সাহসী পদক্ষেপ। সাম্প্রতিক পরিপত্রে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার মধ্য দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—শিক্ষায় ন্যায্যতা, মান এবং জবাবদিহি পুনঃপ্রতিষ্ঠাই এখন অগ্রাধিকার।
উল্লেখ্য, কোভিড-১৯ প্রেক্ষিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানোর বাস্তবতায় সাময়িকভাবে লটারি পদ্ধতিতে ভর্তি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। সেই জরুরি পরিস্থিতিতে নেওয়া সিদ্ধান্তটি তখন যৌক্তিক হলেও, পরবর্তীতে সেটিকে স্থায়ী রূপ দেওয়া হয় আওয়ামী লীগ সরকারের সময়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব চাহিদার সঙ্গে এর অসামঞ্জস্য ক্রমেই প্রকট হতে থাকে।
ঐতিহাসিকভাবে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো দেশে একটি বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষার্থী বাছাইয়ের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্য দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় শিক্ষার মান, শৃঙ্খলা এবং ফলাফলের ক্ষেত্রে এসব বিদ্যালয় আলাদা পরিচিতি গড়ে তোলে। ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের একাডেমিক প্রস্তুতি তুলনামূলকভাবে সমমানের হওয়ায় শ্রেণিকক্ষে পাঠদানও হতো অধিকতর গতিশীল ও ফলপ্রসূ। লটারি পদ্ধতি চালুর ফলে সেই ঐতিহ্যে একটি বিচ্ছেদ তৈরি হয়েছিল, যা অনেকের কাছেই অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমান সিদ্ধান্ত সেই হারিয়ে যাওয়া ধারাকে পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তকে কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বোঝার একটি উদাহরণ। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা লটারি পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা নিয়ে যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছিলেন, এই সিদ্ধান্ত সেই ক্ষোভ প্রশমনের একটি কার্যকর প্রতিফলন। স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষকসমাজ এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে, কারণ তারা প্রত্যক্ষভাবে দেখেছেন কীভাবে একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত শিক্ষার মান ও শ্রেণিকক্ষের পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে।
লটারি পদ্ধতি চালুর পেছনে সমান সুযোগের একটি আদর্শিক ভাবনা কাজ করেছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, এই পদ্ধতি শিক্ষার মৌলিক ভারসাম্যকে ব্যাহত করেছে। একই শ্রেণিকক্ষে অত্যন্ত দুর্বল ও তুলনামূলকভাবে অগ্রসর শিক্ষার্থীর সমন্বয় শিক্ষককে একধরনের দ্বৈত সংকটে ফেলে। তিনি যখন দুর্বল শিক্ষার্থীদের বোঝাতে সময় দেন, তখন মেধাবীরা পিছিয়ে পড়ে; আবার মেধাবীদের গতিতে এগোতে গেলে অনেকেই তাল মেলাতে পারে না। ফলে শ্রেণিকক্ষের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয় এবং সামগ্রিকভাবে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক শিক্ষার্থী এই বৈষম্যের কারণে হতাশ হয়ে পড়ে, বারবার ব্যর্থ হয় এবং শেষ পর্যন্ত অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হয়—যা তাদের জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট করে।
এর পাশাপাশি লটারি পদ্ধতিকে ঘিরে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবণতাও দেখা দিয়েছে। বয়স শিথিলতার সুযোগ নিয়ে একাধিক জন্মনিবন্ধন তৈরি করা, তথ্য গোপন করা কিংবা প্রভাব খাটানোর অভিযোগ—এসব বিষয় পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ফলে যে পদ্ধতি মূলত সমতা নিশ্চিত করার জন্য চালু হয়েছিল, সেটিই ধীরে ধীরে আস্থাহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
