চট্টগ্রামে আবারও মাথাচাড়া দিচ্ছে কিশোর গ্যাং
প্রতীকী ছবি
চট্টগ্রামে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে কিশোর গ্যাং। মারামারি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মারধর থেকে শুরু করে খুনাখুনিতেও জড়াচ্ছে তারা। নিজেদের শক্তি জানান দিতে রাস্তায় গ্রুপের নামে মিছিলও করছে তারা। এ অবস্থায় কিশোর গ্যাং সদস্যদের গ্রেপ্তার অভিযান জোরদার করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ।
গত মার্চ মাস থেকে চলতি মাসের ৫ তারিখ পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে ২০০ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জামালখান, গণিবেকারি এলাকায় ‘ডেঞ্জার’, চকবাজার এলাকার ‘ফোর জিরো সেভেন’, হালিশহরে ‘পাইথন’, ‘বিগু’, মুরাদপুর-পাঁচলাইশ ও হামজারবাগে ‘এমবিএস’, ‘কেবি’, ‘এনএস’, ‘ট্রিপল নাইন’ গ্রুপসহ বেশ কিছু কিশোর গ্যাং নগরবাসীর কাছে আতঙ্কের নাম। সম্প্রতি চট্টগ্রামের জামালখান এলাকায় কিশোর গ্যাং ডেঞ্জার গ্রুপের সদস্যরা মিছিলে নিজেদের গ্রুপের নামে স্লোগান দেয়। জামালখান, গণিবেকারি ও বগারবিল এলাকায় বসবাসকারী কিশোরদের নিয়ে গঠিত এই ‘ডেঞ্জার গ্রুপ’।
এই গ্রুপে ১০০ থেকে ১৫০ জন সদস্য রয়েছে। তারা মারামারি, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধ করে। তাদের গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছে মো. শামীম। গত ৩ এপ্রিল জামালখানের খাস্তগীর স্কুলের সামনে নিজেদের শক্তি জানান দেওয়ার জন্য দলবদ্ধভাবে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয় তারা।
এ সময় পুলিশ গ্রুপের ১১ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছ থেকে একটি টিপ ছোরা, একটি কিরিচ, লোহার ধামা এবং বিভিন্ন সাইজের আটটি লাঠি উদ্ধার করা হয়। এরপর ৬ এপ্রিল অভিযান চালিয়ে আরো দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মো. শামীম এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের পর ডেঞ্জার গ্রুপের সদস্য মো. বাপ্পী বলেন, ‘এই গ্রুপে ১০০ থেকে ১৫০ সদস্য রয়েছে।
গ্রুপ লিডারের নাম শামীম। আমি আসতে চাইনি, আমাকে জোর করে নিয়ে আসা হয়েছে। কয়েক দিন আগে গ্রুপের এক সদস্যকে মারধর করা হয়েছিল। তাই একজনকে মারধর করতে জামালখানে এসেছিলাম।’
চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আফতাব উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডেঞ্জার গ্রুপের সদস্যরা দেশীয় বিভিন্ন অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়ে আসছিল। এত দিন তারা আড়ালে ছিল। এখন নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়ে মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা আদায়ের জন্য এই ধরনের মহড়া দিচ্ছিল বলে জানতে পেরেছি। এসব গ্রুপের সদস্যরা ছিনতাই, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত। এ পর্যন্ত এই গ্রুপের ১৩ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের দলনেতা শামীমকে গ্রেপ্তার করার জন্য অভিযান চালানো হচ্ছে।’
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের চকবাজার এলাকাকেন্দ্রিক ‘ফোর জিরো সেভেন’ নামে একটি কিশোর গ্যাং আছে। এই গ্যাংয়ে ১০০ থেকে ১৫০ জন সদস্য জড়িত। গত ৪ এপ্রিল বাকলিয়া থানার মিয়াখান নগর এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মোরশেদ খান ও শওকত খান গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার পর পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে, যাদের বয়স ১৯ থেকে ২০ বছর। এই দুই পক্ষেই কিশোর গ্যাং সদস্য রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকায় আকাশ দাশ নামের একজনকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। বিরোধের জেরে ১০ থেকে ১৫ জন কিশোর গ্যাং সদস্য তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। এ ঘটনায় র্যাব দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে, যাদের বয়স ২০ বছর। পাঁচলাইশ থানার হামজারবাগ ও মোহাম্মদপুর এলাকায় ‘মোহাম্মদপুর বয়েজ সিন্ডিকেট (এমবিএস)’ নামে একটি কিশোর গ্যাং রয়েছে। এই গ্রুপে ৩০ জনের মতো সদস্য রয়েছে। গেল বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এই গ্রুপের ৯ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তাদের কার্যক্রম কিছুদিন স্তিমিত ছিল। বর্তমানে আবার গ্রুপের সদস্যরা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এ ছাড়া বায়েজিদ বোস্তামী, কোতোয়ালি, চান্দগাঁও, আকবরশাহ, ইপিজেড, সদরঘাট থানাসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত বেশি। কিশোর গ্যাংয়ে স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বেকার তরুণ এবং বিভিন্ন দোকান-কারখানায় কাজ করা ১৬ থেকে ২৫ বছর বয়সীরা। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পুরনো বড় ভাইরা আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করছে নতুন বড় ভাইয়েরা। বায়েজিদ বোস্তামী থানার ইনচার্জ জাহেদুল কবির বলেন, বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাং গ্রুপের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিভিন্ন সময় তারা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করে। কিশোর গ্যাং সদস্যদের মধ্যে যারা বিভিন্ন অপরাধে জড়ায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। অনেককে আবার কাউন্সেলিং করা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে চট্টগ্রাম নগরে ২০০ কিশোর গ্যাং সক্রিয় ছিল। তাদের প্রতিটি দলে ১৫ থেকে ৩০ জন করে সদস্য ছিল। তখন প্রায় ৭০ জন ‘বড় ভাই’ কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকতা করত। তবে সরকারের পতনের পর অনেকে আত্মগোপনে চলে গেছেন। তাদের সেই শূন্যস্থান নতুন বড় ভাইয়েরা পূরণ করছেন। চকবাজার এলাকার বাসিন্দা মাঈন উদ্দিন বলেন, ‘এখন আবার কিশোর গ্যাংয়ের অত্যাচার বাড়ছে। তারা ছিনতাই থেকে চাঁদাবাজি, মতের অমিল হলে মারধরসহ বিভিন্ন অপরাধ করছে। আমরা এর থেকে মুক্তি চাই।’
গত ২ এপ্রিল চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের মাসিক কল্যাণ সভায় সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী ছিনতাই, মাদক, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করার জন্য কঠোর নির্দেশ দেন। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত থাকবে। কিশোর গ্যাং সদস্যদের যেসব ‘বড় ভাই’ আশ্রয় দিচ্ছে, তাদেরও গ্রেপ্তার করা হবে। গত এক মাসে প্রায় ২০০ কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’