একসময় শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা কমানোর উদ্দেশ্যে যে নতুন কারিকুলাম চালু করা হয়েছিল, সেটিও বাস্তবে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। মূল্যায়নের কাঠামো অস্পষ্ট হয়ে ওঠে, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির মানে বড় ধরনের ভিন্নতা তৈরি হয় এবং শেখার ধারাবাহিকতা দুর্বল হয়ে পড়ে। সেই ধারাবাহিকতায় লটারি পদ্ধতি যুক্ত হয়ে শিক্ষার ক্ষেত্রে মেধাভিত্তিক নির্বাচন প্রায় অনুপস্থিত হয়ে যায়। এতে করে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর দীর্ঘদিনের সুনাম ও ফলাফলের ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। বর্তমান সিদ্ধান্ত সেই বাস্তবতার একটি সংশোধিত প্রতিক্রিয়া, যেখানে আবার গুরুত্ব পাচ্ছে যোগ্যতা, প্রস্তুতি এবং স্বচ্ছ মূল্যায়ন।
তবে ভর্তি পরীক্ষা চালু করলেই যে সমস্যার সমাধান হবে, বিষয়টি ততটা সরল নয়। পরীক্ষার কাঠামো কেমন হবে, সেটিই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যদি পরীক্ষা এমনভাবে নেওয়া হয়, যেখানে শুধুমাত্র আগের শ্রেণির পাঠ্যবই থেকে সহজ ও বোধগম্য প্রশ্ন করা হয়, তাহলে এটি কোনোভাবেই অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি করবে না। বরং শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিক পড়াশোনার মধ্য দিয়েই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে পারবে। প্রশ্নপত্রে অতিরিক্ত জটিলতা বা গাইডনির্ভরতা এড়িয়ে গেলে কোচিংয়ের প্রয়োজনীয়তাও অনেকাংশে কমে যাবে। প্রথম শ্রেণির ভর্তীচ্ছুদের ক্ষেত্রে পরীক্ষাকে আরও মানবিক ও সহজ করতে মৌখিক বা চিত্রভিত্তিক মূল্যায়নের কথাও বিবেচনা করা যেতে পারে, যাতে তাদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ না পড়ে।
এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু পরীক্ষা নেওয়া যথেষ্ট নয়; পুরো প্রক্রিয়াকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা জরুরি। এজন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে একটি শক্তিশালী ভর্তি কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যেখানে জেলা প্রশাসক বা ইউএনও'র নেতৃত্বে অভিজ্ঞ শিক্ষকরা যুক্ত থাকবেন। প্রশ্ন প্রণয়ন, পরীক্ষা গ্রহণ, খাতা মূল্যায়ন এবং ফলাফল প্রস্তুত—প্রতিটি ধাপে প্রশাসন ও শিক্ষকদের যৌথ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এতে করে এককভাবে কোনো পক্ষের প্রভাব খাটানোর সুযোগ কমে যাবে।
পরীক্ষার দিন কক্ষ পরিদর্শক ও রুম বণ্টনের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক লটারির ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যাতে আগে থেকে কোনো ধরনের সমন্বয় বা প্রভাব খাটানোর সুযোগ না থাকে। খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নাম গোপন রেখে কোডিং পদ্ধতি অনুসরণ করা হলে নিরপেক্ষতা বাড়বে। একই সঙ্গে একাধিক পর্যায়ে খাতা যাচাই এবং ফলাফল প্রস্তুতের সময় প্রশাসন ও শিক্ষকদের যৌথ উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেলে অনিয়মের সম্ভাবনা অনেকাংশে কমে আসবে। প্রয়োজনে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ফলাফল প্রক্রিয়াকরণ এবং একটি কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাও চালু করা যেতে পারে, যাতে কেউ অসন্তুষ্ট হলে দ্রুত সমাধান পায়।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, ভর্তি পরীক্ষা পুনর্বহালের এই সিদ্ধান্ত শিক্ষা ব্যবস্থাকে সঠিক পথে ফেরানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে। এটি শুধু একটি নীতিগত পরিবর্তন নয়, বরং দীর্ঘদিনের একটি সফল ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন এবং আস্থা পুনর্গঠনের একটি প্রক্রিয়া। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যে স্বস্তি অনুভব করছেন, সেটি এই সিদ্ধান্তের প্রয়োজনীয়তাকেই প্রমাণ করে। এখন প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও কঠোর বাস্তবায়ন, যাতে এই উদ্যোগ বাস্তব অর্থেই একটি ন্যায্য, স্বচ্ছ ও কার্যকর ভর্তি ব্যবস্থায় পরিণত হয়।
যদি তা সম্ভব হয়, তবে এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি শক্ত ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের পথে একটি টেকসই দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
লেখক: শিক্ষক, কুষ্টিয়া জিলা স্কুল